advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বীর নিবাস’ নির্মাণেও দুর্নীতি

আব্দুল্লাহ কাফি
২২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯ ০৯:৫৬
advertisement

লাল-সবুজ রঙে রাঙানো দেয়াল, যেন বাংলাদেশের পতাকারই প্রতিচ্ছবি। সরকারের দেওয়া এই ‘বীর নিবাস’ পেয়ে মহাখুশি ছিলেন ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। কিন্তু যাদের জীবনের বিনিময়ে এই দেশ, সেখানে তারাও রেহাই পান না দুর্নীতির কালো থাবা থেকে। ‘বীর নিবাস’ নির্মাণে অস্বচ্ছতা, ঠিকাদারদের কাজে অনিয়ম, কাজ অসমাপ্ত রেখেই বুঝিয়ে দেওয়া, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, এমনকি জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটেছে।

সেই সঙ্গে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষা না করা, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, নতুন মাটি ফেলে ভিত উঁচু করে তার ওপর ভবন করা, ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা নয় মাস যুদ্ধ করে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে পৃথক দেশ সৃষ্টি করেছিলেন, পঁচাত্তরপরবর্তী ওইসব মুক্তিযোদ্ধা গৃহহীন ও অবহেলার পাত্র হয়ে পড়েন।

তাদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন কিন্তু ভূমিহীন ও অস্বচ্ছল, কেবল তাদের জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। পরবর্তীতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি) দায়িত্ব দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২৭১ কোটি ১১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে দেশের ৪৮৪টি উপজেলায় ২ হাজার ৯৬২টি আবাসন ভবন নির্মাণ করা হয়।

যদিও একনেকে অনুমোদন পায় ২ হাজার ৯৭১টি ভবন। প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে একতলা ভিতবিশিষ্ট প্রত্যেকটি ভবনে দুটি বেডরুম, একটি ড্রইং রুম, একটি কিচেন ও একটি বারান্দা নির্মাণ। এর বাইরে একটি টিউবওয়েল, একটি টয়লেট এবং গবাদিপশু পালনের জন্য একটি শেড এবং হাঁস-মুরগি পালনের জন্য একটি পোলট্রি শেড নির্মাণ করা। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই টয়লেট ও পানীয় জলের সুবিধাসহ তিন রুমবিশিষ্ট ৫০০ বর্গফুট আয়তনের ওইসব বাসস্থান অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে আইএমইডি বাস্তবায়িত প্রকল্পের প্রভাব মূল্যালয়ন সমীক্ষা পরিচালনার করার লক্ষ্যে ‘হিউম্যান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (হিডস)’ সঙ্গে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার লক্ষ্য ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা যাচাই করা। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই টয়লেট ও পানীয় জলের সুবিধাসহ তিন রুমবিশিষ্ট ৫০০ বর্গফুট আয়তনের ওইসব বাসস্থান অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে মূল্যালয়ন সমীক্ষা পরিচালনার লক্ষ্যে হিউম্যান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (হিডস) সঙ্গে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর চুক্তি করে আইএমইডি। প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা যাচাই করাই ছিল এর লক্ষ্য। দেশের নির্বাচিত ১০টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে একটি মূল্যালয়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

সরকারের এই সংস্থাটি বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিয়োগ না করা, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া, অর্থছাড়ে বিলম্ব, কাজের তুলনায় অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্পের কার্যক্রম সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত না করা, মালামাল ক্রয়ে জটিলতা ও দীর্ঘসময় ব্যয়, বিভাগ মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত মনিটরিং না করা, ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন, সুফলভোগীদের অসহযোগিতা ও বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন না করার কারণে ইতোমধ্যে ‘বীর নিবাস’ ভবনে নানা ত্রুটি ধরা পড়েছে। কোনো কোনো ভবনে বছর যেতে না যেতেই ছাদে ফাটল ধরেছে।

গবাদিপশুর ঘর নির্মাণের কথা থাকলেও অনেক ‘বীর নিবাস’-এ তা করা হয়নি। বসানো হয়নি টিউবওয়েল। আবার কোথাও কোথাও আংশিক কাজ করেই প্রকল্পের টাকা তুলে খেয়ে ফেলেছেন ঠিকাদার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. খলিলুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনো কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা জীবন বাজি রেখে আমাদের স্বাধীনতা দিলেন, যাদের ঋণ কোনো দিন শোধ হওয়ার নয়, তাদের জন্য সরকারের দেওয়া উপহারে অনিয়ম কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না।’

আংশিক কাজ করেই টাকা তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার : দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের বাদুল্লাপুর গ্রামে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত রফিকুল ইসলামেরকে পরিবারকে ‘বীর নিবাস’ দেওয়া হয়। সরেজমিন তা দেখতে যান আমাদের সময়ের প্রতিনিধি মো. নুরুল হক।

তিনি জানান, ভবন নির্মাণ করলেও গ্রিল, সিঁড়ি দেওয়া হয়নি। এমনকি টিউবওয়েলও দেওয়া হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার বৃদ্ধা স্ত্রীর কথা চিন্তা না করেই ঠিকাদারের খেয়ালখুশিমতো ঘরের বাইরে তৈরি করা হয়েছে বাথরুম। তা ছাড়া এরই মধ্যে ঘরের অনেক জায়গায় ছোট ছোট ফাটল দেখা দিয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার রামশূল গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা যগেন্দ্রনাথ তালুকদারকে দেওয়া ‘বীর নিবাস’ তৈরিতেও নানা অনিয়মের কথা উঠে আসে।

যগেন্দ্রনাথ তালুকদার বলেন, ‘অসহায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বসবাসের জন্য ২০১৭ সালে আমার নামে একটি ঘর বরাদ্দ করে সরকার। বরাদ্দের কিছু দিনের মধ্যেই ঠিকাদার তার কাজ শুরু করলেও দীর্ঘ তিন বছরেও তা সম্পন্ন করতে পারেনি। যতটুকু করেছে সেটিও অতিনিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে। এতে বাধা দিলেও ঠিকাদার ও তার লোকজন আমাদের কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে। আবার কাজ অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদার চলে গেছে। এ ভবনে বৃষ্টিতে ও শীতকালে বসবাস করা খুবই কষ্ট হয়।

তবে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না এলে হয়তো মুক্তিযোদ্ধাই থাকতাম না, ঘরবাড়ির সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার সৈয়দ জিয়াউল হক বলেন, ‘কাজের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অনিয়ম করা হয়নি। আমি শুধু মালামাল কিনে দিয়েছি, বাকি কাজ উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার করেছেন।’ কাজের অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোটালীপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী দেবাশীষ বাকচি বলেন, ‘আমি সব সময় থেকে কাজ করিনি। তবে আমার জানা মতে কাজ খারাপ হয়নি। বাদবাকি কাজ আগামী মাসের ৫ তারিখের (৫ আগস্ট) মধ্যে শেষ হবে।’

এদিকে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পোতাজিয়া গ্রামে পাকা রাস্তার পাশে মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানের ‘বীর নিবাস’। এটি পরিদর্শন করে এসে আমাদের সময়ের জেলা প্রতিনিধি আতিক সিদ্দিকী জানান, বাড়ির মূল নকশায় গোয়ালঘর, মুরগির শেড এবং টয়লেট থাকলেও এর কিছুই করা হয়নি। এগুলো তৈরি না করেই ঠিকাদার বাড়ি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ রফিক বলেন, ‘নির্মাণকাজ যথাসময়ে সম্পন্ন হয়েছে। জায়গার অভাবে যেসব কাজ অসম্পন্ন থেকেছে সেগুলোর জন্য ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়নি। আগের প্ল্যানে হাঁস-মুরগি বা কাউশেড ছিল না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিরাজগঞ্জ জেলা অফিস থেকে এসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তাই এগুলো করা হয়নি।’

advertisement