advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্থবিরতা ক্রমেই ঢাকার অলঙ্কার হয়ে উঠছে

অমিত গোস্বামী
৩১ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৯ ০৮:৫৬
advertisement

ঢাকা আমার খুব প্রিয় শহর। গত ছয় বছর ধরে নিয়মিত এ শহরে যাওয়া-আসা। কিন্তু এখন লক্ষ করছি ঢাকা ক্রমেই গতিহীন স্থবির হয়ে উঠছে। কারণ ট্রাফিক জ্যাম। দিনের মধ্যে কয়েকবার স্থির হয়ে পড়ছে এ শহর। ২০১৯ সালে বিশ্বে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় শীর্ষে স্থান পেয়েছে ঢাকা। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিওর ওয়েবসাইটে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯তে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের কলকাতা। এর আগে ২০১৮ ও ২০১৭ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ২০১৬ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয় এবং ২০১৫ সালে এই অবস্থান ছিল অষ্টম। কাজেই আমার বা অন্যদের চোখে এই স্থবিরতা যে ক্রমেই বেড়ে চলেছে তা নিতান্ত দৃষ্টিবিভ্রম নয়। কিন্তু এত জ্যাম কেন?

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ ভাগ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র আট ভাগ। এর মানে হলো, প্রয়োজনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সড়ক আছে এই শহরে। ঢাকা শহরের মোট এলাকা ১৩৫৩ বর্গকিলোমিটার আর ঢাকার বর্তমান রাস্তার আয়তন ২,২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক। কলকাতার আয়তনের মাত্র ৬ ভাগ রাস্তা। কিন্তু এত স্থবিরতা নেই। ঢাকার জ্যামের কারণ নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি কারণ নগ্নভাবে উঠে আসে যা কোনো সভ্যতার বিপক্ষে।

বাংলাদেশ ট্র্যাফিক বিভাগের হিসাবমতে, সেই সড়কের কম করে হলেও ৩০ ভাগ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এ ছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই হেঁটে চলেন নগরবাসী। ঢাকায় দিনের মোট যাত্রীর ১৫ ভাগ যাত্রী দখল করে আছেন মোট সড়কের ৭০ ভাগ। কীভাবে? স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কমবেশি ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগেরও বেশি রাস্তা। অফিস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চলাকালীন ৮০ ভাগ গাড়ি রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং করা হয়। কারণ ঢাকায় গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা প্রায় নেই।

ঢাকার জ্যামের আরেকটি কারণ রিকশা। ঢাকার রাস্তায় প্রায় ১৯ ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের সঙ্গে একই রাস্তায় চলছে রিকশা, রিকশাভ্যান, ঠেলাগাড়ির মতো অযান্ত্রিক যানবাহন। মিশ্র পরিবহনে চলাচল করছে লেন, বিধি না মেনেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, রাজধানীতে অনিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তবে সিটি করপোরেশনের নিবন্ধন না পাওয়া এসব রিকশা রাজধানীতে চলাচল করছে প্রায় ২৮টি চক্রের অধীনে। এসব চক্রের মাধ্যমে মালিকদের রাজধানীতে নতুন রিকশা নামাতে হচ্ছে। এসব চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রধানত বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগ।

ঢাকার সড়ক ব্যবহারকারীরাÑ মানে যানবাহন ও পথচারী কেউই আইন মানে না। সুযোগ পেলেই ট্র্যাফিক আইন লঙ্ঘন করে তারা। ভুল দিক বা ‘রংসাইড’ দিয়ে যানবাহন চালানো, ট্র্যাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, ফুটপাত দিয়ে যানবাহন চালানো ঢাকার একটি পরিচিত চিত্র। সবাই আগে যেতে চায়, তা সে যেভাবেই হোক না কেন। ফুটওভারব্রিজ বা ফুটব্রিজ ব্যবহার না করে পথচারীরা মূল সড়কের মাঝখান দিয়ে রাস্তা পারাপার করে সড়কের গতি স্লথ করে দেন। গাড়ির চালকরা ট্রাফিক পুলিশকে ডাকেন ‘মামা’ বলে। পুলিশ ধরলে একটা ১০০ টাকার নোট। বেশি ঝামেলা করলে রাজনৈতিক ‘বড়মামা’দের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘মামা’দের হাতে ফোন ধরিয়ে দেওয়া। ব্যস, খালাস।

ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে এখনো রেলগাড়ি চলাচল করে। ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে রেললাইন যাওয়ার ফলে ১৭টি পয়েন্টে রাস্তা বন্ধ করে ট্রেন যাওয়ার ব্যবস্থা করায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এসব পয়েন্টে দিনে কমপক্ষে ১০ বার যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। গোদের ওপরে বিষফোঁড়া হলো ভিআইপি মুভমেন্ট। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনীতিবিদদের মুভমেন্টের সময় দীর্ঘক্ষণ কিছু কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে শুধু তাদের চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হয়। ঢাকায় বেশ কিছু রাস্তার ফুটপাতে বেশ গুছিয়ে সংসার করে কিছু মানুষ। রান্নাঘর, ভাড়ার ঘর, সব একেবারে গেরস্তবাড়ির মতোই। যানজট থেকে রক্ষা পেতে প্রায়ই রাজধানীর ফুটপাতগুলোতে গাড়ি উঠিয়ে দেন বাইকচালকরা। ফুটপাতে বাইক ঠেকাতে সিটি করপোরেশনসহ কর্তৃপক্ষ লোহার পাইপ পুঁতে রাখার পরও যেন থামছে না ফুটপাতে বাইকের দৌরাত্ম্য।

২০১৮ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৩০ লাখ, ১৯৯০ সালে এর সংখ্যা ছিল ৯৮ লাখের মতো। ২০১৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি ছিল। বর্তমানে তা ১ কোটি ৮০ লাখ। এই শহরে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার। শহরে যানজটের কারণে দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। ২০৩৫ সালে বৃহত্তর ঢাকার জনসংখ্যা হবে আড়াই কোটি। ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা হবে ৩ কোটি ৫২ লাখ। বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট বা বিওআইর গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বাংলাদেশে বছরে যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, তার মূল্য ৪৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া উৎপাদন খাতে আর্থিক ক্ষতি ৩০ হাজার ৬৮২ কোটি, স্বাস্থ্যগত ২১ হাজার ৯১৮ কোটি, জ্বালানি ও যানবাহন মেরামত বাবদ ১ হাজার ৩৯৩ কোটি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতি ১৫৪ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে বছরে যানজটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৯৭ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। যানজট নিরসনে ঢাকায় ২৯ কিলোমিটারের দীর্ঘ তিনটি উড়ালসড়ক এবং ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল রেল নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিরসনে এগুলোর দরকার আছে অবশ্যই। কিন্তু যখন পুরোপুরি এগুলো বাস্তবায়ন হবে, তখন যানজট নিরসনে এর ভূমিকা তেমন আর লক্ষ করা যাবে না। কারণ এরই মধ্যে লোক বাড়বে, বাড়বে যানবাহনও।

তা হলে এই সমস্যা সমাধানের উপায় কী? প্রথম ও প্রধান কর্তব্য রিকশা চলাচল ও সংখ্যায় নিয়ন্ত্রণ আনা। দিনকয়েক আগে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ তিন সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রিকশাচালকরা কয়েকদিন ধরেই আন্দোলন করেছিলেন। যার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মদদ ছিল। বর্তমানে স্থিতাবস্থা বিদ্যমান। ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাবমতে, লাইসেন্সধারী রিকশার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৭০৭টি। ১৯৮৭ সালের পর সিটি করপোরেশন কোনো নতুন লাইসেন্স ইস্যু করেনি। রাজধানীতে অনিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগ ছাড়াও এদের মদদ দিচ্ছে ‘মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ’ নামে আরেকটি মালিক সমিতি। এদের কোনো বৈধতা বা স্বীকৃতি নেই। ঢাকার রিকশা নিয়ে কিছু কাজ করার সময় আমি গত বছর মিরপুরের ভাষানটেক আর দিয়াবাড়ীর কয়েকজন গ্যারেজ মালিক ও রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের বক্তব্য তো চমকে দেওয়ার মতো। তাদের আয়ের অর্থের পিঠাভাগ বাঁদরকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। এভাবেই ক্রমে ক্রমে গড়ে উঠছে এই অবৈধ ব্যবসাচক্র। এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে ঢাকা শহর ক্রমেই রিকশার বেড়াজালে আটকে পড়বে।

দ্বিতীয় কর্তব্য মোটরগাড়ির নিয়ন্ত্রণ। যে ১৫ শতাংশ মানুষ মোটরগাড়ির ব্যবহার করেন নিয়মিত তাদের জন্য পার্কিং প্লাজা তৈরি করা একান্ত জরুরি। না হলে তারা অবৈধ পার্কিং করবেই।

তৃতীয় কর্তব্য ফুটপাত দখলমুক্ত করা। এখানে কোনোরকম আপসের জায়গা নেই। এদের বলপূর্বক নিশ্চিহ্ন করতে হবে। যা তোমার নয় সে জায়গা দখল করে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করা বিপন্নতাপ্রসূত নয়। এটা অ্যাটিটুড।

চতুর্থ কর্তব্য ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা। কীভাবে করা যায়? রাস্তায় রাস্তায় সিসিটিভি ও ট্রাফিক পুলিশের বুকে ক্যামেরা থাকলে সব ছবি রেকর্ডেড থাকবে। পুলিশ পয়সা খেলেও তা চিত্রবদ্ধ থাকবে, কেউ বড়মামা দেখালেও তা লিপিবদ্ধ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে মামা-ভাগ্নের আঁতাত ভাঙতে বেশি সময় লাগবে না।

ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে। সব সুযোগ-সুবিধাও যেন গড়ে উঠেছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে এবং ক্ষমতাও ঢাকাতে কেন্দ্রীভূত। সেজন্য সবাই ঢাকাতেই থাকতে চান। কাজেই শহরভিত্তিক ক্ষমতা ও সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। মানুষ ঢাকার বাইরের বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলোতেই যেন তার প্রয়োজন মেটাতে পারেন সে ব্যবস্থা করলে শহরের ওপর চাপ কমবে। ঢাকা শহর কার? সেটা বোঝা যায় ঈদের সময়। বোঝা যায় খোদ ঢাকার বাসিন্দা ঠিক কত। এমন কী ক’জন মন্ত্রী-আমলা তখন থাকেন। তাই ঢাকা শহরকে বারোয়ারি চরিত্র থেকে সংঘবদ্ধ চেহারায় আনতে গেলে ভাবতে হবে সবাইকে। না হলে বাস হয়ে উঠবে বিষময়, বিরক্তিকর। উত্তর প্রজন্ম কিন্তু ভুগবেন গতিবৈকল্যে। সে দৃশ্য কি আপনারা দেখতে চান?

advertisement