advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিপন্ন পরিবেশ

হাসান আল জাভেদ
২৫ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯ ১১:১৪
advertisement

‘সাবধান! বন্যহাতি চলাচলের পথ’- এমন সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড সাঁটানো আছে কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং আঞ্চলিক সড়কের দুপাশে। অথচ সাইনবোর্ডের ঠিক পেছনেই স্থাপন করা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ শরণার্থী ক্যাম্প। বন উজাড় করে রোহিঙ্গাদের জন্য বসতি স্থাপন ও জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে বন্ধ করা হয়েছে বন্যপ্রাণী হাতির চলাচল বা বিচরণক্ষেত্র।

বাধাপ্রাপ্ত হয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাও করছে হাতির পাল, গত দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্যমতে, কক্সবাজারের বনাঞ্চলগুলো মূলত এশিয়ান হাতির বিচরণের ঐতিহ্যগত রুট। কিন্তু এ অঞ্চলে রোহিঙ্গা অভিবাসনের কারণে হাতির পাল এক বন থেকে অন্য বনে চলাচালে বাধা পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বাধা ভাঙারও চেষ্টা করছে এরা। তখনই বাধে মানুষ-হাতির সংঘর্ষ। এতে প্রাণও হারাচ্ছেন রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় জনতা। অন্যদিকে হাতিরাও বনে পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না।

প্রকৃতি ও পরিবেশবিদরা বলছেন, হাতি বৃহৎ বন্যপ্রাণী ও শক্তিধর হওয়ায় মানুষের কাছে প্রকৃতি বিনষ্টের প্রতিশোধ নিচ্ছে। হাতি ছাড়াও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যান্য বন্যপ্রাণী, জীবজন্তু-পাখিসহ জীববৈচিত্র্য।

বিনষ্ট হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, লতা, গুল্ম, বাঁশ, বেত, উলুফুল, ঔষধি গাছ। এসব ক্ষুদ্র বন্যপ্রাণী, জীবজন্তু ও গাছপালা হাতির মতো এ মুহূর্তে প্রতিশোধ না নিতে পারলেও অদূর ভবিষ্যতে তা আরও বেশি হুমকিস্বরূপ হবে। তখন সাগর, পাহাড় আর সবুজ বনাঞ্চলের মধুর সম্মিলনী কক্সবাজার হারাবে তার স্বাস্থ্যকর স্থান নামক খেতাব। বেঁকে বসবেন প্রাণের তৃষ্ণা মেটাতে দূর-দূরান্ত থেকে এই লীলাভূমিতে ছুটে আসা প্রকৃতিপ্রেমীরা। আর পর্যটনের সম্ভাবনা হারাবে বাংলাদেশ। এ জন্য দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি হারানো জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা।

কক্সবাজারের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএইচএম রায়হান সরকার। রোহিঙ্গা অভিবাসনে প্রকৃতির ক্ষতির বিষয়ে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে কক্সবাজারে হাতির সংখ্যা কমে আসছে। যদিও আইইউসিএন দাবি করছেÑ ৬৭টি হাতি আছে।

বাস্তবে তার পাঁচভাগের একভাগও নেই। হাতির মতো বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও জীবজন্তুও বিনষ্টের পথে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও রয়েছে ভূমিধসের ঝুঁকিতে। অন্যদিকে শরণার্থী ক্যাম্পে সরকার পানি সরবারহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয় পুকুরের পানির স্তর নেমে যাবে। বৃষ্টিপাত কম হলে প্রকট হবে পানি সমস্যা। তখন টিকে থাকা হাতিগুলো পানি সংকটে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও হামলা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘একসময় হয়তো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে। এর পর হয়তো নতুন করে বনায়নও হবে। কিন্তু তখন বিনষ্ট হওয়া এই পরিবেশ ও প্রকৃতি ফিরে পাওয়া কঠিন। সেই ভুলটা আগেই করা হয়েছে। তাই যত দ্রুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা যায় ততই মঙ্গল।’

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃশ্যমান বন্যপ্রাণী হাতির আক্রমণের মতোই পরিবেশ বিপর্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যায় পড়ছে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার পাশাপাশি পরাগায়ন কমে কৃষিজমিতে ধান ও ফল-সবজির উৎপাদন কমে আসবে। জীববৈচিত্র্যের হুমকিতে পড়ায় ওই এলাকার মানুষের মধ্যে রোগবালাই নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রতিদিন জ্বালানি হিসেবে ৫০০ টন কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে বাড়ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড।

কক্সবাজার বন বিভাগের (দক্ষিণ) তথ্যমতে, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে গণহত্যার পর দেশটির রোহিঙ্গা নাগরিকরা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, তাননিমার খোলা, মক্করারবিল বা হাকিমপাড়া, জামতলী বাঘঘোনা, শফিউল্লা কাটা এবং টেকনাফের পুটিবুনিয়া ও কেরনতলী বন বিভাগের পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। এতে ধ্বংস হয়েছে ৬ হাজার ২০০ একর সামাজিক ও প্রাকৃতিক বন। উজাড় হওয়া এসব গাছপালা ও লতাগুল্মের আনুমানিক বাজারমূল্য এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আবার ২০১৭ সালের পরও বিভিন্ন সময় নাফ নদ পেরিয়ে কিছু কিছু রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা বসতি স্থাপন করেছেন বালুখালীর নতুন পাহাড়ে। কক্সবাজারের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির অবশ্য বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওগুলো বৃক্ষরোপণ করবে। আর বন বিভাগের পক্ষ থেকে সাত বছরের মধ্যে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে বনায়ন করা হবে। যেসব জায়গা থেকে রোহিঙ্গারা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেছেন, এর এক হাজার ৮৮১ হেক্টরে এ বছর বনায়ন হয়েছে।’

পরিবেশ ও বন বিভাগ বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের কোলে, পাদদেশে, কোথাও পাহাড় কেটে আবার পাহাড় ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার অস্থায়ী ঘর। স্থাপন করা হয়েছে নলকূপ-পায়খানা, ১৩ কিলেমিটার বিদ্যুৎ লাইন, ৩০ কিলোমিটার সড়ক, ২০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয়সহ গুদামঘর। অপরিকল্পিতভাবে প্রতিনিয়তই কাটা হচ্ছে পাহাড়। তবে যত্রতত্র পায়খানা ও নলকূপ স্থাপন আর পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ যেমন বিনষ্ট হচ্ছে, তেমনি পাহাড়ের মাটি বালুকাময় হওয়ায় ঝুঁকিও বাড়ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’ কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের শুরুতেই পরিকল্পনার অভাব ছিল। তবে এখনো তাদের পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে যাতে ছড়িয়ে না পড়তে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যেসব পাহাড় থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে দ্রুত গাছ লাগাতে হবে।’

advertisement