advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মশক নিধনে লেজেগোবরে অবস্থা

মোস্তফা কামাল
৩০ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০১৯ ০৮:৩৮
advertisement

অবশেষে ডেঙ্গু নিয়ে কথা পাল্টালেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। সরে এলেন আগের অবস্থান থেকে। রবিবার এসে বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ। তিনি নিজেও শঙ্কিত। এর আগের দিনও ডেঙ্গু নিয়ে গুজব রটনার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। আর বিপরীতে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সতর্ক করেছেন মন্ত্রী, মেয়রসহ জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের। বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে কথাবার্তায় সতর্ক হতে। মেয়র খোকনের অবস্থান বদল দেরিতে হলেও বাস্তবতা মেনে নেওয়া বা উপলব্ধির একটা জের।

এর আগে ডেঙ্গু আর রোহিঙ্গাদের প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে মশকারা করেছেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন। ডেঙ্গুকে গুজব, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে চালানোর চেষ্টাও ছিল ব্যাপক। শেষতক এগুলো বুমেরাং হয়েছে। সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতির কোনো খবর নেই। বরং তা আরও ছড়িয়ে পড়ার যাবতীয় আলামত ও শঙ্কা।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকাসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলো। সরকারের দিক থেকে চলেছে বাস্তবতা স্বীকার না করার প্রবণতা। ঢাকার বাইরে থেকেও ডেঙ্গুর প্রচুর রোগী আসছে ঢাকায়। বিভিন্ন কাজের জন্য ঢাকায় এসে আবার নিজ নিজ জেলায় ফিরে যাওয়া মানুষও ঢাকা থেকে ডেঙ্গু নিয়ে যাচ্ছে। সামনে ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গুর এই মাইগ্রেশনের ঝুঁকি দেখছেন ডাক্তাররা। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তাররা ঢাকার রোগী সামলাতেই পেরেশান। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকেও রোগী আসায় তারা আরও নাস্তানাবুদ। আবার ঢাকা থেকে বাইরে যাওয়া ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার বাড়তি বোঝায় মফস্বলের ডাক্তাররা।

মশাবাহিত এ রোগে মৃতদের মধ্যে রয়েছেন বেশ ক’জন ডাক্তারও। তথ্যভিন্নতা থাকলেও সংখ্যায় তা অনেক। একজন সিভিল সার্জনসহ দুই, পাঁচ বা সাত যা-ই হোক মৃত্যুর এ ঘটনাকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবস্থা আর নেই। ডাক্তারের সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালে নার্সসহ অন্যান্য স্টাফের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্যও কমবেশি আসছে গণমাধ্যমে। স্কুল শ্রেণিতে টেন্স (কাল) বোঝাতে ডাক্তার আসিবার আগে রোগী মারা গেল, ডাক্তার আসিবার পরে রোগী মারা গেল, রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসিলেন- এই কিছিমের কিছু বাক্য পড়ানো কবে থেকে শুরু তা জানা কঠিন। তবে ডেঙ্গু আর ডাক্তার আজকের বাস্তবতায় খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। এর চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তাররা নিজে মরছেন, অসুস্থ হচ্ছেন।

এত ডেঙ্গু রোগী সামলাতে ডাক্তার-নার্সসহ চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের কী গুরুচরণ অবস্থা যাচ্ছে যা অনেকের ভাবনাতীত। চিন্তা বা বিবেচনারও বাইরে। এর আগে মৌসুমি, আকস্মিক বা মহামারীতে তাদের এমন দশায় পড়তে হয়নি। এর বাইরে ছাত্র, শিক্ষক, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাংবাদিক, চাকরিজীবী, শ্রমিক, বেকারসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষই ভুগছে। ডেঙ্গুতে দু-একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। মোট কথা সমাজের উঁচু-নিচু কারোরই নাজাত নেই ডেঙ্গু থেকে। এলিট জাতের হলেও এডিস মশার বিস্তার কেবল অভিজাত এলাকাতে নয়। বড়লোকের বাসাবাড়ি ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গরিব ঘরেও। বস্তিতেও অনেকে আক্রান্ত। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এত মানুষের মৃত্যুর দায় কারোরই নিতে হচ্ছে না।

ধনী-গরিব, ডাক্তার-কবিরাজ, নারী-শিশু, চোর-পুলিশ কাউকেই ছাড় না দেওয়া এ অসুখের চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। ধনীরা চিকিৎসা খরচ সামাল দিতে পারলেও গরিবদের জন্য এটি সামাল দেওয়া কঠিন। গরিবদের প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে কী অবস্থা হয় তার ধারণা মেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ২২ ঘণ্টা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র স্বাধীনের পরিবারের হাতে ধরিয়ে দেওয়া বিলের দিকে তাকালেও। স্বাধীনকে বাঁচাতে না পারলেও তার পরিবারের কাছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৪ টাকা বিল তুলে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মাত্র ২২ ঘণ্টায় কী করে এত টাকা বিল হলো, সে প্রশ্ন ছুড়েছেন স্বাধীনের পরিবারসহ তার সহপাঠীরা। তাতে কী? কার কথা কে শোনে?

আর সরকারি হাসপাতালে সরকারি কিছু ওষুধ এবং বিনামূল্যে সিট ভাড়া সুবিধার সঙ্গে নিজেদের পকেট থেকে দৈনিক ২-৩ হাজার টাকা। বেশিরভাগ পরীক্ষাই করিয়ে আনতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে থেকে। কোনো কোনো রোগীর ডেঙ্গুর সঙ্গে দেখা দিয়েছে টাইফয়েডসহ অন্যান্য জটিলতা। ফলে তাদের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে গুজব-আজব তর্ক, কথার কচলানি চলতে থাকলে আগামী এক-দুই মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে শঙ্কিত তারা।

আইসিডিডিআরবির গবেষণায় অকার্যকর প্রমাণিত ওষুধ দিয়েই চলছে ঢাকার দুই সিটির মশক নিধন কার্যক্রম। যার পরিণামে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা কমছে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, সিটি করপোরেশনের এসব কার্যক্রম স্রেফ লোক দেখানো। এ ওষুধেই মশা মরছে- এমন দাবিও করছে সিটি করপোরেশন। আবার বলছে, নতুন ওষুধ আনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে এ ওষুধ আমদানি করতে সময় লাগবে। সিটি করপোরেশন মশা নিধনে কেন কার্যকর ওষুধ ছিটাতে পারছে নাÑ এই প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্টও। জানতে চেয়েছে, ওষুধ কার্যকর কিনা সেই পরীক্ষা কেন আগে করা হয়নি?

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) পক্ষ থেকে মশা মারার জন্য প্রস্তাবিত কোনো ওষুধের নাম আসেনি। এক সপ্তাহের মধ্যে কোনো ওষুধের নাম বা স্যাম্পল এলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধ কিনতে কমপক্ষে চার মাস সময় লাগতে পারে। আর ততদিনে ফুরিয়ে যাবে ডেঙ্গুর মৌসুম। বিধাতা বা প্রকৃতি সহায় হলে তদ্দিনে হয় ডেঙ্গু বিদায় নেবে। আর উল্টোটা হলে কপালের লিখন বলে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতি নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায় যে ওষুধ অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলো দিয়েই চলছে ঢাকার দুই সিটির মশক নিধন কার্যক্রম। আর এ কারণেই এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা কমছে না- এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, সিটি করপোরেশনের এসব কার্যক্রম স্রেফ লোক দেখানো।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চলমান মশক নিধন কার্যক্রম এডিসের প্রজনন রোধে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখনই এডিস মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রোগের ভয়াবহতার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে বলেও শঙ্কা তাদের। কিন্তু সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের দাবিÑ এ ওষুধেই মশা মরছে। আর নতুন ওষুধ আনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এ ওষুধ আমদানি করতে সময় লাগবে।

ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে উদ্বেগ যেমন বাড়ছে, সেই সঙ্গে এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতিগতভাবে দেশে মন্দকাজ বা ব্যর্থতার দায় কাউকে নিতে হয় না। যত দোষ যে মরে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারই। এর পরও ঢাকায় ডেঙ্গুর জন্য অভিযোগের তীর প্রধানত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের দিকে। অনেকেই সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রীদের বিভিন্ন রকম বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন সরকারের জোটগত শরিক, সাবেক মন্ত্রী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। বলেছেন, ওষুধ কেনায় দুর্নীতি আর অদক্ষতা ঢাকতেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের খবরকে দক্ষিণের মেয়র ‘গুজব’ বলেছেন। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হারকে পাশের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মনে হয় দেশের মানুষের মৃত্যু তার কাছে কিছু নয়। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সাফাই গেয়েছেন। অথচ সড়ক ও সেতুমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডেঙ্গু-বন্যা মোকাবিলায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করেছে। তার পরও গবুচন্দ্র এই মেয়র-মন্ত্রীদের জন্যই মশক নিধন ডেঙ্গু নিয়ে এই লেজেগোবরে অবস্থা।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেও বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই এই পরিস্থিতি হয়েছে। কিন্তু পোড় খাওয়া অভিজ্ঞরা বলছেন, ব্যর্থতার চেয়ে এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি-চুরি-চামারিই বেশি দায়ী। রাজধানীবাসী মাত্রই জানেন, সিটি করপোরেশনের অবহেলাকেই দায়ী করছেন। সিটি করপোরেশন যে মশার ওষুধ ছিটিয়ে থাকে তাতে মশা মরে না। আবার মশার ওষুধ নিয়ে চলে তুঘলকি কারবার। মশার ওষুধ না ছিটিয়েই দাবি করা হয় সর্বত্র ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এ অবস্থায় এবার সিটি করপোরেশনের মেয়র নিজেই স্বীকার করেছেন তাদের মশার ওষুধে মশা মরছে না। তা ছাড়া বাজারে যে মশা মারার স্প্রে পাওয়া যায় সেগুলোতেও মশা মরছে না। নানামুখী এমন কথার খই ফোটানোর জের মোটেই ভালো হচ্ছে না। তা মানুষের কাটা গায়ে নুন ছিটানোর নামান্তর।

 

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

advertisement