advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মধ্যাঞ্চলে বাড়ছে পানি, ভাঙছে নদী

আমাদের সময় ডেস্ক
২২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯ ০০:৩১
advertisement

যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি গতকাল আরও কিছুটা কমছে। ফলে উত্তরের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির গতকাল আরও কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। তবে পানি বাড়ছে মধ্যাঞ্চলের সব নদ-নদীতে। পদ্মা, মেঘনা ও আড়িয়ালখাঁ নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুর ও ঢাকার পাশের উপজেলা দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলায়। এসব জেলায় নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। বানভাসিদের জীবনে যোগ হচ্ছে নানামুখী দুর্ভোগ। পানি বাড়ছে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায়ও। নদীর পানি কমলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলায়। পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে চাঁদপুর-শরীয়তপুর, শিমুলিয়া-কাঁঠালিয়া এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঘাটে ঘাটে আটকা পড়েছে সহস্রাধিক যানবাহন।

এদিকে গত দুদিনে বানের পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে জামালপুর, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জনই শিশু। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় গোসল করতে নেমে পদ্মার স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হয়েছেন এক দম্পতি। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ

জামালপুর সদর ইউনিয়নের সূর্যনগর পূর্বপাড়া গ্রামের শাহীন মিয়ার মেয়ে সজনী খাতুন (১২), সোলায়মান হোসেনের মেয়ে সাথী বেগম (১০) ও মাসুদ মিয়ার মেয়ে

মৌসুমী আক্তার (৮) গতকাল দুপুরে কলাগাছের ভেলায় করে বাড়ির পাশে বানের পানি দেখতে যায়। একপর্যায়ে তিনজনই পানিতে পড়ে যায়। স্বজনরা তাদের উদ্ধার করেন। তবে ঘটনাস্থলেই সজনী ও সাথী মারা যায়। মৌসুমী আক্তারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই দিন দুপুরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বসতঘরের পেছনে গেলে পা পিছলে পানিতে পড়ে যান বৃদ্ধ আবদুল শেখ (৭০)। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এর তিন দিন আগে ঘুঘরাকান্দি এলাকায় বানের পানিতে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হন পৌর শহরের সীমারপাড়া গ্রামের শাজাহান মিয়ার ছেলে সুজন (২২)। গতকাল সকালে মেরুরচর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রাম থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। একই সময় পানিতে পড়ে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের কুতুবেরচর এলাকার ইয়াছিন মিয়ার শিশুসন্তান স্বাধীন (৪) মারা যায়। গত শনিবার রাতে সাপের কামড়ে রাজা-বাদশা (৫৫) একজন মারা যায়।

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার নগুয়াবাজারসংলগ্ন খড়িয়া নদীতে গত শনিবার বিকালে সোনিয়া আক্তার, রুমা ও খুশিসহ ৫ বান্ধবী বন্যার পানি দেখতে যায়। ডুবন্ত রাস্তার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় পা পিছলে খালে পড়ে যায় তারা। স্থানীয়রা এসে চারজনকে উদ্ধার করলেও সোনিয়া নিখোঁজ হয়ে যায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সোনিয়ার মৃতদেহ একটি খাল থেকে উদ্ধার করা হয়। সে স্থানীয় একটি মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ও নগুয়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের কন্যা।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বন্যার পানিতে পড়ে দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাড়ির উঠানে ওই শিশুর ভাসমান লাশ পাওয়া যায়। তার নাম তাকিয়া আক্তার। সে উপজেলার চরহরিরামপুর ইউনিয়নের ছমির বেপারির ডাঙ্গী গ্রামের কামাল খানের মেয়ে। এদিকে পদ্মার পানি বেড়ে উপজেলার গাজীরটেক, হরিরামপুর, চরঝাউকান্দা ও চরভদ্রাসন ইউনিয়নে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত চার হাজার পরিবার। তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। এ ছাড়া পদ্মা ও আড়িয়ালখাঁ নদে পানি বেড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে সদরপুর উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া, চরনাছিরপুর, চরমানাইর, ঢেউখালী ও আকোটেরচর এলাকা। এসব ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীর পর আড়িয়ালখাঁ নদেও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আড়িয়ালখাঁর ভাঙনে সন্ন্যাসীরচরে ২০ বসতবাড়ি এবং পদ্মার ভাঙনে বন্দরখোলা, কাঁঠালবাড়ি, চরজানাজাত ইউনিয়নে ৫০ বসতবাড়ি বিলীন হয়। একই সময়ে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি রুটের পদ্মায় পানি বেড়েছে ১৩ সেন্টিমিটার। প্রবল ঘূর্ণিস্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে অচলাবস্থা চলছে। কোনোমতে ৫টি ফেরি চলাচল করছে। দুই পারে আটকা পড়েছে সহস্রাধিক যানবাহন।

শরীয়তপুরের নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মা নদীতে গত ১০ দিনে পানি ১৪০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। এতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। পানি ওঠায় নড়িয়া-জাজিরা সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে নওপাড়ার মুন্সিকান্দি গ্রামে অস্থায়ীভাবে তীর রক্ষা কাজের ১০০ মিটার পদ্মায় অংশ ধসে গেছে।

চাঁদপুরে গত দুদিন ধরে পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি বাড়ছে। নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এসব ইউনিয়নের বাঁশগাড়ি, মাঝেরচর, গোয়ালনগর, রায়েরচরসহ বিভিন্ন উঁচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মাটি ধস অব্যাহত থাকায় ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও অনেক ঘরবাড়ি। এদিকে স্রোতের কারণে চাঁদপুর-শরীয়তপুর নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাঁচটি ফেরির মধ্যে দুটি সচল থাকলেও বাকি তিনটি স্রোতের মধ্যে চলাচল করায় বিকল হয়ে পড়েছে। গতকাল সকালে এই নৌরুটের হরিণাঘাটে পারের অপেক্ষায় ছিল কয়েকশ গাড়ি।

বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি কমেছে ৩৭ সেন্টিমিটার। গতকাল পানি বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

সিরাজগঞ্জে ?যমুনার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ২০ সেন্টিমিটার কমলেও গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। উজানে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আপাতত পানি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছে না পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্কীকরণ বিভাগ।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনো বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর বাঁধভাঙা পানি এখনো নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। পানিবন্দি পরিবারগুলো খাদ্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্যানিটেশন সংকটে পড়েছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমে তীব্র স্রোতে হারিয়ে যান আঞ্জুমান ও তার স্বামী ইমন। বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার খড়িয়া ও তেউটিয়া গ্রামের গত কয়েকটি পদ্মার ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়েছে ৭০ পরিবার। ভাঙনে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে আরও শতাধিক পরিবার ও খড়িয়া মাজে মসজিদ।

advertisement