advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গণপিটুনি ও ‘হাতের সুখ’ মেটানোর খায়েশ

চিররঞ্জন সরকার
২৪ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯ ০৮:৪৪
advertisement

মন খারাপ। হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেই। খুব ইচ্ছে হচ্ছে একটু ফুর্তি করব কিন্তু করা যাচ্ছে না। প্রতিবেশী দিনকে দিন বড়লোক হচ্ছে। অথচ আমি ঠিক সুবিধে করতে পারছি না। বউয়ে ঠিক পোষাচ্ছে না। মনটা আমার উড়–উড়ু। শালা, চেষ্টা করেও কাউকে পটাতে পারছি না। ইউটিউব, সিনেমা, পর্নো, ফেসবুকÑ সবকিছুই কেমন একঘেয়ে লাগছে। এদিকে বিশ্রী গরম। কতক্ষণ আর নিজেকে স্থির রাখা যায়? এ অবস্থায় হাতটা কেমন নিশপিশ করে। কেবল মনে হয়, যদি কাউকে পেটাতে পারতাম। মনের সুখ মিটিয়ে একটু মারতে পারতাম!

মারতে চাই যাদের, সেই আমলা-মন্ত্রী-সান্ত্রী, তাদের তো আর মারা যাবে না। ঠারেঠুরেও যদি তারা টের পায় যে, তাদের ওপর দুহাতের ‘সুখ’ মেটাতে চাইছি, তা হলেই সর্বনাশ। টেংরি ভেঙে দেবে। বাপ-দাদার নাম ভুলিয়ে ছাড়বে। ক্রসফায়ারেও সাধের প্রাণটা চলে যেতে পারে। কাজেই ‘বড়লোক’ মারার চিন্তাটা মাথা থেকে একেবারে উপড়ে ফেলতে হবে। ওটা খুবই রিস্কি গেম। তার চেয়ে ভালো ছোটখাটো, রোগা-পটকা, নামহীন-গোত্রহীন কাউকে টার্গেট করা। মেরে তক্তা বানিয়ে দেওয়া। এতে অস্থির মনটা একটু জুড়াবে। মানুষ হত্যার মজাই আলাদা। যোদ্ধা, ডাকাত, গাড়ি-চালক, পুলিশ, জল্লাদ ছাড়া অন্য পেশার লোকজন সাধারণত সরাসরি মানুষ হত্যার সুযোগ খুব একটা পায় না। কোনো পেশাগত দক্ষতা ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যদি সে সুযোগ সামনে চলে আসে, তা হলে আর ছাড়ে কে?

এখন আমাদের সবার সামনে পিটিয়ে মানুষ মারার এক মওকা এসেছে। এ মওকা করে দিয়েছে পদ্মা সেতু। কে বা কারা যেন রটিয়েছে, ‘পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে শিশুদের মাথা লাগবে।’ আর যায় কোথায়? গুজবের নৌকায় ভেসে ভেসে আমরা এখন ‘ছেলেধরা’ খুঁজছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা ভেবে এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখলেই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে সারাদেশে অন্তত দুই ডজন গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সেমিফাইনালের আগেই বাংলাদেশ দলের বিদায়ে সবার মধ্যে কেমন একটা ঝিমুনি এসেছিল। কিন্তু ছেলেধরা গুজব আমাদের সবার মধ্যেই আবার জোশ ফিরিয়ে দিয়েছে। সবার মধ্যে বেশ একটা মার-মার কাট-কাট অনুভূতি! সবার মধ্যেই টি- টোয়েন্টি ক্রিকেটের আদর্শ। কেবল পেটাও। নো খুচরা রান। নো টোকাটুকি। কেবলই চার-ছক্কা। কেবলই বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি।

আমাদের দেশে কোনো ইস্যুতেই সাধারণ মানুষকে এক হতে দেখা যায় না। এখানে যত মাথা তত মত। কিন্তু ছেলেধরা আর গণপিটুনি ইস্যুতে সবাই কেমন একমত হয়ে উঠেছেন। সবাই বিশ্বাস করছেন, সবাই মিলে মেরে-পিটিয়ে-খুঁচিয়ে মানুষ হত্যা করছেন। কারও মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, বিকার নেই, অবিশ্বাস নেই। সবার মধ্যে বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, উচ্চতর জিডিপির ঠা-া জলে সবাই যেন মুখ ধুয়ে এসেছে। কী শান্ত-সমাহিত আর তৃপ্ত সে মুখ!

বানের জলে দেশের একাংশ তলিয়ে যাচ্ছে। মানুষের দুর্দশার কোনো শেষ নেই। সেই বানভাসি দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কথা চিন্তা করে নিজের সুখ নষ্ট করার মতো ‘গাড়ল’ আমাদের আর নেই। আমরা সুখী হতে শিখে গেছি। আমরা সবকিছু ইতিবাচকভাবে দেখতেও শিখেছি। চতুর্দিকে প্রচুর লোককে যদি পিটিয়ে মারা যায়, তা হলে দেশের জনসংখ্যা কিছুটা হলেও কমবে। আর গণপিটুনির ভয়ে পাগল-মাথা-খারাপ, গরিব-দুঃখী, অনাথ, ভাবুক, ভিক্ষুকরা ‘সোজা’ হয়ে যাবে। তারা হয় বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দেবে, না হলে আদিম মানুষের মতো কোনো দুর্গম গুহায় আত্মগোপন করবে। তাতে করে আমাদের রাস্তাঘাট তকতকে হবে। কোথাও কোনো অনাকাক্সিক্ষত মানুষের আনাগোনা থাকবে না। কেবলই মার-না খাওয়া মানুষের প্রসন্ন মুখে দেশটা ভরে যাবে!

তা ছাড়া বাঙালির বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অপবাদ। তারা সবাই অলস-অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছে, ছেলে-বুড়ো সবাই মোবাইলে মু-ু সেঁধিয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে, কেউ কথা বলে না, গল্প করে না, কেবলই ডান হাতের আঙুলের ব্যায়াম ছাড়া কারও মধ্যে কোনো নড়াচড়া নেই! এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। ছেলেধরা গুজব মানুষকে কিছুটা হলেও এই ‘জড়ত্ব’ থেকে মুক্তি দিয়েছে। একটা তীব্র শারীরিক কসরতের মোহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। মোবাইলের পর্দা ছাড়াও এখন সবাই তার আশপাশের এলাকায় সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। সবাই যেন একেকজন ঝানু গোয়েন্দা। যদি কাউকে অপরিচিত মনে হয়, তার সাজপোশাক-চলাফেরা-কথা-আচরণে যদি একটু সন্দেহ করার কারণ থাকে (এমনকি কারণ না থাকলেও শুধু সন্দেহ হলেই হলো) ওমনি ‘ছেলেধরা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। নির্জনতম স্থানেও যদি এখন ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার করা যায়, তা হলে শত শত হাজার হাজার উন্মত্ত মানুষ পাওয়া কঠিন নয়। সবাই ছেলেধরাকে পেটাতে চায়।

এটা অবশ্য খুবই নিরাপদ শরীরচর্চা। এখানে আক্রান্ত হওয়ার ভয় নেই, ভেঙে যাওয়া কিংবা মচকানোর আশঙ্কা নেই, বরং মনের সাধ মিটিয়ে পেটানোর সুখ আছে। জীবনের যাবতীয় ক্ষোভ-দুঃখ-বঞ্চনা, মার খাওয়ার প্রতিশোধ আপনি নিতে পারেন মনের সুখে। এই পিটুনির সবচেয়ে বড় মজা হলো, এখানে একটা মানুষ মাত্র আপনার প্রতিপক্ষ। বাকি সবাই আপনার পক্ষে। শুধু একজনকে ‘ছেলেধরা’ সাব্যস্ত করুন এবং চিৎকার করে তা জানান দিন। আপনার দায়িত্ব এটুকুই। বাকি দায়িত্ব গ্রহণ করবে জনতা। মুহূর্তের মধ্যেই দেখবেন অসংখ্য হাত-পা চড়-কিল-লাথি হয়ে ঝরবে সেই কথিত ‘ছেলেধরা’র ওপর। সে কোনো প্রতিরোধ করতে পারবে না, শুধু হাউমাউ কাঁদবে আর বাঁচার জন্য ছটফটিয়ে যাবে। তার পর এক সময় নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকবে।

অবশ্য এই পেটানোর শিক্ষা আমরা সমাজ থেকেই পেয়েছি। ‘ধর্ম চিরকাল বলেছে, মারো! দেশ চিরকাল বলেছে, মারো! ক্ষিপ্ত দৃপ্ত প্রতিশোধলিপ্ত আঘাতমুষ্টির প্রান্তে এই মহান দুই স্রোত এসে মিলেছে। যুগে যুগে এই দেশে ধর্মের অজুহাতে নিরীহ লোককে থেঁতলানো হয়েছে, অপমান করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে। ধর্ম শেখায়, যে তোমার ধর্মের নয়, সে মানুষ নয়, তাকে মারা ভালো। দেশপ্রেম শেখায়, যে তোমার দেশের নয়, সে মানুষ নয়, তাকে মারা ভালো।’ আমরা আরও শিখেছি, যে তোমার দল করে না তাকে মারো। যে তোমার মতের পক্ষে নয়, তাকে মারো, ফাটিয়ে দাও, থেঁতলে দাও। আমাদের দেশে অভিভাবকরা পেটায়। পুলিশ ধরলে পেটায়। শিক্ষকরা পেটায়। স্বামীরা বউকে পেটায়। এ দেশে সাধারণ শিক্ষাই হচ্ছে : মারো, আরও আরও আরও। আমাদের হাত বাঁধা নেই। আমাদের চোখ বাঁধা নেই। আমাদের পায়েও কোনো শিকল নেই। শুধু অপারেশন করে যেভাবে অ্যাপেন্ডিসাইটিস বাদ দেয় আমরা ঠিক সেভাবে আমাদের বিবেককে বিসর্জন দিয়েছি। আমরা শুধু দেখি, শুনি আর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি। আমরা পকেটমার সন্দেহ হলে পেটাই। মোবাইল চোর সন্দেহ হলে পেটাই। ছেলেধরা সন্দেহ হলে পেটাই। নারী, গরিব-দুঃখী, ভবঘুরে, পাগল-মাথাখারাপ, প্রতিবন্ধীরা আমাদের এক নম্বর টার্গেট। এ ক্ষেত্রে ‘রাষ্ট্রীয় নীতি’ই এখন আমাদের আদর্শ। রাষ্ট্র যেমন চালচুলোহীন নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারে ‘হাপিস’ করে দেয়, কিন্তু রিফাত ফরাজী-রিশান ফরাজীদের বাঁচিয়ে রাখে, আমরাও ঠিক তেমনি। দুর্বলকে শায়েস্তা করতে আমাদের কোনো জুড়ি নেই।

আমরা খুনি-ধর্ষক-চাঁদাবাজ-ঘুষখোর-ঋণখেলাপি-কালোটাকার মালিক-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের কিছু বলি না। বেশিরভাগ গণপিটুনির শিকারই হয় ছিঁচকে চোর, নেশাখোর, প্রতিবন্ধী বা তেমন কেউ। সশস্ত্র ডাকাত, ছিনতাইকারী বা দাগি অপরাধীদের পিটিয়ে মারা হয়েছে, এমন সংখ্যা হাতেগোনা। ডাকাতদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র বা ভোজালি থাকতে পারে। পাল্টা আঘাত আসতে পারে। তাই দুর্বল কাউকে মারো, মেরে হাতের সুখ করে নাও। আমাদের আকাক্সক্ষার মধ্যেও রয়েছে ক্ষমতার বৈষম্য!

আসলে আমরাও চালাক হয়ে গেছি। মারতে চাই বটে, ‘হাতের সুখ’ মেটানোর খায়েশ আছে পুরোদমে। কিন্তু তার জন্য দুর্বল, গরিব-প্রতিবন্ধী ছেলেধরা খুঁজে বেড়াই। প্রকৃত ‘ছেলেধরা’ যারা দামি গাড়িতে, প্লেনে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনে যাতায়াত করে তাদের টিকির খোঁজ আমরা কখনই রাখি না!

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

 

advertisement