advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জাহালামকে নিয়ে জজ মিয়ার নাটক হতো : হাইকোর্ট

১৬ জুলাই ২০১৯ ১৯:৪৪
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৯ ১৯:৪৪
advertisement

গণমাধ্যমে নিরপরাধ জাহালমের কারাভোগের খবর প্রকাশিত না হলে তাকে নিয়ে হয়তো জজ মিয়ার নাটক হতো। তার বিচার হয়ে শাস্তিও হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

জাহালমের কারাবাসের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়ী করে দাখিল করা প্রতিবেদনের ওপর শুনানিকালে আজ মঙ্গলবার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন।

শুনানি শেষে আদালত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুদক কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা ২১ আগস্টের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা ব্র্যাক ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট আগামী ২১ আগস্ট এ ব্যাপারে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

এর আগে টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক নিরাপরাধ জাহালামের কারাভোগের জন্য দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের দায়ী করে গত ১১ জুলাই হাইকোর্টে প্রতিবেন দাখিল করে। দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করার ভুলটি হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কারণে।

দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভুল পথে চালিত করতে ভূমিকা রেখেছেন ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং অ্যাকাউন্টের (ব্যাংক হিসাব) ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয়দানকারীরা। তবে সঠিক ঘটনা তথা সত্য উদঘাটন করে আদালতের নিকট উপস্থাপন করাটাই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর বা অন্য কারও ওপর এই দায়িত্ব অর্পন করার কোনো সুযোগ নেই।’

আজ গতকাল এ প্রতিবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানিকালে হাইকোর্ট প্রতিবেদনটির ব্যাপারে প্রসংশা করলেও দুদক যর্থ বলে মন্তব্য করেন। আদালত বলেন, জালিয়াতি করে ১৮কোটি টাকা নিয়ে গেল, কিন্তু সেই টাকা কোথায়, সেটা বের করতে পারলেন না। এটা তো তদন্তেরই অংশ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাহায্য নিতে পারতেন। তাদের তো লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল। তারা বলতে পারবে টাকা কোথায় গেছে। আপনি (দুদক) তো হাত গুটিয়ে বসে আছেন। সেই আবু সালেককে গ্রেপ্তার করতে পেরেছেন?

জবাবে দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে আজ পর্যন্ত গ্রেপ্তার সম্ভব হয়নি।’ এ সময় আদালত বলেন, ‘টাকা কোথায় গেল তা বের করতে পারলেন না। আপনি (দুদক) তো ব্যর্থ। আপনি মানিলন্ডারিং মামলার তদন্ত করতে পারবেন না।’

তদন্ত প্রতিবেদনের শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এখানে অনেকেই জড়িত। অনেক লোক এখানে বাদ পড়েছে। এছাড়া একটা লোক একাধিক একাউন্ট খুললো কিভাবে। ১৮টি একাউন্ট এক নামে কিভাবে সম্ভব হলো এটা আমরা দেখবো।’

 

আদালত এ ঘটনার দায় হিসেবে দুদককে নয়, ব্যক্তিগতভাবে জরিমানা করবে বলে জানান। তবে তার আগে দুদক কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটা দেখার কথা জানান।

এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার আদালতকে বলেন, ‘এখানে কমিশনের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা, অবহেলা আছে। ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১২ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে একটি ‘বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে’ প্রতিবেদন হয়। এরপর মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাশিমপুর কারাগারে জাহালমের সঙ্গে দেখা করেন এবং তার বিনা দোষে কারাভোগের বিষয়টি দুদক চেয়ারম্যানকে জানান। এখানে কমিশনের ব্যর্থতা আছে। গণমাধ্যমে না আসলে হয়তো জাহালমকে এখনও কারাগারে থাকতে হতো।

এ সময় আদালত বলেন, ‘তাকে হয়তো জজ মিয়ার মতো নাকট হতো। তার বিচার হয়ে শাস্তিও হয়ে যেত।’

এরপর আদালতে ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান এবং সোনালী ব্যাংকের পক্ষে ব্যারিস্টার জাকির হোসেন। শুনানির শেষের দিকে আদালত সোনালী ও ব্র্যাক ব্যাংক এবং দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, দুদকসহ ব্যাংকের যারা এ ঘটনায় দায়ী, তাদের দিকে খেয়াল রাখবেন, যেন চাকরি ছেড়ে পালিয়ে না যায়। দেখলাম অনেকে চাকরি ছেড়েও গেছে। 

উল্লেখ্য, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। কিন্তু দুদকের ভুলে সালেকের বদলে তিন বছর ধরে কারাগারে কাটাতে হয় টাঙ্গাইলের জাহালমকে।

এ নিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি একটি জাতীয় টেলিভিশনকে  ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন হাইকোর্টের উপরোক্ত বেঞ্চের নজরে আনেন আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। পরে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন।

সব পক্ষের বক্তব্য শুনে গত ৩ ফেব্রুয়ারি জাহালমকে অর্থ জালিয়াতির মামলা থেকে অব্যহতি দিয়ে ওই দিনই মুক্তির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী সেদিন তিনি মুক্তিও পান। এরপর গত ১৭ এপ্রিল পাটকল শ্রমিক নিরীহ জাহালমের বিনাদোষে তিন বছর কারাভোগ নিয়ে দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন তলব করেন হাইকোর্ট। সেই আদেশ অনুযায়ী প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক।

advertisement