advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধাক্কাটা পড়ে মেয়েদের ওপরই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
২৯ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০১৯ ০৯:২৯
advertisement

নর-নারীর সম্পর্কটা প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলোর একটি। বিয়েতে রয়েছে এই অত্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কটির সামাজিক অনুমোদন। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত একজন আমলা কলাম লিখেছেন পত্রিকায়। অবসরভাতা এসেছে হাতে। কিন্তু দেখছেন টাকাটা খরচ হয়ে যাবে। একটা খরচ আছে মেয়ের বিয়েতে। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, মেয়েটা অনার্স দিয়েছে, এখন তো বিয়ে দিতে হয়। বিয়েতে টাকা খরচ হবে বলে ভদ্রলোক চিন্তিত। হায় তিনি জানেন না পাত্র খুঁজতে গিয়ে এবং পাত্র পাওয়ার পর তার জন্য কত প্রকারের বিপদ-আপদ অপেক্ষা করছে। জানতে পারলে চোখের ঘুম হারাম হয়ে যেত, যেমন অধিকাংশ বাবারই হয়।

উপযুক্ত পাত্র পাওয়া মেয়েদের জন্য আগেও কঠিন ছিল, এখন আরও কঠিন হয়েছে। বিয়ের পর সংঘর্ষ বাধে; স্বামী তার ক্ষমতা প্রকাশ করতে চায়, স্ত্রী নির্যাতিত হয়। স্ত্রীরাও এখন আগের মতো ‘বশ্যতা’ মানতে চায় না। ফলে শান্তি বিঘিণ্নত হয়। আর আছে বিবাহবহির্ভূত প্রেম। এ ক্ষেত্রে পুরুষের তৎপরতাই অধিক, মেয়েদের তুলনায়। কারণ পুরুষের ক্ষমতা বেশি। ক্ষমতা পেলে মেয়েরাও পিছিয়ে থাকে না, এগিয়ে আসে। পিতৃতান্ত্রিকতা কর্তা খোঁজে এবং খোঁজ পেলে কাছে টেনে নেয়।

পরকীয়া অহরহ ঘটছে। এ নিয়ে খুনোখুনি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন পরিচিত সংস্কৃতিসেবী পরকীয়ার দরুন খুনের মামলাতে জড়িয়ে পড়ে নিজের জন্য বিস্তর বিড়ম্বনা এবং অন্যদের জন্য জ্যান্ত কৌতূহলের সৃষ্টি করেছেন। ইনি কবিতা লেখেন, গান লেখেন, গান গেয়েও থাকেন; তার রচনা পত্রিকায় ছাপা হয়, নিজেও সাহিত্যবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করেছিলেন, বইমেলা এলে দৈনিক পত্রিকায় নিজের ছবি ও বইয়ের নাম দিয়ে বড় বড় বিজ্ঞাপন ছাপেন। সরকারি চাকরি করতেন, অবসর নিয়েছেন। কিন্তু তার মনে হয় অবসর ছিল না।

পারিবারিক জীবন আছে, সন্তান রয়েছে, জানা গেল স্ত্রী উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে। তার বাড়ি-গাড়ি সবই রয়েছে, টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। অত যে বিত্ত করেছেন সেটা নিশ্চয়ই বৈধ উপায়ে নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন খোঁজ করেনি ঠিকই, কিন্তু নিজে নিজেই ফেঁসে গেছেন পরকীয়াতে। কাগজে এসেছে, তিনি বলেছেন ওই বয়সে পরকীয়া করাটা ঠিক হয়নি। যেন বয়সকালে ওই কাজ ঠিক ছিল, যেন বনানীর যুবকরা ঠিক কাজটাই করেছে, বয়সকালে ওই পথে গেছে। কিন্তু কেন গেলেন তিনি ওই বিশেষ পথে? গেছেন ভোগবাদিতার তাড়া খেয়ে এবং নগদানগদি ক্ষমতা লাভ করে।

ক্ষমতাটা টাকার। মেধা ছিল নিশ্চয়ই, নইলে অতদূর অগ্রসর হলেন কী করে? কিন্তু সবটাই শেষ পর্যন্ত চলে গেছে রিপুর অধীনে। রিপু দুরন্ত হয়ে পড়েছে ক্ষমতার প্রশ্রয়ে। গণধর্ষণে লিপ্ত হয় যে ধর্ষকরা তারা সবাই যে টাকাওয়ালা তা নয়, কিন্তু তাদের সবারই ক্ষমতা আছে, কারণ তারা পুরুষ। খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়া আমাদের এই সংস্কৃতিসেবীটি একে পুরুষ তার ওপর টাকাওয়ালা; বেপরোয়া হতে অসুবিধা কী? ধরা পড়াতেই না বিপদ, নইলে নিজের টাকায় ভাড়া করে দেওয়া ফ্ল্যাটে অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে সময়টা তো কাটছিল ভালোই। তা একজনের খবর জানা গেল, ক্ষমতাদর্পী এমন অসংখ্যজন ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজে।

পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, প্রাকৃতিক, যত রকমের বিপদ-আপদ, ঝড়-ঝঞ্ঝাই দেখা দিক না কেন, প্রথম ধাক্কাটা ঠিক ঠিক পড়ে গিয়ে মেয়েদের ওপরই। হাওরে বিপন্ন হয়েছিল প্রায় দুই কোটি মানুষ, অবর্ণনীয় কষ্ট সবারই হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ যে পোহাতে হয়েছে মেয়েদেরই এতে কোনো সন্দেহ নেই। জঙ্গি উৎখাতের অভিযানে বের হয়েছে র‌্যাব। ঝিনাইদহের মহেশপুর তারা যে বাড়িটি ঘেরাও করেছিল সেখানে গোলাগুলির বিনিময় ঘটেছে। নিহত হয়েছে দুজন। তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

কিন্তু নিরীহ মরিয়ম বিবির গাভীটি যে চলে গেল তার মীমাংসা কী? মরিয়ম বিবি জঙ্গি নয়, ওসব বিষয়ে খবরাখবর নেওয়ার তার সময় কোথায়? স্বামী কামলা খাটে অন্যের জমিতে, সংসার চালানোর জন্য এনজিওর ঋণে মরিয়ম গাভী কিনেছিল একটি। গাভীটি বাঁধা ছিল গাছের নিচে। নিরাপদ দূরত্বে। র‌্যাবের গুলিতে বিদ্ধ হয়েছে সে সেখানেই। মরিয়মের কান্না থামে না। আয়-উপার্জন চলে যাবে, ঋণের বোঝাটি রয়ে যাবে ঘাড়ের ওপর। উলুখাগড়াদের ভেতরও ইতরবিশেষ আছে, মরিয়ম বিবিদের বিপদটাই বেশি। নারী বলে।

এনজিও ঋণ মহাজনী ঋণের চেয়ে কম দুর্বিষহ নয়। সেটা তো জানাই আছে আমাদের। কিন্তু ঘরের মানুষটি যে তার চেয়েও নির্মম হতে পারে সে-ও সত্য। জেনেছে তা বগুড়ার সেই গৃহবধূটিও স্বামী যাকে ঘরের ভেতরে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার আয়োজন করেছিল। উদ্ধার করেছে এনজিওর লোক; তারা ত্রাণকার্যে আসেনি, এসেছিল ঋণের কিস্তি উসুলের জন্য। মেয়েটি ঋণ করেছে এনজিও থেকে, সেই টাকা বিনিয়োগ করে আয়-উপার্জনও কিছু করত নিশ্চয়ই। কিন্তু স্বামী সন্তুষ্ট ছিল না, স্বামী চাপ দিত বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার। এনেছেও। বারকয়েক এনেছে। শেষে আর পারবে না বলায় স্বামী তাকে প্রহার করেছে, অজ্ঞান করে ফেলেছে এবং নিশ্চিহ্ন করে ফেলে দেওয়ার জন্য ঘরের ভেতরে মাটিতে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেছিল। সুদের টাকা আদায়ওয়ালারা সময়মতো উদিত না হলে ঘরের ভেতরই কবর হতো। অন্ধকারে। মৃতরা কবর দাবি করে, কিন্তু জীবিতদেরও অনেকেই কবরে থাকে, বিশেষ করে মেয়েরা।

একাত্তর সালটা বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ছিল চরম দুর্দশার। পাকিস্তানি হানাদাররা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের লেলিয়ে দিয়েছিল। ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছিল যা ইচ্ছা তাই করার। তারা সেটা করেছেও। রাষ্ট্রীয় সমর্থনে ক্ষমতাবান হয়ে হত্যা, অস্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং ধর্ষণ সমানে চালিয়েছে। এখন তো পাকিস্তান নেই, এখন তো আমরা স্বাধীন, বাঙালিই শাসন করছে বাঙালিকে। তা হলে এখন কেন মেয়েরা এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে?

পাচার হচ্ছে ভারতে, জীবিকার অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে যেখানে-সেখানে, আত্মহত্যা করছে যখন-তখন, আটকা পড়ছে বাল্যবিয়ের ফাঁদে? কারণটি আমাদের অজানা নয়। কারণ হচ্ছে পাকিস্তান বিদায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই রাষ্ট্রের আদর্শ বিদায় হয়নি। আদর্শটা ছিল পুঁজিবাদী। সে আদর্শের এখন জয়জয়কার। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দুর্বল লাঞ্ছিত হচ্ছে, হতে থাকবে, কেননা আমরা উন্নতি করতেই থাকব এবং অত্যন্ত অল্প কিছু মানুষের উন্নতি কাল হয়ে দাঁড়াবে বাদবাকিদের জন্য। এটাই ঘটছে।

পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি, এমন কথা যারা বলেন তারা মোটেই মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই প্রেতাত্মাটাকে চিহ্নিত করেন না। প্রেতাত্মাটা অন্যকিছু নয়, প্রেতাত্মাটা পুঁজিবাদ। আর প্রেতাত্মাই বলি কী করে, সে তো ভীষণভাবে জীবন্ত। সে তো ব্যস্ত জীবিতদের জীবন কেড়ে নেওয়ার কাজে। ধর্মকে সে ব্যবহার করে উপায় ও আচ্ছাদন হিসেবে। না-মেনে উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয়তাবাদীরা সবাই পুঁজিবাদী : পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাদের নামে মস্ত পার্থক্য, চরিত্রে মৌলিক পার্থক্য নেই।

তাহলে উপায় কী? প্রতিবাদ? অবশ্যই। প্রতিবাদটা চলছে। বাল্যবিয়ে অসম্মত মেয়েরা কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করছে, এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েরা বিয়ের আসর থেকে সহপাঠিনীকে উদ্ধার করছে, আমরা জানতে পাচ্ছি। খবরের কাগজেই বের হয়েছে এমন খবর যে, মাগুরাতে এক মা তার মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন। কিন্তু তাতে তো ব্যবস্থাটা বদলায় না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকাতে বিক্ষোভ হয়েছে। আমেরিকার অরেগানে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে দুজন আমেরিকান নিহত হয়েছেন তাদের একজনের মা বলেছেন তার ছেলে বীর ছিল, মৃত্যুর পরও বীর থাকবে। মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, সে চেষ্টা চলবে; কিন্তু মনুষ্যত্ব নষ্ট হওয়ার নয়, হবেও না। তবে একলা একলা প্রতিবাদ করে যে কাজ হবে না সেটা তো প্রমাণিত সত্য।

তা হলে কি পালাতে হবে? কিন্তু পালাবেন কোথায়? একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে মানুষকে পালাতে হয়েছিল, ফিরে এসে তারা দেখেছে এ কী পাকিস্তান তো রয়েই গেছে! বদলটা শুধু নামেই। মানুষ এখনো পালাচ্ছে। ধনীরা ইতোমধ্যে বিদেশে বাড়িঘর তৈরি করেছেন, সময়মতো চলে যাবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলীয় সংঘর্ষ থামানোর লক্ষ্যে দলীয় লোকদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দল যদি ক্ষমতায় না থাকে তা হলে টাকা-পয়সা নিয়ে পালানোর পথ পাওয়া যাবে না।

এই সতর্কবাণীর দরকার ছিল কি? যারা পেরেছে তারা তো ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা করেছে, অন্যরাও তৎপর আছে। আর যাদের টাকা-পয়সার অভাব, দলের লোক নয়, সাধারণ মানুষ, তাদেরও একটা অংশ কিন্তু পালাচ্ছে। রিপোর্টে বলছে, নৌপথে ইউরোপে যারা পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষস্থানে। হতভাগা এই মানুষরা অবশ্য টাকা পাচারের জন্য যায় না, টাকা উপার্জনের জন্যই যায়। কিন্তু যাচ্ছে তো। জীবন বাজি রেখে যাচ্ছে। ঝাঁপ দিচ্ছে সমুদ্রে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া থেকে মানুষ পালাবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী এবং উন্নতিতে পুলকিত বাংলাদেশ থেকে অত মানুষ পালাচ্ছে কেন? পালাচ্ছে এখানে জীবিকার নিরাপত্তা নেই বলে এবং মেয়েদের দুরবস্থা বলছে এখানে নিরাপত্তা নেই জীবনেরও।

সিদ্ধান্তটা তো তাই অপরিহার্য। করণীয় হচ্ছে পুঁজিবাদকে বিদায় করা। কিন্তু সে কাজ তো একা কেউ করতে পারবে না, করতে গেলে কেবল হতাশাই নয়, বিপদ বাড়বে। বিদায় করার জন্য দরকার হবে আন্দোলন এবং আন্দোলনের জন্য চাই রাজনৈতিক দল। শুধু দলেও কুলাবে না, শত্রুকে যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হয় এবং সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করা না যায়। বাংলাদেশে এবং বিশ্বের অনেক দেশেই, জাতীয়তাবাদী যুদ্ধটা শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে সমাজতন্ত্রের জনযুদ্ধ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement