advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পল্লীবন্ধু এরশাদ : বহু সত্তায় যার আবির্ভাব

সুনীল শুভরায়
১৬ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৯ ০৮:৫২
advertisement

গত চব্বিশ জুন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। সেদিনও তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) ভিভিআইপি কেবিনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সবেমাত্র তাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক স্যালাইন দেওয়া শেষ হয়েছে। ভীষণভাবে মন খারাপ আমার। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কাছে এসো-আমার কাছে বসো। আমি তার শিয়রের কাছে বসলাম।

তিনি বললেন, ‘তোমার তো মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা মারা গেছেন। বাপ হারানোর ব্যথা তখন বুঝতে পারোনি। এবার হয়তো পারবে-আমি তো তোমার বাবাই ছিলাম। তোমাকে ঠিক ছেলে হিসেবেই দেখেছি। এবার তুমি আবার বাবা হারা হতে যাচ্ছ। কষ্ট পাবে জানি। তবু আমি বলি-কষ্ট পেয়ো না। মানুষ কি চিরদিন বেঁচে থাকে।’ আমার ভেতরের কান্না ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালাম।

ওইদিনই বিকালে স্যার বাসায় ফিরে গেলেন। হাসপাতালে মোটেই থাকতে চাইতেন না। অ্যান্টিবায়োটিক স্যালাইন নেওয়া কিংবা ব্লাড নেওয়ার প্রয়োজন হলেই সিএমএইচে আসতেন-নেওয়া হলে আবার চলে যেতেন। ডাক্তাররা তাকে পিতৃজ্ঞানে সেবা করতেন। একনাগাড়ে ২-৩ দিন হাসপাতালে থাকার অনুরোধ তিনি রাখতেন না। চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাওয়ার কথা বললে তিনি ক্ষেপে যেতেন। সিএমএইচের চিকিৎসা তিনি সবচেয়ে বেশি ভালো মনে করতেন। তার ইচ্ছা ছিল অ্যান্টিবায়োটিক স্যালাইন নেওয়ার কোর্স শেষ হলেই একবার রংপুর যাবেন। তার জন্য তিনি তারিখও ঠিক করেছিলেন।

২৮ জুন তারিখে স্যার রংপুর যাবেন। মেজর খালেদ ও জাহাঙ্গীর সব ঠিকঠাক করলেন। হেলিকপ্টারে তিনি যাবেন-মাঝখানে একদিন পল্লীনিবাসে থাকবেন-পরের দিন ঢাকা ফিরবেন-এভাবেই সব ঠিক করা ছিল। কিন্তু সেই দিনটা আর এলো না। ২৫ জুন যখন স্যারকে দেখতে বারিধারায় তার প্রেসিডেন্ট পার্কে গেলাম তখন তিনি ঘুমিয়েছিলেন। নিপা-মানে তার পরিচর্যায় নিয়োজিত মেয়েটা, তাকেও স্যার মেয়ের মতো দেখতেন-ও বলল, স্যার কেবল ঘুমিয়েছেন, ডাক দিয়েন না, অনেকক্ষণ ঘুমুবে। ওইদিনই স্যারকে ঘুমুতে দেখে আসা হলো-আমার স্যারকে কাছে থেকে শেষ দেখা।

পরের দিন সকালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে সিএমএইচের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ১৮ দিন তিনি লড়াই করলেন মৃত্যুর সঙ্গে। তার পর ১৯তম দিনে মানবজীবনের অবধারিত পরাজয় তাকে বরণ করতে হলো। ১৪ জুলাই ভোর ৭টা ৪৫ মিনিটে তার জীবন প্রদীপ ভোরের আলোতেই অস্তমিত হয়ে গেল-বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রেখে গেলেন অজস্র কীর্তিগাথা-চির অমলিন কাব্য। বহু সত্তার সমন্বয় ঘটেছে যার মাঝে তার নামই পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একটি অ্যারাবিক শব্দ ‘এরশাদ’ যার শব্দগত বাংলা অর্থ ‘বর্ণনা’।

একটি শব্দ যদি দুর্বোধ্য মনে হয়, তা হলে তা বোঝানোর জন্য প্রয়োজন হয় সহজ বর্ণনার মাধ্যমে বোধগম্য করে তোলা। অন্যথায় শব্দটি যতই গুরুত্ববহ হোক না কেন, সেটি জটিলতার জালে জড়িয়ে থাকে, সাধারণের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। ‘এরশাদ’ হচ্ছে এমন একটি শব্দ যা জটিলকে সরল করে তোলে এবং তা মানুষের হৃদয়গ্রাহী করতে সহায়তা করে। একটি শিশুর যখন নাম রাখা হয় সেটি আগেই সৃষ্টিকর্তার খাতায় লেখা হয়ে যায়। তাই নামের সঙ্গে চরিত্রের একটা সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়।

সব ধর্মের মূল যখন একই তখন এই বিশ্বাস থেকেই বলতে পারি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামটিও এসেছে সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে। এরশাদ নামের সঙ্গে তাই চরিত্রের অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। কারণ তিনি অনেক জটিলতার সহজ-সরল সমাধান দিয়েছেন। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মাঝে অন্যতম একটি ছিল কাব্যিক সত্তা। তিনি কবি-কবিতা লেখেন। তার কবিতায় রয়েছে সহজ-সরল বর্ণনা। এরশাদের কবিতা বুঝতে আকাশ-পাতাল চিন্তা করতে হয় না।

এখানে কবিতা নিয়ে আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়-প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় মাত্র। এর পর আসা যাক তার সৈনিক জীবনের কথায়। এটি একটি ছকে বাঁধা জীবনপন্থা। এখানে জটিল পথে অগ্রসরের সুযোগ নেই। সেই ছকে বাঁধা পথ অতিক্রম করে তিনি পৌঁছে গেছেন শীর্ষস্থানে। তার পর আসে তার রাষ্ট্রশাসনের আরেকটি সত্তা। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে জটিল-কুটিল ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়নি। অত্যন্ত সহজ-সরল ও শান্তিপূর্ণভাবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। একটি দলীয় সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হলে সর্বত্র দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার কালো ছায়া নেমে আসে। দেশবাসীর জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

এতসব জটিল পরিস্থিতির সহজ-সরল সমাধান খুঁজলেন দেশ চালাতে অক্ষম এক রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি সহজ সমাধানের পথ হিসেবেই বেছে নিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। সত্য-সত্যই এরশাদ নামের বৈশিষ্ট্যের মতো বাংলাদেশের জটিল থেকে জটিলতর সমস্যার একের পর এক সহজ সমাধান দিতে শুরু করলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি অন্ধকারে ডুবন্ত জাতিকে আলোর সন্ধান দিলেন। রাজনৈতিক ঈর্ষাপরায়ণতাবশত কারও সাফল্যকে স্বীকৃতি না দেওয়া, সত্যকে স্বীকার না করা কিংবা ইতিহাসকে বিকৃত করা বা মুছে ফেলার প্রবণতা আমাদের এখানে প্রবল।

ফলে রাজনীতি বা গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ শুধু ব্যাহতই হচ্ছে না-বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্রমাগত। এখান থেকে উত্তরণের পথনির্দেশনা যিনি দিয়েছেন, তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কী সেই দিকনির্দেশনা তার বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন এখানে নেই। তার মুখে উচ্চারিত একটি মাত্র সহজ-সরল বাক্যের মধ্যেই নিহিত আছে বিস্তৃত ভাবার্থ। তিনি বহুবার বহুভাবে বলেছেন আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিত্যাগ করে সুষ্ঠু রাজনীতির শান্ত সুনিবিড় দেশ গড়ে তুলি। অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তিনি অনেক সৃষ্টি করেছেন। অনেক রাজনৈতিক বক্তব্য তার আছে, যা স্মরণীয় বাণী হয়ে থাকবে।

যেমন- ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’, ‘মুক্তিযোদ্ধারাই এ দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান’ ইত্যাদি উক্তির চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর বড় সত্য কী আছে। তিনি রাজনীতিতেও দিয়েছেন সহজ-সরল সমাধান। একজন রাজনৈতিক নেতাকে অমরত্ব দিতে পারে তার যে কোনো একটি মাত্র কৃতিত্ব। কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রয়েছে বহুমুখী সাফল্য। তার কর্মজীবনের তিনটি স্তর যেমন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ এবং সংস্কারক হিসেবে সব স্তরেই তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন উপযোগী কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এইচএম এরশাদ দিয়েছেন উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, গড়েছেন স্বনির্ভরতার সোপান, সৃষ্টি করেছেন অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। এ

খানে তার উদাহরণ উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কারণ এরশাদ আমলের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা সাধারণ মানুষের মুখে-মুখে উচ্চারিত হয়। তার পর রাজনীতিবিদ হিসেবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই হলেন সেই নেতা-যিনি ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, সংঘাত-সন্ত্রাসের রাজনীতির বিপরীতে শান্তি-সমৃদ্ধি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সভ্যতা-ভব্যতা, মনুষ্যত্ব, মানবিকতা বিকাশের রাজনীতি প্রচলনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে-এই কালজয়ী স্লোগান নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।

ক্ষমতা গ্রহণ করে ১৮ দফা কর্মসূচি নিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার শুধু স্বপ্নই নয়-তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি অবিশ্রাম কাজ করেছেন। ৯ বছরের শাসনামলে তিনি তার পরিকল্পনা সফল করতে অনেক এগিয়ে গেছেন। যদিও রাজনৈতিক পরিবেশ তার অনুকূলে ছিল না। কিন্তু দক্ষতা-যোগ্যতা ও দেশ পরিচালনার মতো অভিজ্ঞতা থাকলে যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তা পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রমাণ করে দিয়েছেন। এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পৌনঃপুনিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো, হত্যা, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা, সহিংসতার দুর্দান্ত দাপট গণতন্ত্রকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিমূলে দাঁড় করাতে সার্বিক ব্যর্থতা, এমন একটা পরিস্থিতিতে সামরিক শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার যথাযথ অনুশীলন এবং আর্থসামাজিক-প্রশাসনিক অর্থাৎ জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের ঘুণেধরা ব্যবস্থা ও ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে স্বাধীন দেশের উপযোগী মৌলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শুরু হয়েছিল জাতীয় পার্টির অভিযাত্রা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পার্টি গঠনের পর থেকে জাতীয় পার্টির ঘোষিত লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে জাতিকে একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। পল্লীবন্ধু এরশাদ এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তিত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন-যিনি এখন শুধু এক ব্যক্তি নন-তিনি এক মহান প্রতিষ্ঠান, শুধু প্রতিষ্ঠান নয়-এরশাদ এক জীবন্ত ইতিহাস-এক জীবন্ত কিংবদন্তি-বাংলাদেশের আশীর্বাদ।

সবকিছু ছাপিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন সব মানবিক গুণাবলি সংবলিত একজন নিখাদ ভদ্রলোক। তার অমায়িক ব্যবহার দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে মুগ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষ। কারও দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা-ভালোবাসা, মানুষকে একান্ত আপন করে নেওয়া ছিল তার চরিত্রের অন্যতম গুণ। তিনি তার কর্মে-কীর্তিতে বাংলাদেশের মানুষের মনে যেভাবে জায়গা করে নিয়েছেন-তা অমলিন থাকবে চিরকাল।

পাদটীকা : তার একটি অতৃপ্ত বাসনা থেকে গেছে-তার জন্য আমাকেও জ্বলতে হবে সারাজীবন। পল্লীবন্ধু এরশাদ তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় অধ্যায় লেখা শেষ করেছেন। গ্রন্থটির কম্পোজ, পেজ মেকআপ, প্রচ্ছদ সবই প্রস্তুত হয়ে গেছে, শুধু ছাপাটাই বাকি। অসুস্থ থাকাকালীন যতবারই স্যারকে দেখতে গিয়েছি, ততবারই বলতেন, বইটা কি আমার হাতে দিতে পারবা না? বলতাম, কাজ করে যাচ্ছি-একটু সময় তো লাগবে। কিন্তু সেই সময় যে এভাবে ফুরিয়ে যাবে তা কি কখনো ভাবতেও চেষ্টা করেছি! পল্লীবন্ধু এরশাদের লেখা ২৫টা বই প্রকাশিত হয়েছে।

তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ডামি বইটা স্যারের হাতে দিতে পেরেছিলাম ছাপিয়ে দিতে পারিনি। এই দুঃখই আমার থেকে গেল। তবে স্যারের অতি স্নেহের অনুজ জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি পল্লীবন্ধু এরশাদের লেখা শেষ গ্রন্থ ‘আমার জীবনের অবশিষ্ট অধ্যায়’ খুব তাড়াতাড়িই প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। 

সুনীল শুভরায় : প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় পার্টি এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি

advertisement