advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চামড়ার কবর : সামনে কোন খবর

১৭ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০১৯ ১০:০২
advertisement

দাম না পেয়ে কোথাও কোথাও এবার কোরবানির পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার খবর এসেছে কোনো কোনো জায়গা থেকে। এমন পরিস্থিতি ‘অরাজকতা’র চেয়েও বেশি কিছু। একে কেবল দুঃখজনক বললেও কম বলা হবে। নজির হিসেবে এটি নতুন। এর মধ্য দিয়ে এবার কোরবানির অর্ধেকেরও বেশি চামড়া নষ্টের শঙ্কা করা হচ্ছে। টাকার অঙ্কে এ সর্বনাশ আড়াইশ কোটি টাকার ঘরে।

এসব খবর বা ঘটনাকে তুড়ি মেরে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবস্থা নেই। ‘ষড়যন্ত্র’ বলার সুযোগও কম। এর আগে পাট, ধান নিয়ে নানা মন্দ খবর আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। পাটশিল্পের দাফন-কাফন হয়েছে অনেক আগেই। ধান নিয়েও শুরু হয়েছে। এবার যোগ হলো চামড়া। প্রতিবছরই ঈদের পর কোরবানির চামড়া নিয়ে হইচই ও ঠকবাজির চিত্র একেবারে নতুন নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই চিত্রের সঙ্গে অপরিচিতও নন। কিন্তু এবার সেটা চরমে। অবস্থাটা মাত্রা ছাড়ানো।

কোরবানির পর এ চামড়া দ্রুত বিক্রির কোনো বিকল্প আপাতত নেই। প্রচ- গরমে চামড়া অল্পতেই নষ্ট হয়ে যায়। চামড়ার টাকা এতিম কিংবা মাদ্রাসা-মসজিদকেই দান করা হয়। তাই চামড়ার এ পরিস্থিতি কেবল সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পেরই ক্ষতি করেনি; বঞ্চিত করেছে দরিদ্র মানুষ ও সামাজিক অর্থায়নে পরিচালিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। তাই দাম কম হলেও বিক্রি করে দেওয়ার মানসিকতা প্রায় সবার থাকে। কিন্তু কম বলতে এত কম?

গত ৩১ বছরের মধ্যে এবার রেকর্ড পতনে এসেছে চামড়ার দাম। ৭০-৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়া ৩০০ টাকাতেও বিক্রি করা যাবে না? খাসির চামড়া ১০ টাকা, এটাও মানতে হবে? ৩১ বছর আগে ১৯৮৯ সালে ৭০০ টাকায় যে চামড়া বিক্রি হয়েছে এবার তার দাম ৩০০ টাকা। ঈদের আগে সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। চামড়ার দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ঢাকায় গরুর ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করা হয়েছিল এ দাম। কিন্তু এর তিন ভাগের এক ভাগ দামেও চামড়া বিক্রি করতে পারেননি অনেকেই। যার জেরে চামড়া মাটিচাপা দেওয়াসহ এত ঘটনা। এত কথা।

খসড়া হিসাবে বলা হয়, এবারের ঈদে ১ কোটি ২৫ লাখ কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ লাখ গরু ও ৭০ লাখের মতো ছাগল। উট, দুম্বা, ভেড়ার পরিমাণ উল্লেখ করার মতো নয়। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ১০ কোটি বর্গফুটের মতো চামড়া আসে কোরবানি ঈদে। এ মৌসুমে সংগৃহীত ১০ কোটি বর্গফুট চামড়ায় সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কম পেল। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে পার করতে হয় অন্তত ১০টি ধাপ। প্রথম ধাপেই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ। একটি গরুর চামড়ায় লবণ লাগে ৮ থেকে ১০ কেজি। জনবল ও অন্যান্য খরচসহ সংরক্ষণ করা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম দাঁড়ায় ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। চামড়ার প্রধানত দুটি গ্রেড হয়। ‘এ’ গ্রেডের প্রতি বর্গফুট চামড়া ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিদেশে রপ্তানি হয়।

বাংলাদেশের চামড়া ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, জাপান, তাইওয়ানসহ অনেক দেশে রপ্তানি হয়। বিশ্ব বিখ্যাত পুমা, হুগোবস, গুচি, পিভলিনসসহ অনেক কোম্পানি তাদের কাঁচামাল নেয় বাংলাদেশ থেকে।

চামড়ার দাম কমলেও জুতার দাম বাড়ছে। এক জোড়া জুতা তৈরিতে লাগে সাড়ে তিন বর্গফুট চামড়া। এর বাইরে আরও দেড় বর্গফুট লাগে জুতার লাইনিংয়ের জন্য। সেই হিসাবে এক জোড়া জুতায় লাগে মোট পাঁচ বর্গফুট চামড়া। বাংলাদেশে ১ হাজার টাকার নিচে জুতা মেলে না। মাঝারি মানের জুতা কিনতে গেলে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু চামড়ার দাম কত? চামড়া ও জুতা শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশে সবচেয়ে কম হলেও জুতার দাম কম নয়।

এবার চামড়ার অকল্পনীয় দরপতনের পর এখন চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য। আড়তদারদের অভিযোগ, তারা ট্যানারি মালিকদের থেকে বকেয়া টাকা পাননি বলে চামড়া কিনতে পারেননি। আবার ট্যানারি মালিকরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার বাজারের দায় তারা নিতে পারেন না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে চামড়া না কেনার আতঙ্ক ছড়িয়ে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা নামমাত্র মূল্যে চামড়া কেনার পরিস্থিতি তৈরি করেছেন বলেও তথ্য মিলেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী এটাকে বলছেন, ব্যবসায়ীদের ‘কারসাজি’। এখন ট্যানারি মালিকরা চামড়া সরকার নির্ধারিত দামে কেনার উদ্যোগ নিলেই বা কী? মাঝখানে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। সেই ক্ষতিপূরণ আশা করা আহম্মকি। ক্ষতি নিশ্চিতের পর এখন সেই উদ্যোগও আরেক ধরনের চাতুরি। আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর ধরে তাদের ৪০০ কোটি টাকা পাওনা পড়ে আছে। এ অর্থ পরিশোধ না করলে তারা ট্যানারি মালিকদের চামড়া দেবেন না। আড়তদাররা বলছেন, তাদের অনেকেই আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে, এমনকি ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখেও ব্যবসায় টাকা খাটিয়েছেন। ট্যানারি মালিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়ে থাকায় অনেক আড়তদার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। নিঃস্ব হয়ে গেছেন কেউ কেউ।

অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা কোরবানির ঈদের আগে ব্যাংক থেকে ঋণসহায়তা পেয়েও আড়তদারদের বকেয়া অর্থ পরিশোধ করেননি। এই বিপুল পরিমাণ বকেয়া আদায়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত তারা ট্যানারিতে একটি চামড়াও বিক্রি করবেন না। অন্যদিকে ট্যানারি শিল্পের মালিকদের তীর আড়তদারদের দিকে। তারা জানিয়েছেন, পোস্তার আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে এবার ন্যক্কারজনকভাবে চামড়ার দাম কমিয়েছেন। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দামেই আড়তদারদের কাছ থেকে আমরা চামড়া কিনবে। তা হলে আড়তদাররা কেন মাঠ থেকে চামড়া কেনা ব্যবসায়ীদের ন্যায্যমূল্য দেননি? কেন তারা দরিদ্র মানুষের হক নষ্ট করলেন? এসব কেন এর জবাব খুঁজতে গিয়ে কেঁচোর বদলে বেরিয়ে আসছে বিষাক্ত যত কালসাপ।

মানুষকে জানানো হচ্ছিল, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানি খাত চামড়াশিল্প। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেটবাজির খবরে কী জানল? কী বুঝল মানুষ? স্পষ্ট হলো বাংলাদেশের অন্যতম বড় শোষকদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এ ট্যানারি সেক্টর। কৃষক সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। কম দামে ধান বেচতে বাধ্য হন। কোরবানির চামড়া মধ্যবিত্তরা সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারে না। কোরবানির ত্যাগের সুযোগে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা চামড়া ব্যবসায়ী কিছু ফড়িয়ার হাতে চলে গেল। মানুষ বাদ-প্রতিবাদে অক্ষম-অসহায়। ভীত। চামড়াকা-ে তাই প্রভাব থাকলেও প্রতিক্রিয়া নেই। ক্ষোভ থাকলেও বিক্ষোভ নেই। অনেক কিছু সহ্য করতে করতে আমাদের চামড়ার সহ্যক্ষমতা এখন অনেক।

কাঁচা চামড়ার বাজারের এ পরিস্থিতি এমন সময় দেখা যাচ্ছে, যখন তৈরি পোশাক খাতের পর এ শিল্পকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিবেচনা করা হচ্ছে। গোষ্ঠীবিশেষের সুবিধার জন্য একটি খাতে এমন অস্থিতিশীলতা, সামনে আরও কোনো খারাপ খবরের ইঙ্গিত না হলেই ভালো। চামড়া পুড়িয়ে ফেলা বা মাটিতে পুঁতে ফেলাও সমাধান নয়। দাম না পেয়ে সরকার বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাগ করে চামড়া কবর বা পুড়িয়ে ফেলা অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়। সিন্ডিকেটকেই জয়ী করা হয়। তাই নষ্ট না করে চামড়া নিয়ে বিকল্প ভাবনা এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্ট চিন্তাশীলদের একটি পরামর্শ এখানে শেয়ার করা যেতে পারে। তাদের মতে, দেশের মাদ্রাসাগুলোয় চামড়ার মিনি কারখানা গড়ে তোলার কথা চিন্তা করা যায়। সেই সঙ্গে মাদ্রাসায় চামড়া দিয়ে ব্যাগ-জুতা তৈরির প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। তা মাদ্রাসার ছাত্রদের আত্মনির্ভরশীল করবে। বেকারত্ব ঘুচবে। চীনসহ কিছু দেশে টিফিন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ঘড়ি, কলম ধরনের হালকা আইটেম তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উভয়েই ওই আয়ের ভাগ পায়। পর্যালোচনায় নেওয়া যেতে পারে এ ধারণা ও পরামর্শটি।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক ও বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

advertisement