advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পিপলস লিজিংয়ে দিশেহারা সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান

হারুন-অর-রশিদ
২৪ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯ ০২:৪৫
advertisement

পিপলস লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও ফার্স্ট ফাইন্যান্সÑ ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ আমানতকারীদের। তারা অর্থ ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এ অবস্থার মধ্যেই পিপলস লিজিংয়ের কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানতকারীরা আস্থা হারিয়ে অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের অর্থ তুলে নিতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় জমা রাখা অর্থ ব্যাংকগুলোও ফেরত নিয়ে নিচ্ছে এবং নতুন করে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বেকায়দায় পড়েছে দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাধ্য হয়ে গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলের কবিরের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্তৃক আমানত ফেরত নেওয়া বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানতকারীদের অর্থ চাহিবামাত্র ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যরত। প্রতিষ্ঠানগুলোয় সর্বমোট ৪৭ হাজার ৮৬৭ কোটি আমানত রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে ১৮ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা; যার মধ্যে ৫ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সূচকে খারাপ অবস্থানের কারণে ১২টিকে লাল তালিকাভুক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ৫টির অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ, যারা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। অর্থ ফেরত পেতে বিভিন্ন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও ব্যক্তি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তাদের মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশে একজন অবসায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের কাজ সম্পন্ন করবেন।

জনগণের অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি ব্যাংকের অর্থও আত্মসাৎ করেছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ৮৩৭ কোটি টাকা, এফএএস ফাইন্যান্স ৫০০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং ২৭৫ কোটি টাকা, বিআইএফসি ২০১ কোটি টাকা ও প্রাইম ফাইন্যান্স বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান থেকে ২০৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছে না। পিপলস লিজিং বন্ধ হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মেয়াদ পূর্তির আগে আমানতের অর্থ ফেরত চেয়েছে। এতে বেকায়দায় পড়েছে ভালো মানের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও।

নিয়মানুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি আমানত নিতে পারে না। তাদের অর্থের মূল উৎস ব্যাংক। ব্যাংকগুলো আমানত ফেরত নেওয়া শুরু করায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। এমনকি অনেক গ্রাহকও অর্থ তুলে নিচ্ছেন। একসঙ্গে অনেক আমানতকারী অর্থ ফেরত চাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। গত রবিবার ব্যাংকার্স সভায় গভর্নর ফজলে কবির ব্যাংকগুলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে একযোগে অর্থ উত্তোলন না করতে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে জরুরি সহায়তা পেতে গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিরা।

সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) নেতারা গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপদেষ্টা এসকে সুর চৌধুরী, ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ও আহমেদ জামাল, নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম, বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খলিলুর রহমান, আইডিএলসি এমডি আরিফ খান, আইপিডিসি এমডি মোমিনুল ইসলামসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এমডি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্যানিক সৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো গ্রাহকের চেক যেন ফেরত না যায় সেই বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ চেক ফেরত গেলেই সংকট আরও প্রকট হবে। চলমান সমস্যা সমাধানে সব ধরনের নীতি সহায়তা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলোকে আমানত তুলে না নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মেয়াদ পূর্তির আগে যেন কোনো অর্থ তুলে না নেওয়া হয়। সুশাসনের ঘাটতি নেই এমন প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট কাটাতে নতুন করে আমানত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হলে ব্যাংক খাতেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে বলা হয়েছে। বন্ড মার্কেট উন্নত করতে বলা হয়। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অন্য কারও সঙ্গে মার্জার হতে পারে সেই উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খলিলুর রহমান বলেন, কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে পুরো খাতে সমস্যা হচ্ছে। এক ধরনের প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকগুলোও অর্থ ফেরত নিচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খারাপ হলেও বাজারে ভালো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নীতি সহায়তা পেতে আমরা এসেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের আশ্বস্ত করেছে সব ধরনের সহায়তা করার। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।

আইপিডিসির এমডি মোমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক যদি অর্থ না রাখে তাহলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেকায়দায় পড়বে। আমাদের কাছে অর্থ রেখে ব্যাংকগুলো মুনাফা করছে। দুয়েকটি খারাপ প্রতিষ্ঠানের কারণে সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি একই আচরণ কাম্য নয়। আমানত রাখা এবং ফেরত দেওয়া এটি নিয়মিত কাজের অংশ। ভালো সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই এটি করছে। তিনি বলেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোগ নিয়েছে। যারা অর্থ নিয়েছেন তাদের অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। খেলাপিদের অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করা গেলে সংকট নিমিষেই সমাধান হয়ে যাবে। আমরা জনগণের টাকায় ব্যবসা করি। জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই তাদের অর্থ নিরাপদ। এখানে তারা অর্থ জমা রাখতে পারবেন এবং সময়মতো তা ফেরত পাবেন।

advertisement