advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement

৮০ লাখ ঘুষের টাকা ও দুর্নীতি দমনের ‘নিয়ত’

চিররঞ্জন সরকার
৪ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৪ আগস্ট ২০১৯ ০৯:০৫
advertisement

আরবি ‘নিয়ত’ শব্দের অর্থ হলো মনে ইচ্ছা পোষণ করা বা অন্তরের দৃঢ়সংকল্প। এই ‘নিয়ত’ ঠিক থাকলে দুর্নীতিবাজদের যে ধরা যায়, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। সম্প্রতি দুদকের একটি টিম ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার করেছে সিলেটের উপকারা-পরিদর্শক পার্থ গোপাল বণিককে। তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ঘরের আলমিরা, তোশক, ওয়্যারড্রবসহ বিভিন্ন কক্ষে লুকানো ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ প্রবাদটির সার্থকতা লক্ষ করা যায় এই ঘটনার উৎস সন্ধান করতে গিয়ে। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার সোহেল রানা ঘুষের টাকাসহ গ্রেপ্তারের পর আলোচনায় আসেন ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক। ময়মনসিংহগামী ট্রেন থেকে নগদ ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত), ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার নগদ চেক এবং ১২ বোতল ফেনসিডিলসহ রেলওয়ে পুলিশ সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলেন।

চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলার সোহেল রানা গ্রেপ্তারের পর ‘ঘুষের ভাগ পার্থ বণিককে দিয়েছেন’- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিককে সিলেটে বদলি করা হয়। সোহেল রানার ঘুষের অর্থের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ঘাটে ঘাটে দুর্নীতির খোঁজ পায় সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে কয়েক কর্মকর্তা একাধিকবার দুর্নীতির দায়ে বিভাগীয় শাস্তি ভোগ করেছেনÑ এ ধরনের তথ্যও বেরিয়ে আসে।

সে সময় সোহেল রানার বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি ডিআইজি পার্থ বণিকসহ বেশকিছু কারা কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে দুদক থেকে ওই কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ ও ঘুষ-দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়।

অনুসন্ধানকালে দুদক নানা মাধ্যম থেকে সোহেল রানা ছাড়াও অন্তত ৫০ কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিমের কাছ থেকেও দুদক কিছু তথ্য পায়। তাতে কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিকের নাম রয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া দুজন সিনিয়র জেল সুপার, ৭ জন ডেপুটি জেলারসহ ৪৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য দুদকের হাতে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় দুদকের একটি টিম পার্থ গোপাল বণিকের বাসায় অভিযান চালায়।

৮০ লাখ ঘুষের টাকা উদ্ধারের এই ঘটনায় মনে পড়ছে একজন ওসমান গনির কথা। ২০০৭ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ‘বনের রাজা’খ্যাত ওসমান গনির উত্তরার সরকারি বাসভবনে অভিযান চালিয়ে চালের ড্রাম, বালিশ ও তোশকের ভেতর থেকে এক কোটি ছয় লাখ ৮৪ হাজার ৬০০ টাকা উদ্ধার করে। তারা ৪১ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্রের সন্ধানও পায়। এর পরই ওসমান গনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পার্থ গোপাল বণিকও আরেকটু সময় পেলে ‘ওসমান গনি’ হয়ে উঠতে পারতেন! ধরা পড়ার সময় যার বাসার বিছানা বালিশ চালের ডিব্বা সবকিছু টাকা ভর্তি ছিল!

সমস্যা হলো দুর্নীতি দমন কমিশন যাদের ধরছে তারা সামান্য চুনোপুঁটি! এর চেয়ে বড় বড় ‘রাঘববোয়াল’ নিশ্চয় হাজার হাজার আছে! শুধু ডিআইজি মিজানুর রহমান, দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসির, ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপালকে ধরে দেশের সর্বগ্রাসী দুর্নীতি কমানো যাবে কি? না, সেটা যাবে না, এজন্য আরও ব্যাপক অভিযান চালাতে হবে। দুর্নীতিবাজ আমলাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে আরও কঠোর ও অব্যাহত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সম্প্রতি যে কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে, এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারলে সুফল মিলতে পারে। যদি বড় বড় আমলাদের দুর্নীতি বন্ধ করা যায় তা হলে দেশে অর্ধেক দুর্নীতি কমে যাবে। জনপ্রতিনিধিরা যারা চাল-গম চুরি করে, যারা রাস্তার বাজেট চুরি করে, কন্ট্রাক্টর কাজ না করে বিল নেয় তারা চুরি করতে পারবে না। আস্তে আস্তে ভূমিদস্যু, ব্যাংক ডাকাত, প্রজেক্ট চোর এগুলো বন্ধ হবে। এমপি ভূমি দখল করতে পারবে না, মন্ত্রী জমি দখলদারকে ছেড়ে দিয়ে কদর্য হাসি হাসবে না!

মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি দমন একটি ধরাবাহিক প্রক্রিয়া। এজন্য ওপরমহলকেও সাচ্চা হতে হবে। সবার আগে তাদের দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি পুকুরকে মাছ চাষের উপযোগী করতে হলে প্রথমেই সে পুকুরটিকে রাক্ষসে মাছমুক্ত করতে হবে। তার পর অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ। ঠিক তেমনই বাংলাদেশটিকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়তে হলে মন্ত্রিপরিষদ, এমপি ও আমলাদের ডিটার্জেন্ট দিয়ে ধুয়েমুছে সাফ করতে হবে। কিন্তু তা কি সম্ভব? আমাদের মন্ত্রী-এমপি-আমলারা কি তা হতে দেবেন? এ প্রসঙ্গে একটি পুরানা গল্প মনে পড়ছে।

এক দেশে সবাই ছিল খুব সত্যবাদী। সেখানে একবার একজন চোর পাওয়া গেল যে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করেছে। এই অপরাধের জন্য তার মৃত্যুদ- ঘোষণা করা হলো। তখন সেই চোর তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে দেশের রাজার সঙ্গে একবার দেখা করার সুযোগ চাইল। যখন তাকে রাজার কাছে নিয়ে আসা হলো। চোরটি রাজার উদ্দেশে বলল : স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার একটাই কারণ তা হলো, আমার কাছে এমন একটা গাছের বীজ আছে যে গাছটা মনের সব ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। আমি আপনার জন্য এই গাছটা রোপণ করে দিয়ে যেতে চাই। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল, চারা লাগাতে তোমার কতদিন সময় লাগবে? চোর উত্তর দিল, এই তো স্যার সাত দিনের মতো। সাত দিন পর তাকে আবার রাজার দরবারে হাজির করা হলো। সেখানে এক কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চারার কী খবর? চোর বলল, আসলে জমি তো রেডি, কিন্তু বীজটা পরিপক্ব হতে আরও তিন দিন সময় লাগবে।

তিন দিন পর তাকে আবার রাজার দরবারে হাজির করা হলো। এবার রাজা নিজেই জিজ্ঞেস করলেন, বীজ রেডি তো? চোর বলল, স্যার জমি, বীজ, সবই রেডি কিন্তু আমি তো সেটা রোপণ করতে পারব না। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কেন পারবে না? চোর বলল, এটা এমন একজনের হাতে রোপণ করতে হবে যে কোনোদিন চুরি করেনি। না হলে এই বীজের চারার কার্যকারিতা হারাবে।

সঙ্গে সঙ্গে রাজা অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন বীজ রোপণ করতে। অর্থমন্ত্রী কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, স্যার, সারা দেশের অর্থ নিয়ে আমার কাজ। এত কাজের মধ্যে দু-একটা তো এদিক-সেদিক হতেই পারে। এর পর রাজা নির্দেশ দিলেন পরিবহনমন্ত্রীকে। পরিবহনমন্ত্রী কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, স্যার কত কত গাড়ির পারমিশন আমাকে প্রতিনিয়ত অনুমোদন দিতে হয়, এর মাঝে তো দু-একটা এদিক-সেদিক হতেই পারে। এর পর রাজা নির্দেশ দিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ইতস্তত হয়ে বললেন, স্যার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ, এত দেশে যাওয়া-আসা, বাণিজ্য লেনদেনের মধ্যে তো আমারও দু-একটা কাজ এদিক-সেদিক হতেই পারে। রাজা এর পর যাকেই বলেন, সে-ই এদিক-সেদিকের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যান। হঠাৎ সবাই রাজাকে ধরলেন, স্যার আপনিই না হয় ওই বীজটা রোপণ করুন!

তখন রাজা বললেন, তোমাদের তো দায়িত্ব ছোট ছোট, আমি পুরো দেশ চালাই। আমার কি একটু-আধটু এদিক-সেদিক হতে পারে না! তখন সবাই চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ করে মন্ত্রিসভার একজন প্রবীণ সদস্য বলে উঠলেন, তা হলে স্যার এই লোকটা তো সামান্য একটা ম্যানহোলের ঢাকনা চোর। একে মৃত্যুদ- দেওয়া কি ঠিক হবে? একে ছেড়ে দেওয়া হোক। তখন বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী বললেন, ‘না একে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তা হলে সে বাইরে গিয়ে আমাদের কীর্তিকলাপ সব ফাঁস করে দেবে।

তাই তো, তাই তো! সবাই চিন্তায় পড়ে গেল! তা হলে একে নিয়ে কী করা যায়? তখন শিক্ষামন্ত্রী কপালে চিন্তার রেখা টেনে বললেন, স্যার এক কাজ করা যেতে পারে। একে আমাদের মতোই একটা পদ দিয়ে আমাদের সঙ্গে শামিল করে নিন। সবাই একবাক্যে এই প্রস্তাবে সায় দিলেন। সেই ম্যানহোলের ঢাকনা চোর হয়ে গেলেন মন্ত্রিসভার সদস্য!

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এভাবেই দুর্নীতিবাজরা একতাবদ্ধভাবে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কাজ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ব্যতিক্রম কেউ থাকলে তার ওপর চলে অত্যাচার-জুলুম, নিগ্রহ, হয়রানি বা সেই ব্যক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার সর্বময় প্রয়াস। দুর্নীতি দমন করতে হলে অসৎ-দুর্নীতিবাজদের এই সন্ধি অবশ্যই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

আর হ্যাঁ, সবার আগে দুর্নীতি দমন করার ব্যাপারে দুদকসহ সরকারের নিয়ত ঠিক করতে হবে। নিয়ত যদি ঠিক না হয়, তা হলে এসব অভিযান নিছকই ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement