advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাজনীতিকদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি

২০ জুলাই ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯ ০৮:৫৬
advertisement

সমাজবদ্ধ মানুষের চাহিদা সীমাহীন। কিন্তু চাহিদা পূরণের জন্য যা প্রয়োজন, ইতিহাস সাক্ষী, সব সময় তা সীমিত। ফলে মানুষের সাধ এবং সাধ্যের সমন্বয় ঘটানোর ছিদ্রপথে জন্মলাভ করে ভিন্নমত। এই ভিন্নমতের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় ভিন্নপথ। এই ভিন্নমত ও ভিন্নপথের সামাজিক বৃক্ষে হাজারো সুস্বাদু ফলের সঙ্গে জন্ম হয় দ্বন্দ্ব বা সংঘাত নামের বিষাক্ত ফলেরও। রাজনীতির প্রধানতম লক্ষ্য হলো সমাজজীবনে দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের নিরসন ঘটানো এবং তাও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায়। ভিন্নমত নির্মূল করা রাজনীতির কাজ নয়। রাজনীতির কাজ নয় ভিন্নপথের সব মুখ বন্ধ করা।

ভিন্নমত ও ভিন্নপথ বন্ধ হলে চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে আসে প্রগতির পথ। বন্ধ হয়ে আসে অগ্রগতির শত বাতায়ন। বন্ধ হবে চিরদিনের জন্য নতুনের অভিযাত্রা। তাই রাজনীতির ভিন্নমত ও পথের বাঁকা এবং কঙ্কর বিছানো পিচ্ছিল পথে অগ্রসর হয়ে দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটাতে সতত অগ্রসরমান। এসব কারণে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল রাজনীতি বিজ্ঞানকে চিহ্নিত করেছিলেন সমাজের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানরূপে। তিনি রাজনীতিবিজ্ঞানকে সমাজের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান বলছিলেন দুটি কারণে। দুই. মানবের রয়েছে একদিকে যেমন তাদের চাহিদা সম্পর্কে পরিবর্তনশীল বিচিত্র ভাবনা-চিন্তা, অন্যদিকে তেমনি তাদের রয়েছে বিবেক-বিচার এবং নীতি-নৈতিকতার এক আভরণ। অন্য কথায়, রাজনীতি অথবা রাজনৈতিক কর্মকা- অর্থপূূর্ণ হয়ে ওঠে শুধু সমাজবদ্ধ মানুষের চাহিদার সন্তুষ্টির ব্যাপকতা এবং নৈতিকতার আলোকে।

এজন্য প্রয়োজন হয় একদিকে যেমন রাজনীতিকদের সুচিন্তিত পরিকল্পনা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর পরিশ্রম, অন্যদিকে তেমনি সুনীতি ও সুরুচির আশীর্বাদ, ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ এবং নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা। এ ক্ষেত্রে সাফল্যের মানদ- হলো বিভিন্ন গোষ্ঠী অথবা দলের মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্ব বা সংঘাত নিরসনে কৃতিত্বের গভীরতা এবং রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার দক্ষতা। জেডিবি মিলারের কথায়, ‘রাজনীতি হলো গভীর নৈতিকতাবোধ উদ্দীপ্ত কিছু সামাজিক কর্মকা- সম্পন্ন করার মাধ্যম’ (‘politics is a means of getting things done, often with a strong sense of moral uragency’)। এদিক থেকে বিশ্লেষণ করলে তৃতীয় বিশ্বের নতুন একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনীতির যে চিত্র আমরা দেখি, তা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাজনীতিকদের প্রধান কাজ হলো সংঘাত নিরসনের পরিবর্তে নতুনভাবে সংঘাতের জন্ম দেওয়া।

জাতীয় পর্যায়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিভাজন রেখাকে আরও গাঢ় করা। জনকল্যাণের কথা সব সময় তারা উচ্চারণ করেন বটে, কিন্তু যেহেতু এসব দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক আত্মস্বার্থতাড়িত, তাই ব্যক্তিগত বা দলীয় পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা অত্যন্ত উঁচু। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের কাছে আমানতস্বরূপ নয়, বরং প্রভাব-বৈভব অর্জনের মাধ্যম মাত্র। রাজনীতির প্রকৃতি যে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চ গ্রামে সংগ্রথিত, তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে তার কোনো প্রতিফলন চোখে পড়ে না। রাষ্ট্রক্ষমতা তাই রাজনীতিকদের কাছে মহামূল্যবান মণিমুক্তার মতো। রাষ্ট্রক্ষমতার মতো এমন দুর্লভ বস্তু আর নেই। যারা ক্ষমতাসীন তারা এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণে কৃতসংকল্প। যারা ক্ষমতার বাইরে রয়েছেন তারা ক্ষমতার এই দুর্গটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যও কৃতসংকল্প, তা যে কোনো প্রকারেই হোক না কেন। ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতালাভে দৃঢ়সংকল্প উভয়ের গুরু কিন্তু অ্যারিস্টটল বা প্লেটো নন।

তাদের গুরু মেকিয়েভেলি। লক্ষ্য যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, একে দোহন করাই হোক অথবা হোক না এর দখল, সব পন্থাই গ্রহণযোগ্য। নীতিবোধ এ ক্ষেত্রে অসহায়। নৈতিকতার কোনো সূত্র এ ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। লক্ষ্যই যেহেতু পন্থা নির্ধারণ করছে (‘End justifies the means’), তাই ন্যায়-অন্যায় চিন্তায় কেউ ক্লিষ্ট নয়। রাষ্ট্র তখন আর নৈতিক প্রতিষ্ঠান (‘A moral institution’), থাকে না। ১৯৬১ সালের ১৬ নভেম্বর ঞযব ঞরসবং পত্রিকায় প্রকাশিত এক আক্ষেপবাণীতে এমনি এক নীতিহীন রাষ্ট্রের রাজনীতিকদের প্রকৃতির বিশদ বিবরণ দেখা যায়। লেখা হয়েছিল : ‘সেই সব উচ্চকণ্ঠ এবং অসংলগ্ন প্রতিশ্রুতি। অসম্ভব সব দাবি। ভিত্তিহীন পরিকল্পনা আর অকার্যকর প্রকল্পের জগাখিচুড়ি নিরেট সুবিধাবাদিতা যার সঙ্গে সত্যের বা ন্যায়নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। অযৌক্তিক খ্যাতির পেছনে পাগলা ঘোড়ার মতো ছোটাছুটি।

নিয়ন্ত্রণবিহীন আবেগের জ্বালামুখ উন্মুক্তকরণ। নিম্নস্তরের প্রবৃত্তির লালন। তথ্যের বিকৃতি। সেসব ব্যর্থ অর্থহীন বৃথা আস্ফালন’  ‍All those noisy and incoherent promises, the implssible demands, the hotchpotch of unfounded ideas and impractical plans...opportunism that cares neither for truth nor justice; the inglorious chase after unmerited fames, the unleashing of uncontrollable passions, the exploitation of the lowest instincts, the distortion of facts...all that feverish and sterile fuss') রাজনীতিকদের কাজকর্মের ছিরি এমন হলে রাজনীতি হারায় তার চিৎশক্তি। হারায় তার গতি অসামাজিকতার ঊষর মরুভূমিতে। অর্থহীন হয়ে উঠি সমাজজীবনের বৃহত্তর পরিসরে। নৈতিকতার ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র তৈরি হয়, সক্রেটিসের কথায়, ‘সেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লক্ষ্য যে সমগ্র রাষ্ট্রের সর্বাধিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা’ (According to the rules, there will be a large number of people living in Rangpur) তা পর্যন্ত ব্যাহত হয়। রাষ্ট্রে বসবাসরত জনসমষ্টি বিভিন্ন ক্ষুদ্র স্বার্থের দেয়ালে আটকা পড়ে হয় বিভক্ত।

জনসাধারণ যে মহান আদর্শে সম্মিলিত হয়ে রাষ্ট্র গড়ার চুক্তির মাধ্যমে সংহত হয়েছে তা ফিকে হয়ে আসে। যে দেশপ্রেমের অমোঘ আকর্ষণে অনাদিকাল থেকে দেশপ্রেমিকরা দেশ রক্ষার নিমিত্তে অকাতরে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে এসেছেন তা তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে ওঠে। জাতীয়তাবাদের বন্ধন হয় শিথিল। রাষ্ট্রজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ষড়যন্ত্র বাসা বাঁধতে পারে আর এই ষড়যন্ত্রে অংশীদার হয় একদিকে যেমন রাষ্ট্রের ভেতর থেকে কিছু কুচক্রী, অন্যদিকে তেমনি বাইরে থেকে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি। তখন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের আজকের অবস্থা কি তা থেকে কিছু ভিন্ন? যে দেশটির জন্ম হয়েছিল সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে, তখনকার প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে; এক জনযুদ্ধের সার্বিক শিহরণের তীর ঘেঁষে, তার দিকে দৃষ্টি দিন, দেখবেন কত অসহায় আমাদের সেই দেশটি! প্রায় সতেরো কোটি মানুষের আশ্বাসের সেই বাংলাদেশ আজ হাজারো প্রকরণে বিভক্ত।

আমাদের বিশ্বাসের সেই বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সামাজিক শক্তি আজ খণ্ডিত, খণ্ডিত ছিন্ন এবং ফলে গতিহীন, দ্যুতিহীন। আমাদের স্বপ্নের যে দেশটিকে ঘিরে হাজার বছরের সঞ্চিত স্বপ্নালু ছায়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেই বাংলাদেশের চারদিকে শকুনের আনাগোনা শুরু হয়েছে। যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন পথ চলেছে সেই পথেও আজ ধুলো জমেছে। সব ধর্মের ও সব বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের এই তীর্থক্ষেত্র সংকীর্ণচিত্ত কিছু মানুষের প্ররোচনায় আজ বিশ্বদরবারে হারাতে বসেছে তার ঔজ্জ্বল্য। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা কিন্তু নির্বিকার। স্বাধীনতার পর থেকেই তারা চলেছেন একই পথে, নির্বিকারভাবে। এই পথ জনগণের চোখে স্বপ্ন মাখিয়ে দেওয়ার পথ নয়। এ পথ নয় চিৎকার করে জনগণের কানে কানে এই সত্য তুলে ধরা যে, ওঠো, জাগো, তোমরা তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারো-ভবিষ্যৎ রচনার এই তো সময়! তোমাদের মধ্যে সব বিভাজন রেখাকে মুছে ফেলে সম্মিলিত হও। ঐক্যবদ্ধ হও। তোমরাই দেশ। তোমরাই জাতি। তোমাদের অজেয় শক্তির কিছুটা ব্যয় করে দেশকে শক্তিশালী করো।

তারা রাজনীতি করেছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থে প্রয়োগের লক্ষ্যে। জনকল্যাণকে মুখ্যজ্ঞান তারা কোনোদিন করেননি। ন্যায়নিষ্ঠ হয়ে যার যা প্রাপ্য তারা কোনোদিন তা তাদের হাতে তুলে দেননি। তারা ন্যায়নীতিকে কোনোদিন মুখ্যরূপে বিবেচনায় আনেননি। নৈতিকতার পাঠ তাদের সম্পন্ন হয়নি। দুর্নীতি সব সময় তাদের চারপাশে বাবুই পাখির নৈপুণ্যের মতো সাথী হয়ে ফিরেছে। তারা রাজনীতিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে রূপান্তরিত করেছেন সব সময়। ক্ষমতার রাজনীতি যে চূড়ান্ত পর্যায়ে সংঘাতের রাজনীতিতে পরিণত হয় তা কখনো অনুধাবনে আনেনি। ফলে যে রাজনীতির জন্ম হয়েছে ভিন্নমতের ছিদ্রপথে সৃষ্ট সংঘাত নিরসনের জন্য, তারই চূড়ান্ত রূপ হয়ে পড়ে সংঘাতের রাজনীতি।

একবার কোনো জনপদে সংঘাতের রাজনীতি শুরু হলে তার সমাপ্তি ঘটে ওই জনপদের অধ্যাত্ম শক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করে। ওই জনপদের সঞ্চিত মূল্যবোধকে নির্দয়ভাবে বধ করে, জনকল্যাণমূলক সব চিন্তাভাবনাকে নির্বাসিত করে। সহজ কথায়, যে রাজনীতি নৈতিকতার সব স্পর্শমুক্ত তার এমনই পরিণতি সেই জনপদের জন্য অভিশাপরূপে দেখা দেয়। তাই বলি, নৈতিকতা সুস্থ রাজনীতির শুধু অলঙ্কার নয়, এর অন্যতম ভিত্তিও। নৈতিকতাবোধ রাজনীতিকে শুধু মহান করে না, রাজনীতিকে সুস্থ করে, সবল করে, জনগণের কাছে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

রাজনীতিকদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এজন্য শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অপরিহার্যও বটে। রাজনীতিকদের ন্যায়বোধ এজন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। ইংরেজ কবি টেনিসন লিখেছেন, ‘আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মসচেতনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ-এ তিনটি গুণই জীবনকে সার্বভৌম ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যায়।’ রাজনীতিকদের ক্ষেত্রেও এই তিনটি গুণ অপরিহার্য। এর সঙ্গে শুধু সংযুক্ত হতে হবে ন্যায়ানুগ মানসিকতা, নীতিবোধ ও নৈতিকতার পাঠ। রাজনীতি তখনই সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করবে। শাসকরা তখনই সমাজের কাছে দায়বদ্ধ হবে। তাদের প্রণীত নীতি তখন হয়ে উঠবে ন্যায়নীতি। দুর্নীতি তখন সমাজ থেকে হবে নির্বাসিত। নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে রাজনীতি হয়ে পড়বে সংঘাতময়। নৈতিকতার স্পর্শই ক্ষমতাকে কর্তৃত্বে রূপান্তরিত করে। ক্ষমতা অনেকটা পাশবিক। কর্তৃত্ব কিন্তু মানবিক। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা দুয়ের মধ্যে এই পার্থক্য যত শিগগির অনুধাবন করবেন ততই মঙ্গল।

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement