advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কেউ জানেন না কারও কথা

রেজাউল করিম প্লাবন
১৪ জুলাই ২০১৯ ১৪:০৯ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯ ১৬:৩৯
advertisement

এটি শুধু একটি ছবি নয়, অসাধ্য সাধন করাও বটে। যেটা শুধু দৈনিক আমাদের সময়ই পেরেছিল। দুটি বিপরীত মেরুকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা বলতে যা বোঝায় আরকি। আর কাজটির মূল ঘটক ছিলাম আমি।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-রওশন এরশাদকে নিয়ে স্পষ্ট দুটি বলয় সৃষ্টি হয়। সে সময় এই দম্পতির অবস্থা এমন যে একে অপরের মুখ দেখাও নিষেধ। একজন ভালো কথা বললেও বিপরীতজন তার কাউন্টার দিতেন। প্রায় তিন বছরের মতো তারা একে অপরের মুখ দেখেননি। মূলত পার্টির কিছু স্বার্থান্বেষী নেতা সুকৌশলে এই দম্পতিকে পৃথক করে রেখেছিলেন।

মূল কথায় আসি-

দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী-২০১৫। পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার ভাই আমাকে দায়িত্ব দিলেন, যে করেই হোক এরশাদ ও রওশনকে অনুষ্ঠানে চাই। আমি খাড়ার উপর বলে দিলাম ‘সম্ভব না’।

তিনি বললেন, পারতেই হবে। যাও।

গণমাধ্যমের সহকর্মীদের অনেকেরই জানা-এরশাদ ও রওশনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা পুরনো ও আঞ্চলিক। আমাকে দুজনই ‘বাবা’ সম্বোধন করতেন। সম্ভবত তাদের স্নেহাশিস অনেকেই এই মধুর ডাকটি শুনতে পেতেন। আর দেখা হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেননি এমন দিন খুব কমই ছিল।

দেখা হলেই স্যার (এরশাদ) গল্প করতেন কুড়িগ্রামের নানা বাড়ির আর ম্যাডাম করতেন চিলমারীর নৌকাডুবির ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা। অনেকবার শুনেছি, শুনতে না চাইলেও শুনেছি। এখন শুনতে চাইলেও আর পাব না!

সম্পাদকের নির্দেশ মতো আমি পরদিন বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে গেলাম। অনেক কথা শেষে স্যারকে দাওয়াত কার্ডটি দিতেই বললেন-কিসের? বললাম, স্যার আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

-আমি যাই তো! গতবারও গিয়েছিলাম। তুমিই তো নিয়ে গিয়েছিলে।

-জ্বি স্যার।

সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তার পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভ রায়কে টুকে রাখতে বললেন।

সেখান থেকে বেরিয়ে রওনা দিলাম গুলশান-২ এ রওশন এরশাদের বাসার দিকে। বাসায় গিয়ে শুনি তিনি নেই। দিলাম ফোন। বললেন, সংসদে আছি। জানতে চাইলেন কেন বাসায় এসেছি।

বললাম, আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দাওয়াত দিতে।

প্রতি উত্তর দিলেন-‘নিজের বিয়ের দাওয়াত নাই, আসছো পত্রিকার দাওয়াত দিতে। তোমার বিয়ে কবে, বলো।’

অনেকটা স্বস্তিদায়ক ভঙ্গিতে বললাম, বিয়ের দাওয়াত পাবেন। তার আগে আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যেতে হবে। আমি সম্পাদক মহোদয়কে কথা দিয়েছি-আপনি আসবেন। না গেলে আমি ছোট হয়ে যাব।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনি আসবেন। আরও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সেও (এরশাদ) যাচ্ছেন জানতে পারলে আসবেন না। আমি দুটোই আমার মতো করেই সামলে নিলাম। কারও কথা কারও কাছে বললাম না।

১ এপ্রিল ২০১৫, দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন। সকাল সকাল ফোন বেজে ওঠল। রওশন এরশাদ জানতে চাচ্ছেন কখন আসবেন। তিনি নাকি রেডি হয়ে বসে আছেন। আমি সম্পাদক মহোদয়কে জানালাম। তিনি বললেন, দুপুরের দিকে আসতে। বিষয়টি রওশন ম্যাডামকে অবহিত করলাম।

ঠিক ১২টায় তিনি এলেন। আমাদের সময়ের মালিক ও ইউনিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. নূর আলী তাকে স্বাগত জানিয়ে কনফারেন্স রুমে নিয়ে গেলেন। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা জমিয়ে আড্ডা, সঙ্গে হাসি মশকরা।

এক নিমিষেই ম্লান হলো সেই আড্ডা, হাসাহাসি। ততক্ষণে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্যারকে সম্পাদক মহোদয় রিসিভ করে কনফারেন্স রুমে নিয়ে এসেছেন। এরশাদকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন রওশন এরশাদ। নিঃস্তব্ধ পুরো কনফারেন্স রুম।

রাগ আর অভিমানে নূর আলী মহোদয়ের দিকে তাকিয়ে রওশন এরশাদ বললেন-‘আমি যদি জানতাম তিনি আসবেন, তাহলে আমি আসতাম না।’ সত্যি বলতে সেই অগ্নিমূর্তি মুহূর্তে আমি ম্যাডামের সামনে যাওয়ার সাহস পাইনি।

মিলনায়তন থেকে বের হয়ে যেতে বার বার উদ্যত হচ্ছেন রওশন এরশাদ। আর অনুনয়-বিনয় করে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন অন্যান্যরা। আমাদের সময়ের মালিক নূর আলী, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার অনুরোধ করে ফের বসাতে সম্মত হন।

তবে যতক্ষণ দুজন বসেছিলেন, কেউ কারও মুখ পর্যন্ত দেখেননি। তবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সার্বক্ষণিক মিষ্টি মিষ্টি হাসতে দেখা গেছে। দুজন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কেটেছেন পৃথকভাবে। আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এরশাদ-রওশনের একই মঞ্চে আসা ও উদ্ভূত ঘটনা সেদিন ‘টক অব টাউনে’ পরিণত হয়েছিল।

এরপর দীর্ঘদিন রওশন এরশাদ সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের সময়ের সার্বিক পর্যালোচনা বৈঠকে এই অসাধ্য সাধন করায় আমাদের সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. নূর আলী, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার ভাইসহ সহকর্মীদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিলাম।

আজ এরশাদ নেই। কিন্তু তার এই স্মৃতি, হাসিমাখা মুখ ভেসে ওঠে স্মৃতিপটে। ওপারে ভালো থাকবেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

রেজাউল করিম প্লাবন : সাংবাদিক

advertisement