advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চামড়াশিল্পে ধস : দায় কার

মাহফুজুর রহমান
২০ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৯ ০৮:৪৯
advertisement

 

পাট, চা, চামড়াÑ এই তিনটি পণ্য রপ্তানি করেই আমাদের দেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, কথাগুলো পুরনো আমলের। কিন্তু দু-তিন বছর ধরে চামড়াশিল্প এবং কাঁচা চামড়ার বাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর চলতি বছর এই খাত এতটাই সংকটাপন্ন হয়েছে যে, এর দায়ভার নেওয়ার লোকেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এখন চলছে ‘উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে’ পাচারের কাজ। পৃথকভাবে সবাই নিজেদের কোনো দোষ দেখছেন না। কিন্তু এই খাতটির দুর্বল হৃৎপি- ধুঁক ধুঁক শুরু করে দিয়েছে। কোরামিন দিয়েও শেষ রক্ষা হবে কিনা কে জানে?

২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিদেশে চামড়া বেচে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত রপ্তানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়ে আয় দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই আয় নিম্নমুখী হয়ে দাঁড়ায়। পর্যায়ক্রমিক এই কমতির ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খাতের বৈদেশিক মুদ্রার আয় দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি খাতে কত আয় হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। তবে প্রথম তিন মাসের সাময়িক হিসাবে দেখা যায়, এই খাতে আয় হয়েছে ৮৬৩ কোটি টাকা। প্রথম নয় মাসের এই আয়কে বিবেচনায় নিয়ে গড় করা হলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আয় দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

২০১৯-২০ অর্থবছর শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বছরের প্রথমেই ঈদুল আজহা উদযাপিত হলো। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহে মহান আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি করেছেন। প্রতিবছরই কোরবানির পর ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোরবানির চামড়া কিনে থাকেন। সব চামড়া বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আড়তদারদের কাছে এসে জমা হয়। লবণ দিয়ে রাখা এসব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য আসে ট্যানারিতে। এত বছর ট্যানারির মালিকরা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন এবং আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এখন বিষয়টা উল্টে গেল কেন? ট্যানারির মালিকরা কেন আড়তদারদের কাছে বিপুল পরিমাণ দেনায় আটকে আছেন? কেন তারা টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না বা করছেন না? বাস্তবে চামড়া খাত নামের এই রোগীর মুমূর্ষু অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বিভিন্ন পক্ষের অদক্ষতা, একগুঁয়েমি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার অভাব এবং সর্বোপরি দায়িত্বহীনতা এ অঘটনের জন্য দায়ী।

এ দেশে চামড়াশিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর। নারায়ণগঞ্জ থেকে সরকার চামড়াশিল্পকে ঢাকার হাজারীবাগে নিয়ে আসে এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। কিন্তু এখানে বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করা হয়নি। ট্যানারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিত। ফলে বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়েছে। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেছে। পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য সরকার ২০০৩ সালে সাভারে বিসিকের তত্ত্বাবধানে একটি চামড়াশিল্প নগরী স্থাপন করে। প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ১৭৬ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে এই ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এর আওতায় আধুনিক বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণও যুক্ত হয়।

এই চামড়াশিল্প নগরীতে ১৫৪টি ট্যানারিকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের বারবার আদেশ-নির্দেশ প্রদান সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন সেখানে স্থানান্তর করা যায়নি। অবশেষে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাদের স্থানান্তরের কাজটি সুসম্পন্ন হয়। সাভারে অদ্যাবধি ১২৪টি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান সেখানে কাজ শুরু করেছে তাদের নামে জমির বরাদ্দ প্রদান করা হলেও জমির ইজারা দলিল অদ্যাবধি প্রদান করা হয়নি। এরূপ ইজারা দলিল বা মালিকানা হস্তান্তরের দাবি ট্যানারি মালিকদের দীর্ঘদিনের। কিন্তু গজচালের অভ্যাসধারী সরকারি কর্মকর্তারা জমির মূল্য নির্ধারণে অনেক সময় লাগিয়ে এক বিপর্যয় তৈরি করেছেন। বর্তমানে প্রতি বর্গফুট জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭১ টাকা। মালিকানাপ্রাপ্তি বা জমির ইজারা দলিলপ্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতার জন্য ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি। ব্যাংকের নিয়মানুসারে মালিকানা বা দীর্ঘমেয়াদি ইজারা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করা যায় না। তাছাড়া চামড়া খাতে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতাও ব্যাংকারদের কাছে সুখকর নয়। এর আগে অনেক ট্যানারি মালিক চামড়া কেনার জন্য গৃহীত ঋণ ঠিক সময়ে ফেরত প্রদান করতে পারেননি।

এবারকার ঈদুল আজহার সময় লক্ষ করা গেছে, কাঁচা চামড়ার চাহিদা একেবারেই নেই। এ চিত্রটি ছিল দেশব্যাপী। কোথাও কোথাও চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রতিটি গরুর চামড়া দু’শ থেকে পাঁচশ টাকার ভেতর কিনেছেন। কোনো কোনো এলাকায় একেবারেই চামড়া ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ফলে কোরবানির পশুর চামড়া মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। ইসলামের নির্দেশানুসারে কোরবানির চামড়া বিক্রয়লব্ধ অর্থ দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয় অথবা এতিমখানায় প্রদান করা হয়। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার মানে হলো, দেশের হতদরিদ্র মানুষরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেন। আর দেশ তো বৈদেশিক মুদ্রা হারালই। পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৩ সালে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা। ২০১৪ সালে এটি কমে দাঁড়ায় ৭০-৭৫ টাকা এবং ২০১৫ সালে ৫০-৫৫ টাকা। কিন্তু ২০১৭ সালে এই পরিমাণ চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা। প্রতিবছরই এভাবে দাম কমে গেছে। অথচ এই একই সময়কালে চামড়ার তৈরি জুতা ও ব্যাগের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। চামড়া নিয়ে এ ধরনের সিন্ডিকেটি মনোভাবের জন্য এখানে মানসম্পন্ন প্রসেসকৃত চামড়া পাওয়া যাচ্ছে না বিধায় একটি প্রতিষ্ঠান তাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ফিনিশড চামড়া আমদানি করে থাকে। অথচ একটু মনোযোগী হলে ভালো চামড়া বাংলাদেশই জোগান দিতে পারে। মানের দিক থেকে বাংলাদেশের চামড়ার চাহিদা প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ছাগলের চামড়া খুবই উন্নত মানের। তা ছাড়া বাংলাদেশে প্রাপ্ত চামড়া সুস্থ-সবল পশু জবাই করে সংগ্রহ করা হয়। আর প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে প্রাপ্ত চামড়ার অধিকাংশই মৃত প্রাণীর শরীর থেকে নেওয়া হয়। এ সুযোগগুলোও আমরা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি।

সরকারি সূত্র অনুসারে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে কোরবানি হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ পশু। ২০১৭ সালে কোরবানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫ লাখ এবং ২০১৮ সালে ১ কোটি ১০ লাখ। এ বিবেচনায় বলা যায়, ২০১৯ সালেও কমপক্ষে ১ কোটি ১০ লাখ বা তার চেয়ে বেশিসংখ্যক পশু কোরবানি দেওয়া হয়েছে। এবারের চামড়া বেচাকেনায় দরিদ্র মানুষ, কোরবানিদাতা, ফড়িয়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেউই খুশি হতে পারেননি। এভাবে সিন্ডিকেট করে চামড়া না কেনা একটি অন্যায্য কাজ হয়েছে। এই চামড়া এখন আড়তদারদের ঘরে জমা হয়েছে। তারা প্রথমে বলেছিলেন, আগের বকেয়া টাকা না পেলে ট্যানারির কাছে তারা চামড়া বেচবেন না। জানা যায়, ট্যানারির মালিকদের কাছে চামড়ার মূল্য বাবদ আড়তদারদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে গত ১৮ আগস্ট, ২০১৯ তারিখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক আলোচনা ও বাদানুবাদের পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ট্যানারি মালিকরা নগদ টাকায় আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া কিনবেন। আর অতীতের বকেয়াসংক্রান্ত বিষয়টির নিষ্পত্তি করার জন্য এফসিসিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যাহোক বিষয়টির আপাত একটি সমাধান হয়েছে। এখন এই সিদ্ধান্ত কতটা এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হয় সেটাই দেখার বিষয়। কিন্তু দেশের হতদরিদ্র মানুষের কিছুটা আর্থিক পাওনা থেকে তারা চিরতরেই বঞ্চিত হলেন। ভবিষ্যতে যাতে এমনটি আর না হয় সেজন্য এখনই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। ট্যানারি মালিকদের নামে জমির ইজারা দলিল প্রদান, কোরবানির আগে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাকরণ এবং চামড়ার একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে সেটি বাস্তবায়নের দিকে সরকারকে নজর রাখতে হবে। অন্যদিকে আড়তদারদের দাবির মুখে কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার অনুমতি না দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ সঠিকভাবে হাল ধরতে পারলে চামড়ার হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে এবং এটি হবে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

 

য় মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement