advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতিভাবনা

ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ
৬ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০১৯ ০৯:৫৭
advertisement

বিশ্ব নাগরিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এক মহান মানবতাবাদী সাহিত্যিক। দীর্ঘ আশি বছরের অবিরল সাধনায় তিনি উচ্চারণ করেছেন মানবমুক্তির মাঙ্গলিক বাণী। সুদীর্ঘ জীবনবৃত্তে বিচিত্র চিন্তা, বিপ্রতীপ শূন্যাশ্রয়ী আদর্শ এবং বহুভুজ দার্শনিক প্রত্যয়ে অবিরল বিচরণ করলেও রবীন্দ্রনাথের সব চিন্তা ও কর্মের কেন্দ্রস্থ প্রাণশক্তি ছিল মানবকল্যাণদর্শন। রবীন্দ্রনাথের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি ছিল ক্রমরূপান্তরশীল এবং বিকাশচঞ্চল, তার প্রাতিস্বিক প্রতিভা ছিল সংরক্ত সময় ও সংক্ষোভময় সমকালের অনুযাত্রী। জাতিক-আন্তর্জাতিক জীবনপ্রবাহের পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা কখনো হয়েছে ঊর্ধ্বারোহী আবার কখনো বা নিম্নগতি। কিন্তু এই ক্রমরূপান্তরের মধ্যেও যে কেন্দ্রানুগ ঐক্যসূত্র রবীন্দ্রমানসে সঙ্গতির পট নির্মাণ করেছে, তা তার বিশ্ব মানবমুক্তির ঐকাগ্র্য আকাক্সক্ষা। ‘মানুষের মধ্যে স্বার্থগত আমির চেয়ে যে বড় আমি, সেই আমির সঙ্গে সকলের ঐক্য, তার কর্ম সকলের কর্ম। একলা আমির কর্মই বন্ধন, সকল আমির কর্ম মুক্তি’Ñ এই প্রত্যয়ে স্থিত থেকে রবীন্দ্রনাথের সব কর্ম, তার আদর্শবাদী আত্যন্তিকতা, সর্ববিধ বৈপ্লবিক সংগ্রাম ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তা একটি বিন্দুতে সংহতি লাভ করেছিল। এ সূত্রেই আমরা সন্ধান করতে পারি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রচিন্তার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য।

‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩০) গ্রন্থের ছয় সংখ্যক পত্রে সংস্কৃতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনÑ ‘যাকে সংস্কৃতি বলে, তা বিচিত্র, তাতে মনের সংস্কার সাধন করে আদিম খনিজ অবস্থার অনুজ্জ্বলতা থেকে তার পূর্ণ মূল্য উদ্ভাবন করে নেয়। এই সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা, মন যেখানে সুস্থ-সবল, মন সেখানে সংস্কৃতির নানাবিধ প্রেরণাকে আপনিই চায়।’ এভাবে সংস্কৃতি বলতে রবীন্দ্রনাথ মূলত ‘মনের কৃষি’কেই বুঝেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, যে প্রক্রিয়া বা সাধনা দ্বারা কোনো বস্তু কী মানুষ সংস্কৃত তথা মার্জিত ও উন্নত হয়ে ওঠে, তা-ই হলো ‘সংস্কৃতি’। কর্ষণকার্য যেমন পতিত জমিকে করে তোলে ফসলসম্ভবা, তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে করে তোলে উন্নত রুচি ও উৎকর্ষময়চিত্তের অধিকারী। রামপ্রসাদ যে বলেছেন : ‘ওরে মন, কৃষি কাজ জানো না,/এমন মানব-জমিন রইল পতিত,/আবাদ করলে ফলতো সোনা’Ñ রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি ভাবনায় সে চিন্তাই যেন প্রতিধ্বনিত। রামপ্রসাদের মতো রবীন্দ্রনাথও ‘মানব-জমিন’কে চাষ করতে বলেছেন। অর্থাৎ তার মতে, সংস্কার বা পরিমার্জনাই হলো সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। মন বা চিত্তের উৎকর্ষের জন্য অবিরল চর্চা আর নিয়ত অনুশীলনই রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রগতিশীল সংস্কৃতির লক্ষণ।

মানুষের চিত্তোৎকর্ষই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংস্কৃতিভাবনার মৌল দর্শন। এ সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতিভাবনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় তার শিক্ষাচিন্তা, ধর্মচিন্তা, লোকসংস্কৃতিচিন্তা, সর্বোপরি তার মানবতাবাদী চিন্তা। রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতিভাবনা কেন্দ্রীয় জীবনার্থগত কারণেই তার শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে ঐকাত্ম্যসূত্রে বিজড়িত। শিক্ষাকে তিনি কখনই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চিত্তোৎকর্ষই ছিল তার মূল লক্ষ্য, যেমন দেখেছি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। ‘শান্তিনিকেতন পত্র’-এ তিনি লিখেছেনÑ ‘আমাদের দেশে সাধনা বলতে সাধারণ মানুষ আধ্যাত্মিক মুক্তির সাধনা, সন্ন্যাসের সাধনা ধরে নিয়ে থাকে। আমি যে সংকল্প নিয়ে শান্তিনিকেতনে আশ্রম স্থাপনার উদ্যোগ করেছিলুম, সাধারণ মানুষের চিত্তোৎকর্ষের সুদূর বাইরে তার লক্ষ্য ছিল না।’ সংস্কৃতির মতো ধারাবাহিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার মূল কথা। এ জন্য জনশিক্ষাকে তিনি সমধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাদর্শন, পারিবারিক প্রতিবেশ, স্বতন্ত্র জীবনবোধ ও জাতিক-আন্তর্জাতিক চেতনার স্পর্শে রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন জনশিক্ষা ছাড়া মানুষকে সুসংস্কৃত করা যাবে না। তাই লোকজীবনকে জাগ্রত করার দীপ্র আকাক্সক্ষায় তিনি উচ্চারণ করেছেনÑ

‘... এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে

দিতে হবে ভাষাÑ এইসব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে

ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা...’

বাল্যকালে ঠাকুরবাড়িতে স্বাদেশিকতার প্রবল আবহ দেখে রবীন্দ্রনাথ ক্রমেই লোকসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং এ সূত্রেই তার লোকসংস্কৃতিচর্চা। লোকসংস্কৃতি থেকে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন মহৎ সৃষ্টির প্রেরণা; লালন শাহ, গগন হরকরা, বিশো ভূঁইমালি, মদন বাউল, হাসন রাজা প্রমুখ লোককবির গান তাকে দিয়েছে আধ্যাত্মিক পরমানন্দে উত্তরণের পথনির্দেশ। রবীন্দ্রনাথের এই লোকসংস্কৃতিচর্চা তার মহৎ সংস্কৃতি ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

রবীন্দ্রনাথের প্রাতিস্বিক ধর্মচিন্তাও তার সংস্কতি ভাবনার একটা বিশেষ প্রান্ত। মানবকল্যাণ দর্শন দিয়েই তিনি বিচার করেচেন ধর্মকে; তিনি অবিচল আস্থা স্থাপন করেছেন জবষরমরড়হ ড়ভ সধহ-এ। ‘অচলায়তন’ (১৯১২) নাটক প্রসঙ্গে অমল হোমকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনÑ ‘ধর্মের নামে যে বিরাট কারাগার আমরা আমাদের চারপাশে গড়ে তুলেছি, সেই বন্দিশালা থেকে আমাদের সংস্কারকে, অভ্যাসকে মুক্তি দেবার আহ্বানই অচলায়তনের আহ্বান।’ মানুষের যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তাকেই রবীন্দ্রনাথ তার ঈশ্বর ও আরাধ্য বলে জেনেছেন; মানুষের পুঞ্জীভূত মানবিক গুণের সমাহার ‘মহামানব’কে তিনি আহ্বান করেছেন ধর্মের শৃঙ্খল থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য। এভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তাও তার সংস্কৃতি ভাবনার কেন্দ্রীয় দর্শনের সঙ্গে নিবিড়-গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সুদীর্ঘ সাধনায় সংস্কৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন, তা জন্ম দিয়েছে নতুন এক সংস্কৃতি, যার নাম দেওয়া যায় ‘রবীন্দ্রসংস্কৃতি’। রবীন্দ্রসংস্কৃতি বৃহৎ অর্থে গভীর ব্যঞ্জনায় আধুনিক বাঙালি-সংস্কৃতিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। বঙ্গসংস্কৃতি, ভারতসংস্কৃতি, বিশ্বসংস্কৃতি তথা মানবের শাশ্বত সংস্কৃতি স্রোতে অবগাহন করেই সুস্নাতক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে রবীন্দ্রসংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গসংস্কৃতি, ভারতসংস্কৃতি ও বিশ্বসংস্কৃতির সব শ্রেষ্ঠ দানকে আত্মস্থ করে আবার তা সহস্রধারায় ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলা, ভারত ও বিশ্বমানবকে, আকাশের সঞ্চিত মেঘ যেমন বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে পৃথিবীর বুকে। রবীন্দ্রনাথ সব সূত্র থেকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পেরেছেন বলে তিনিই সংস্কৃতিচিন্তায় এখন আমাদের ‘দুর্দিনের অন্ধকারে দীপশিখার মতো অনির্বাণ’ আলো।

 

য় ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement