advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

তিনি যে ছিলেন ‘দিঘল পুরুষ’

ড. আতিউর রহমান
২ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২ আগস্ট ২০১৯ ০৮:৫৮
advertisement

সদ্যস্বাধীন দেশের পিতৃ হত্যার সেই দুঃসহ বেদনার ক্ষত আজে শুকোয়নি। তা সহজে শুকোবারও নয়। কেননা সব অর্থেই যে তিনিই বাংলাদেশ। ছিলেন তিনি ‘দিঘল পুরুষ’। কবি বাবলু জোয়ারদারের বিখ্যাত কবিতার লাইনগুলো একটু অদলবদল করে বলতে চাই যে, তিনি হাত বাড়ালেই অনায়াসে ধরে ফেলতেন চাঁদ, আকাশের নীল এবং সপ্তর্ষীমণ্ডলী। ধরে ফেলতেন ‘পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল’ ও সাড়ে সাত কোটি হৃদয়। আরেক কবি রফিক আজাদ লিখেছেন :

‘স্বপ্ন তাঁর বুক ভরে ছিল,/পিতার হৃদয় ছিল,স্নেহে আর্দ্র চোখ-/এ দেশের যা কিছু হোক না তা নগণ্য, ক্ষুদ্র/

তাঁর চোখে মূল্যবান ছিল-/নিজের জীবনই শুধু তাঁর কাছে তুচ্ছ ছিল;/স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে প’ড়ে আছে

বিশাল শরীর ...’ /(‘এই সিঁড়ি’)।

সেই বিশাল শরীর পড়ে নেই শুধু ধানম-ি বত্রিশ নম্বরের সেই সিঁড়িতে। কেননা ওই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে। ওই সিঁড়ি ভেঙেই তার রক্ত বইয়ে গেছে বাংলাদেশের সবুজ শস্যের মাঠের জমিকে আরও উর্বর করার জন্য। আমাদের সবকিছুকে আরও সবুজ করার জন্য। আমার জানা নেই আর কোনো মহানায়ককে নিয়ে এত কবি কবিতা লিখেছেন কিনা। আমার জানা নেই আর কোনো মহানায়ককে নিয়ে সাহিত্যিকরা এত গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন কিনা। আমার জানা নেই আর কোনো মহানয়াককে নিয়ে এত সুরকার গান বেঁধেছেন কিনা। আমার জানা নেই আর কোনো মহানায়কের মুখচ্ছবি এত চিত্রকররা নিবিষ্ট মনে এঁকেছেন কিনা। আমার জানা নেই আর কোনো মহানায়ককে এমন ভরা কণ্ঠে নিয়ে এত কবিতা আবৃত্তি করা হয় কিনা। মনে হয় হয় না। কেননা তিনি যে রয়ে গেছেন আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি পরতে পরতে। আছেন তিনি আমাদের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। কবি মহাদেব সাহার মতে, তিনি যে ‘এই বাংলার নদী, বাংলার সবুজ প্রান্তর /...চর্যাপদের গান, ... বাংলা অক্ষর/... বাংলাদেশের হৃদয়।’ তাই তার ‘পায়ের শব্দে/নেচে ওঠে পদ্মার ইলিশ।’ (‘এই নাম স্বতোৎসারিত’)। নির্মলেন্দু গুণ বলেন, ‘তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল রূপসী বাংলার স্নিদ্ধ মুখশ্রী/তাই তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল-‘আমার সোনার বাংলা’/ তাই তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল মুক্তি-স্বপ্নপ্রিয়/স্বাধীনতা।’ (পুনশ্চ মুজিব)।

কেন তিনি এতটা বিস্তৃত বাঙালির হৃদয়তটে? কেন তিনি আজও এতটা প্রাসঙ্গিক আমাদের কাছে? পৃথিবীতে আরও অনেক মহানায়কের উত্থান দেখেছি। কিন্তু তাদের দেশে তারা কি এখনো এমন প্রাসঙ্গিক? ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নে কি মহামতি লেনিনের আদর্শ এখনো প্রাসঙ্গিক? চীনেও কি মাও সেতুং আগের মতোই প্রাসঙ্গিক। মনে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা দিন দিন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। শত্রুদের মুখে ছাই দিয়ে তিনি আরও বড় হচ্ছেন। আরও ব্যাপক হচ্ছেন। আরও প্রবল হচ্ছেন। তার বড় কারণ তিনি তার দেশবাসীকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তাদের দুঃখ ছিল তারও দুঃখ। তাদের সুখ ছিল তারও সুখ। তাদের স্বপ্ন ছিল তারও স্বপ্ন। নিঃসন্দেহে, তার চলে যাওয়ার পর স্বদেশ হাঁটছিল ‘অদ্ভুত এক উটের পিঠে’ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের উল্টোদিকে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের পর বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে স্বদেশ ফিরে এসেছে তার আপন কক্ষপথে। দ্রুত এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে। তার ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন পূরণে এখন ব্যস্ত আমরা পুরো দেশবাসী। অচিরেই আমরা পালন করব বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। বছরজুড়ে আমরা স্মরণ করব তাকে। তার আদর্শকে। বাজিয়ে নেব আমরা কতটা এগোতে পারছি তার দেখানো মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থ-সামাজিক মুক্তির পথে। আত্মসমালোচনা করব আমাদের অসম্পূর্ণতা নিয়ে। গাইব সাফল্যের জয়গান। শপথ নেব আরও পরিপূর্ণভাবে আমরা কী করে তার স্বপ্নের দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাকে অর্জন করতে পারি।

আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা খুঁজে নেব শোষিতের পক্ষের বঙ্গবন্ধুকে। মানবিক বঙ্গবন্ধুকে। গরিবহিতৈষী বঙ্গবন্ধুকে। দুঃখী মানুষের ভরসার প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে। তরুণ প্রজন্মকে আমরা বলব-একদিনেই এই বহুমাত্রিক বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি হয়নি। টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত এক গ্রামে তার জন্ম। বাবার কর্মসূত্রে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে লেখাপড়া। এর পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে এবং সব শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যার্জন। ছাত্রদের সংগঠিত করে ন্যায়ের পক্ষে তরুণদের আন্দোলিত করার নেতৃত্বের গুণে তিনি গুণান্বিত। এর পর মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন। নিজ প্রতিভাগুণেই হয়ে ওঠেন বাঙালির নয়নের মণি। জেলজুলুম উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট মোচনের অঙ্গীকার নিয়ে তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির পক্ষের প্রতিটি আন্দোলনেই তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে প্রিয় মহানায়ক। রাজনীতির অমর কবি।

একেবারে তরুণ বয়স থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হতেন এবং তাদের জন্য একটা কিছু করতে চাইতেন। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লেই জানা যায় তিনি কীভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বুক চেতিয়ে দাঁড়াতেন। দাঙ্গা আক্রান্তদের জন্য তৈরি আশ্রয় শিবিরের নেতৃত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিতেন। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা পরিচালনা করতেন। সরকারের কর্ডন প্রথায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘দাওয়াল’ বা ক্ষেতমজুরদের জন্য আন্দোলন করতেন। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা খুব কাছে থেকে দেখেছেন বলেই তিনি ‘দুই অর্থনীতি’র প্রবক্তা হতে পেরেছিলেন। এ কারণেই তিনি বাঙালির জন্য ‘ছয় দফা’ আন্দোলনের সূত্রপাত করতে পেরেছিলেন। সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ রেখে উল্কার মতো উপদ্রুত এলাকায় ছুটে গিয়েছেন। দুর্যোগে দিশেহারা মানুষকে দিশা দিয়েছেন। তাদের ত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন।

১৯৩৬ সালে তার বাবার কর্মসূত্রে মাদারীপুরে আগমন। মাদারীপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তখন তার চোখে দেখা দেয় গ্লুকোমা। কলকাতা মেডিক্যালে চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুরে ফিরে আসেন। স্বদেশি আন্দোলন তখন ঘরে ঘরে। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার মনে হতো, মাদারীপুরে সুভাষ বোসের দলই শক্তিশালী ছিল। পনেরো-ষোলো বছরের ছেলেদের স্বদেশিরা দলে ভেড়াত। আমাকে রোজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার ওপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম। এই সভায় যোগদান করতে মাঝে মাঝে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর যাওয়া-আসা করতাম।’ [পৃ: ৯, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’]। নেতাজি সুভাষ বসু বঙ্গবন্ধুর বাল্যকালে জীবনচলার যথেষ্ট মিল দেখে তাই আমরা অবাক হই না।

তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৩৭ সালে আবার আমি লেখাপড়া শুরু করলাম।... আমার আব্বা আমাকে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমার আব্বাও আবার গোপালগঞ্জ ফিরে এলেন। এই সময় আব্বা কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি মাস্টার সাহেবকে আমাকে পড়ানোর জন্য বাসায় রাখলেন। তার জন্য একটা আলাদা ঘরও করে দিলেন।... মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটা ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করেন। যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠাতেন-সব মুসলমান বাড়ি থেকে। প্রত্যেক রবিবার আমরা থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাল উঠিয়ে আনতাম এবং এই চাল বিক্রি করে তিনি গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচ দিতেন। ঘুরে ঘুরে জায়গিরও ঠিক করে দিতেন। আমাকেই অনেক কাজ করতে হতো তার সঙ্গে। হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন আমি এই সেবা সমিতির ভার নিই এবং অনেক দিন পরিচালনা করি। আর একজন মুসলমান মাস্টার সাহেবের কাছেই টাকা-পয়সা জমা রাখা হতো। তিনি সভাপতি ছিলেন আর আমি ছিলাম সম্পাদক।” [পৃ: ৯, অসমাপ্ত আত্মজীবনী ]। তার সাংগঠনিক সক্রিয়তার শুরু যে বাল্যকালেই হয়েছিল তা বেশ স্পষ্ট।

১৯৩৮ সাল। শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ এসেছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ভার পড়েছিল তার ওপর। [দেখুন পৃ: ১০-১১, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’]। ওই সফর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পথযাত্রায় এক বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনটাই এক খোলা বই। এই বইয়ের পাতায় পাতায় লেখা আছে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে, তিনি তার জেলজীবনে ও সারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যেসব সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন তাদের কথা লিখে গেছেন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচায়’। সুসম্পাদিত বই দুটোতে কত দুঃখী মানুষের সন্ধানই না মেলে। সবার কথা এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে বলা মুশকিল। তবু এক দুটো প্রসঙ্গ নিয়ে দু’কথা বলতে চাই।

জেলখানাতেই তার পরিচয় হয় একজন পকেটমার ‘লুদু’র সঙ্গে। ‘কারাগারের রোজনামচায়’ এই লুদুকে নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে তার দুঃখের কাহিনি লিখেছেন তিনি। একইভাবে অন্য কয়েদিদের জীবনযুদ্ধের কথাও তিনি লিখেছেন। এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন অসহায় মানুষগুলোও তার দৃষ্টি এড়ায়নি। তাদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন গভীর মমতার সঙ্গে। জেলখানার পশুপাখিও তার নিকটজন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা আন্দোলনের অংশ হিসেবে সারাদেশে যে ধর্মঘট হয়েছিল তাতে আহত-নিহত কর্মী ও সাধারণ মানুষের জন্য যে ব্যাকুলতার কথা তিনি তার ‘রোজনামচায়’ লিখেছেন তা যে কোনো পাঠকের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ না করে পারে না। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে। আমি একা থাকি, আমার সাথে কাহাকেও মিশতে দেওয়া হয় না। একাকী সময় কাটানো যে কত কষ্টকর’ (ঐ পৃ. ১৯)। এর পর পরই তিনি ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য বালক, কিশোর, কর্মী ও সাধারণ মানুষের জেলে আসা এবং তাদের কষ্টের কথা হৃদয় নিংড়ানো দরদ দিয়ে লিখেছেন। যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এদের ত্যাগ বৃথা যাবে না। এই দেশের মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করবার জন্য যখন জীবন দিতে শিখেছে তখন জয় হবেই, কেবল সময়সাপেক্ষ। যে রক্ত আজ আমার দেশের ভাইদের বুক থেকে বেরিয়ে ঢাকার পিচঢালা কালো রাস্তা লাল করল, সে রক্ত বৃথা যেতে পারে না।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেভাবে এ দেশের ছাত্র-জনসাধারণ জীবন দিয়েছিল তারই বিনিময়ে বাংলা আজ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। রক্ত বৃথা যায় না। যারা হাসতে হাসতে জীবন দিল, আহত হলো, গ্রেপ্তার হলো, নির্যাতন সহ্য করল তাদের প্রতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতি নীরব প্রাণের সহানুভূতি ছাড়া জেলবন্দি আমি আর কি দিতে পারি! আল্লাহর কাছে এই কারাগারে বসে তাদের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে মোনাজাত করলাম। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না, সংগ্রাম চালিয়ে যাব। যা কপালে আছে তাই হবে। জনগণ ত্যাগের দাম দেয়। ত্যাগের মাধ্যমেই জনগণের দাবি আদায় করতে হবে। আমি যেখানে ছিলাম তার পাশেই পুরানা বিশ সেলে রাতে ৮২ জন ছেলেকে নিয়ে এসেছে, বয়স ১৫ বছরের বেশি হবে না কারও। অনেকের মাথায় আঘাত। অনেকের পায়ে আঘাত, অনেকে হাঁটতে পারে না। হাকিম বাহাদুর বোধহয় কারও কথা শোনেননি, জেল দিয়ে চলেছেন। রাতে জানালা দিয়ে দেখলাম এই ছেলেগুলোকে নিয়ে এসেছে। দরজা বন্ধ। জানালা দিয়ে চিৎকার দিয়ে বললাম, ‘জমাদার সাহেব এদের খাবার বন্দোবস্ত করে দিবেন। বোধহয় দুই দিন না খাওয়া। রাতে আমি ঘুমাতে পারলাম না। দু-একজন জমাদার ও সিপাই এদের ওপর অত্যাচার করছে। আর সবাই এদের আরাম দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কয়েদিরা ছোট ছোট ছেলেদের খুব আদর করে থাকে। নিজে না খেয়েও অনেককে খাওয়াইয়া থাকে। অনেকে নিজের গামছা দিয়েছে। যারা এদের ওপর অত্যাচার করেছে তাদের কথা আমার মনে রইল। নাম আমি লেখব না। একটু ঘুম আসে, আবার ঘুম ভেঙে যায়।’ [৮ জুন ১৯৬৬ বুধবার, পৃ: নং ৭১-৭৪, কারাগারের রোজনামচা]।

এই অস্থিরতা ও সহমর্মিতা থেকেই অনুমান করা যায়, সাধারণের দুঃখ-কষ্টকে তিনি কীভাবে নিজের মনে ধারণ করতেন। সে কারণেই দেশবাসী তার পেছনে এমন করে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। আর তাই জেলে তাকে চিরদিন রাখা সম্ভব হয়নি। বরং ঊনসত্তরের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনরত তরুণ ও সাধারণ মানুষ তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক অবস্থা থেকে মুক্ত করে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিল। এর পরের কাহিনি আমাদের জানা। এলো সত্তরের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়েও তিনি পাকিস্তানি এলিটদের রোষানলে পড়লেন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও তাকে অসহযোগিতার ডাক দিতে হয়েছিল। ৭ মার্চ মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ নেমে এলো গণহত্যা। ২৬ মার্চ শুরু হলো তারই ডাকে মুক্তিযুদ্ধ। হলেন তিনি বন্দি। লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পেলাম স্বাধীনতা। তাকে ফিরে পেলাম বাহাত্তরের দশ জানুয়ারি। শুরু করলেন দেশ গড়ার নতুন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেও তার লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। ১৯৭২ সালের ৯ মে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন :

‘আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’

আর এই উচ্চারণেই অনুভব করা যায় তার পক্ষপাতিত্ব ছিল কোনদিকে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরেই ভগ্ন অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠানই শুধু পুনর্নির্মাণ করেছিলেন তাই নয়, স্বদেশকে একটি চমৎকার সংবিধানও উপহার দিয়েছিলেন। মুক্তির মৌল চেতনাসমৃদ্ধ সেই সাংবিধানিক চেতনার আলোকেই বেশ এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু হঠাৎ এলো মরণ আঘাত পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে তারই সুকন্যার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনার আলোকে জনকল্যাণধর্মী উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণের যে নয়া সংগ্রাম শুরু হয়েছে তাকে সার্থক করেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে চিরদিন আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হবো। চিরজীবী হোন বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ড. আতিউর রহমান : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement