advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

১০ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৯ ০৯:৪৯
advertisement

জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতির মতো কিছু তৈরি হলে দেশের সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে কাজ করবে, সেটিই আদর্শ পরিস্থিতি। সবাই একসঙ্গে আছে এমন ভাবনা দুর্যোগের দুর্দিনে দুর্ভোগ অনেকখানি লাঘব করে। যত বড় সংকটই তৈরি হোক, নাগরিকরা অন্তত মনের জোরটুকু হারান না। বিশ্বাস করেন, তাদের মাথার ওপর ছায়া আছে। একাত্তরে যে দুর্যোগের মুখোমুখি আমরা হয়েছিলাম, এর চেয়ে বড় দুর্যোগ তো আর হতে পারে না। কিন্তু তখনো আমরা ভরসাহারা হইনি, সাহস ছিল। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ভাঙা থ্রি নট থ্রি, বালুচ-পাঞ্জাব সেনাদের হাতে সর্বাধুনিক অস্ত্র। ওই অসহায় অসম পরিস্থিতিতেও ভেবেছি মাথার ওপর যে নেতারা আছেন, তারা সৎ, দেশের জন্য সর্বোচ্চটুকুই করবেন। করেছিলেনও। অর্থ নেই, অস্ত্র নেই, ক্ষমতাধর অধিকাংশ দেশের সমর্থন নেই। তার পরও সবাই মিলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন শুধু দেশপ্রেমের জোরে।

এখন স্বাধীন দেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ। এলএনজি টার্মিনাল থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্যাটেলাইট থেকে বুলেট ট্র্রেন কোনো কিছুরই অভাব নেই। অথচ জনগণের অসুস্থতাকে পুঁজি করে ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ-তিনগুণ, যার যা খুশি। কী দেখার কথা, কী দেখছি? দেখার কথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে থেকে সবাইকে ভরসা দেবেন। দেখেছি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রজনন সক্ষমতার সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রজননের তুলনা করে বিদেশ চলে গেলেন। ফেরার পরও তার দরদি মনের কোনো পরিচয় পেলাম না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে থেকে ডেঙ্গু মারতেন না, ডেঙ্গুর প্রকোপও কমাতে পারতেন না।

কিন্তু দেশের মানুষ যখন ডুবে আছে ডেঙ্গুতে, তখন তিনি যে বিদেশ যাওয়ার মানসিকতা রাখেন, সেটিই দেশবাসীর বুকে বড় বেদনা হয়ে বেজেছে। পাশের ভারতে রেল দুর্ঘটনার কারণে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের দৃষ্টান্ত আছে। নিশ্চয়ই ওই দেশের রেলমন্ত্রী সরাসরি রেলকে দুর্ঘটনায় ফেলেননি। পদত্যাগ এক ধরনের দায় স্বীকার। দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের প্রতি সমবেদনা-শ্রদ্ধা প্রকাশের প্রতীকী দৃষ্টান্ত। ভিন্ন একটি ব্যঞ্জনাও আছে এর।

পদত্যাগের মাধ্যমে জনসাধারণের মনে এই প্রলেপটুকু অন্তত পড়েÑ তারা ভাবেন, তাদের দুর্ভোগ-দুর্দশায় পদত্যাগকারী অপরাধ অনুভব করছেন, সমব্যথী হচ্ছেন। আমাদের দেশে অপরাধ বোধটিই উধাও। এ দেশে জনগণই সব অপরাধে অপরাধী। আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে ভারত অভিযানের সময় তার প্রধান সেনাপতি সেলুকাসকে বলেছিলেন, ‘কী বিচিত্র এই দেশ!’ সত্যিই বিচিত্র। বিচিত্র বলেই হাজার বছর আগের এক শাসকের বাণী আজও এই দেশে প্রাসঙ্গিক। তাও যদি তিনি হতেন কোনো মহান সাধক, বিজ্ঞানী বা দার্শনিক! তবে আলেকজান্ডারকে যতই আমরা বহিরাগত দেশ দখলকারী-হামলাকারী বলি না কেন, বাংলাদেশ যে বিচিত্র- এতে সন্দেহ নেই।

চরম দুর্যোগেও আমরা এক হতে পারি না, বরং যে যার জায়গা থেকে ফায়দা লুটতে থাকি। এ দেশে উৎসবের আগে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। যে উৎসবে মসলার দরকার, এর আগে মসলার দাম বাড়ে। যে উৎসবে পোশাকের দরকার হয়, ওই উৎসবে পোশাকের দাম বাড়ে। বেশি শীতে শীতবস্ত্র কম্বলের দাম বাড়ে। ডেঙ্গুর দিনগুলোয় মশারি, কয়েল, অ্যারোসল, ওডোমাসের দাম বাড়ে। প্রলেতারিয়েত রিকশাচালকরাও ঝড়-বৃষ্টি-রোদ বুঝে রিকশা ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ, কখনো অসম্ভব দর হাঁকান। রিকশায় যারা চড়েন, তাদের কারোরই বালিশ-তোশকের নিচে বান্ডিল বান্ডিল টাকা নেই।

বিশ্বে আর কোনো দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এত বেশি অসহিষ্ণুতার সম্পর্ক আছে কিনা, তা আমাদের জানা নেই। পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার সংকট এখানে এত বেশি যে, কোনো বিষয়েই তারা একমত নন। সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী ভারতে দেখি বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগে সব রাজনৈতিক দলের পরস্পর মিলেমিশে কাজ করার শোভন দৃষ্টান্ত।

আমাদের এখানে সেটি কেন হয় না, তা ভাবা দরকার। একপক্ষ যদি বলে এ বছর ডেঙ্গু এসেছে মহামারীরূপে, অন্যপক্ষ ওই মন্তব্যকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে। বিরোধীপক্ষের মন্তব্য মাটিতে পড়ার আগেই ক্ষমতাসীনপক্ষ তাদের সব প্রচারশক্তিকে ব্যবহার করে এমন নিষ্ঠুর সব মন্তব্য করে- যার সঙ্গে ডেঙ্গুর কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ আজ পর্যন্ত দেখলাম না ডেঙ্গু নিয়ে কোনো ফলপ্রসূ কাজ কোনো দলের নেতা করেছেন।

অথচ প্রতিদিনই ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রা। একটি মাত্রা অন্যটির চেয়ে বিপজ্জনক। এসব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়াও খুব ভালো চোখে দেখে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকবে? ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে- এ সংবাদ প্রচার করলেই কি ডেঙ্গু থেকে রেহাই মিলবে?

অবাধ তথ্যপ্রবাহের বিশ্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু ও ডেঙ্গুর উপজাত সমস্যা গোপন রাখতে চাইলেও তা পারা সম্ভব নয়। তবুও ওই চেষ্টা থেকে বিরত থাকার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কোনোদিন যদি সংবাদপত্রে লেখা হয় হাসপাতালে সিট নেই, সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুখপাত্রদের কাছ থেকে জবাব আসে- হাসপাতালে সিটের অভাব নেই, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না। অতি জনঘনত্বের ভারে জর্জরিত এই দেশে এতসংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর জন্য হাসপাতালে সিট বরাদ্দ দেওয়া মুশকিল- সেটি আমরা বুঝব না কেন? কিন্তু অস্বীকারের এই প্রবণতা কেন?

সিট না পেয়ে ডেঙ্গু রোগীরা মেঝেতে মানবেতর চিকিৎসা নিচ্ছে- এ খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে, চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে যেভাবে দেখছি- সেটিই বিশ্বাস করব, নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের দেওয়া প্রেস নোট বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে আমাদের?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেস নোটটি বিশ্বাস করতে হলে অবিশ্বাস করতে হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। তাদের দেওয়া হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, আগস্টের প্রথম পাঁচ দিনে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৪৫১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩৪৮ জন। গড়ে প্রতিদিন ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছেন পাঁচজন। তার পরও বলতে হবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে? কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই বললেই যে আতঙ্ক ছড়ানো হয়, তা নয়। বরং পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণে আসে, এ জন্য ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করাই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাহায্য চেয়েছে বাংলাদেশ। কেন? ওই একই কারণে- যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ডেঙ্গু পরিস্থিতির একটি পর্যায়ে হাসপাতালে তীব্র কিট সংকট তৈরি হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ-প্রচারের পর এনবিআর দ্রুতই কিট আমদানির ওপর সব শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়। শোনা যাচ্ছে, এখন নাকি আর হাসপাতালগুলোয় কিটের সংকট নেই। সংবাদমাধ্যমে কিট সংকটের কথা না এলে এ সমস্যার এত দ্রুত সমাধান হতো না- এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। অমর্ত্য সেন তো আর এমনিতে বলেননি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলে কোথাও কখনো দুর্ভিক্ষ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।

দুই

বুড়িগঙ্গাসহ চারটি নদীর আশীর্বাদ পেতে মোঘল শাসকরা ঢাকায় স্থাপন করেছিলেন বাংলার রাজধানী। দোলাই-নড়াইসহ অর্ধশতাধিক খালের জলজ যোগাযোগে ঋদ্ধ ঢাকা তৎকালীন বিশ্বের দ্বাদশতম সুন্দর শহরের স্বীকৃতিও পেয়েছিল। বিশ্বের দ্বাদশতম সুন্দর ওই ঢাকাকে আজ ডেঙ্গুবহুল ঢাকায় পরিণত করলো কে, কারা? বহুবার বহু পরিবেশবিদ লিখেছেন, বাংলাদেশের নগরগুলোয়, বিশেষ করে ঢাকায় প্রাণ-প্রকৃতির শৃঙ্খলা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। মাত্রা অতিরক্তি ইমারত তৈরি করতে গিয়ে এমন বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে- যেগুলো প্রকৃতিতে থাকলে ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগে এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না মানুষকে।

প্রতিদিন যেসব ইমারত নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোই তো এডিসের প্রধান ঘাঁটি। এসব ঘাঁটিতে এডিস আছে নিরাপদে নির্বিঘ্নে নিরুপদ্রবে। এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। উল্টো সিদ্ধান্ত হচ্ছে আক্তান্ত নগরবাসীর ওপরই জরিমানা আরোপের। উড়ন্ত মশানিধনে যে সিটি করপোরেশন ব্যর্থ হয়েছে, এর কোনো দায় তারা নেবেন না? নির্বাচনের সময় যখন আমাদের কাছে ভোট চাইতে এসেছিলেন, তখন তো আপনাদের কথা শুনে ভেবেছিলাম মশা চলে যাবে জাদুঘরে। এখন আমাদের ওপরই আবার জরিমানা? ক্ষমতার সিংহাসনের হাতলে হাত রাখলে সবাই সব প্রতিশ্রুতি ভুলে যান।

তিন

প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারলে মশার মতো এত ক্ষুদ্র প্রাণীও যে জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, তা এখন আমাদের চড়া মাশুল দিয়ে বুঝতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, হাসপাতালে আক্রান্ত রোগীদের ৩০-৩৫ শতাংশ ডেঙ্গু ভাইরাস পাওয়া গেলেও বেশিরভাগই আক্রান্ত হেয়েছেন সোয়াইন ফ্লু, ভিক্টোরিয়া ইলনেস, ইয়ামাগাতা ইলনেস ফ্লুতেও। কয়েক বছর ধরে দেখেছি চিকনগুনিয়ার বিস্তার। কে জানে প্রায় বিলুপ্ত ভাইভ্যাক্স ও ম্যালিগনেন্ট ম্যালেরিয়াও আবার ফিরে আসে কিনা।

বাসাবাড়ির জমানো পরিষ্কার পানিই এডিসের প্রজননস্থল। এ কারণে না হয় ডেঙ্গুর মহামারীর দায় নগরবাসীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া গেল। কিন্তু সারাবছর ধরে আমরা যে কিউলেক্স মশার উপদ্রব সহ্য করি, এর কোনো দায় সিটি করপোরেশনের নেই? নগরীর অসংখ্য খোলা জায়গা, উদ্যান, রাস্তায় যে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জমে থাকা জল মশার বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে, এর দায় সিটি করপোরেশন নেবে না?

বাংলাদেশ সফররত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ভুপেন্দর নাগপাল অবশ্য বলে গেছেন, কেবল জমানো পরিষ্কার পানিই এডিসের প্রজননস্থল নয়। বরং এডিস মশার পছন্দের প্রজননস্থল সরকারি পরিবহন পুল। সারিবদ্ধ গাড়ি, টায়ার, পরিত্যক্ত টিউব, যন্ত্রপাতিতে যে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে, তাও তো মিথ্যা নয়। পুলিশের জব্দ করা পরিবহন পুলও এডিসের বিশাল এক আস্তানা। বিমানবন্দরের রানওয়ে যে মশার সবচেয়ে বড় দুর্গ হয়ে আছে, এ দায়ও কি জনগণের?

চার

এডিস মশার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যদি দেখি, তা হলে এডিস মশার কোনো দোষই নেই। এটি কেবল তার প্রজাতি রক্ষার কাজই করে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ তার স্বজাতি রক্ষার জন্য কী করল? প্রায় ৫০ কোটি টাকার মতো খরচ করে এমন ওষুধ আমদানি করলÑ যা মানুষকে রক্ষার পরিবর্তে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ওষুধ আমদানি দুর্নীতির প্রতিটি ধাপের সঙ্গে যারা জড়িত, জানি কোনোদিন তারা বিচারের আওতায় আসবেন না। ফের বছর আবার আমরা জনগণই মরব। কী জানি কী ওষুধ আমদানি হবে! হয়তো দেখা গেল বিলুপ্ত অ্যানাফিলিস আবার ফিরে এলো। তখন আমরাই আবার মরব ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া, ইবোলা, জিকা... কে জানে কোন মৃত্যুদূতের হাতে?

জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

advertisement