advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রকল্প দুর্বলতার মাসুল দিচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

আব্দুল্লাহ কাফি
২২ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:১২
advertisement

দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে চার লেনে উন্নীত হওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্থায়িত্ব প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী ২০ বছর। অথচ নির্মাণের ২ বছর না যেতেই দেবে যাচ্ছে মহাসড়কের দু’পাশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিটুমিন কার্পেট। সড়কের ডিজাইনে ট্রাফিক প্রবৃদ্ধির হারও কমিয়ে ধরা হয়। এ ছাড়া, সড়ক নির্মাণের পর যানবাহনের অনুমোদিত লোড দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়ন দুর্বলতার কারণে মহাসড়কটির এ অবস্থা হয়েছে বলে উঠে এসেছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০১০ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে শেষ হয় ২০১৭ সালের জুনে। শুরুতে এক হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলে বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত তিন হাজার ৮১৬ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ঠেকে।

আইএমইডি বলছে, মহাসড়কটি ৪ লেনে উন্নীত হওয়ায় দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে যানবাহনের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সড়কে পরিবহনের সংখ্যা গৌরীপুর-ইলিয়টগঞ্জ সেকশনে ২০০৭ সালে ১২ হাজার ৯০০ থাকলেও ২০১৬ সালে ৩০ হাজার ৮৯০টিতে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, ফেনী-ফাজিলপুর সেকশনে ২০০৭ সালের ১০ হাজার ৩২৪টি থেকে ২০১৬ সালে ২২ হাজার ৯৩৬টিতে দাঁড়ায়।

এ ছাড়াও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ৭৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। যার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুফল বয়ে এনেছে। বর্তমানে ৯৯ দশমিক ৫২ শতাংশ কন্টেইনার সড়কপথে পরিবহন করা হয়।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের মান ঠিক না থাকা প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, প্রথমত প্রকল্প নেওয়ার আগে কতটুকু বাস্তবসম্মত তা বিশ্লেষণ করা, দ্বিতীয়ত এর মান কতটুকু নিশ্চিত করা গেল আর তৃতীয়ত যারা কাজ করবেন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্প নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ব্যয় কম দেখায়। যাতে তাড়াতাড়ি প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া যায়। এর পর শুরু হয় একের পর এক সংশোধন। আর ব্যয় বাড়তে থাকে। এ ছাড়াও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথম ১০ মাস তেমন কাজ করতে পারে না। শেষের দুই মাসে তড়িঘড়ি অর্থ খরচ করে। ফলে কাজের মান ভালো হয় না। এরও একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে জবাবদিহিতা না থাকা। প্রকল্পের কাজের সময় ঠিকমতো তদারকি না থাকার কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দিতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন না থাকা, জেব্রা ক্রসিং ও সংকেত না থাকার কারণে এ সড়কে দুর্ঘটনাও বেড়ে গেছে। তবে সড়কটির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে সময় ৩-৪ ঘণ্টা কমে গেছে।

সমাপ্ত প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, সড়কটি দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীতকরণে ১০টি প্যাকেজ, সেতু নির্মাণে ৩টি প্যাকেজ, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে একটি ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে একটি প্যাকেজÑ এই ১৫টি প্যাকেজের সংস্থান ছিল। প্রকল্পের আওতায় সড়কটির ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার ৪ লেনে উন্নীতকরণ ছাড়াও ২৩টি সেতু, ২৪২টি কালভার্ট ৩টি রেলওয়ে ওভারপাস এবং দুটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও মিডিয়ানে বৃক্ষরোপণ, কিলোমিটার পোস্ট, সাইন, সিগন্যাল ও পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য ৩৪টি স্টিল ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

আইএমইডি বলছে, ২০১৭ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হলেও ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি ও সঠিক ট্রাফিক ফোরকাস্ট নেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীতকরণ (দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম অংশ) সমাপ্ত প্রকল্পের প্রজেক্ট অ্যাপ্রেইজাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী পেভমেন্টের স্থায়িত্ব ২০ বছর। কিন্তু প্রকল্পের পেভমেন্টের ডিজাইন অনুযায়ী ১০ বছরের ইএসএএল ৬২ মিলিয়ন হওয়া সাপেক্ষে পেভমেন্টের স্থায়িত্ব ১০ বছর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির ডিপিপি প্রণয়নেই দুর্বলতা ছিল। এ কারণে বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়। ফলে ব্যয় বাড়লেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ছিল মন্থর। প্রকল্পের কাঠামো অনুসারে সড়কটির স্থায়িত্বকাল হবে ২০ বছর। কিন্তু এরই মধ্যে সড়কের দেবে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। সক্ষমতার বাইরে দ্বিগুণ ওজনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কারণে সড়কটি দেবে যাচ্ছে। অনেক সময় বেশি ভারবাহী যানবাহনও জরিমানা দিয়ে চলাচল করে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের প্রকৌশলীরা বলছেন, পিচের জন্য পাথর-বিটুমিনের যে মিশ্রণ তৈরি করা হয়, সেটি ঠিকমতো না হলে সড়ক দেবে যেতে পারে। আরেকটি কারণ যানবাহনের ওভারলোড। এর বাইরে দুর্বল নকশা বা দুর্বল নির্মাণকাজ এবং মাটির ধাপগুলোতে ঠিকমতো রোলিং না করা হলেও সড়ক দেবে যেতে পারে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে ইউএসএএল ৮.১৬ টন ও দুই এক্সেল ছয় চাকার ট্রাকের ওজনসীমা ১০.২ টন হিসাবে সড়কটির পেভমেন্ট ডিজাইন করা হয়। ২০১৭ সালে সবশেষ সরকারি নির্দেশনায় অনুরূপ ট্রাকের সর্বোচ্চ ওজনসীমা নির্ধারণ করা হয় ২২ টন। এতে সড়কটির মিডিয়ান সংলগ্ন লেনে পার্শ্ববর্তী লেনের তুলনায় বেশি দেবে যাওয়া এবং পেভমেন্টের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ না করায় সড়ক দেবে যাচ্ছে। ডিপিপি প্রণয়নের সময়ই বেশি দুর্বলতা ছিল। কারণ, সড়কের ডিজাইন করার সময় ৬ শতাংশ হারে ট্রাফিক প্রবৃদ্ধি (যানবাহনের চাপ) ধরা হয়েছিল। যদিও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ম্যানুয়ালে সড়কের ডিজাইনে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরার নির্দেশনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কের বড় দারোগার হাট এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পরিদর্শন করে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ভারবহন সীমা পুনর্নির্ধারণ করে ছয় চাকার দুই এক্সেল ট্রাকের জন্য ২২ টন, ১০ চাকা তিন এক্সেলের ট্রাকের জন্য ৩০ টন, ১৪ চাকা চার এক্সেল ট্রাকের জন্য সর্বোচ্চ সীমা ৪৪ টন নির্ধারণ করা হয়; যা সড়কের ডিজাইন প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আইএমইডি বলছে, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের উপযোগিতা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ও মজবুতিকরণ কাজ করতে হবে। এ ছাড়া ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কুমিল্লার ময়নামতি ও পোর্ট কানেকটিং সড়কে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ স্টেশন স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়কে চিহ্ন, দিকনির্দেশনা, দূরত্বের বর্ণনা সংবলিত নির্দেশনা বোর্ড পর্যাপ্তসংখ্যক বাড়াতে হবে। নিরাপদ যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক মানের রোড সাইন ও সিগন্যালের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে পিডি পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

সংস্থাটির সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন ধরনের সমস্যা হয়েছে বা কী কী প্রয়োজন ছিল তা যাচাই করা হয়। যাতে পরবর্তী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কাজে আসে।

advertisement