advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা হয় ১৪ আগস্ট

হাসান আল জাভেদ
২৫ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯ ০০:৩৮
advertisement

মংডু পুলিশ স্টেশনের খুব কাছাকাছি বসবাস করতেন রোহিঙ্গা নারী সিতারা বেগম। একই সমাজে বসবাসকারী মগ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দারুণ ভাব ছিল তার পরিবারের। এক রাতে সিতারার ঘুম ভাঙে প্রতিবেশী মগদের চিৎকারে। তখন রাত ৩টা। চোখের সামনে দাউ দাউ করে পুলিশ স্টেশন জ্বলছিল। আর তার পাশে দাঁড়িয়েছিল চেনা-অচেনা কিছু পুরুষ। বৃদ্ধ সিতারা বেগমের ভাষ্যÑ

‘একটু এগিয়ে দেখি অচেনা মানুষগুলো আর্মি। তাদের পাশে মগরা। একপর্যায়ে আর্মিরা চলে যায়। তখনো আগুন জ্বলছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রতিবেশী মগরাই রোহিঙ্গাদের বলতে থাকেÑ তোরা আগুন দিয়েছিস। বাঁচতে হলে বাংলাদেশে চলে যা।’ তাই প্রাণে বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে এ দেশের পথে রওনা হন সিতারা বেগম।

তার মতো রাচিডংয়ের পুলিশ স্টেশনে অগ্নিকা-ের দৃশ্য দেখে এসেছিলেন ৪৫ বছর বয়সী নুরুল আমিন। সঙ্গে তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রী। কৃষক নুরুল আমিনের ভাষ্যÑ ‘বাড়ি থেকে ওই পুলিশ স্টেশনের দূরত্ব আধা কিলোমিটার হবে। সেদিন দুপুরে পুলিশ স্টেশনে কারা আগুন দিয়েছে, সেটি বলতে পারব না। তবে আগুন জ্বলার সময় সেনাবাহিনীর লোকজন সেখানে দাঁড়িয়েছিল। পাশে দেখা গেছে মগদেরও।’ কৃষক নুরুল আমিন জানান, নিজেরা প্রাণে বেঁচে গেলেও পথে পথে স্বজাতির লাশের সারি দেখে এসেছেন তারা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের বালুখালী সড়কে কথা হয় মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এমন কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে।

২০১৭ সালের ২৪ ও ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু ও বুচিডাংয়ের ৩০টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সেনাঘাঁটিতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনে দেশটি। ওই হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য ও ৫৯ রোহিঙ্গা বিদ্রোহী নিহত হন বলে দাবি করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন অজুহাতে সাজানো-গোছানো ঘরে অগ্নিসংযোগ আর আঙিনায় চোখের সামনে আর্মি-মগদের গুলি বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রিয় স্বজনকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন বারবার নৃশংসতার শিকার রোহিঙ্গারা। তবু প্রাণে বাঁচার আকুতি। গোলাভরা ধান, খড়ের গরু, কানি কানি ফসলি জমি আর ঘরভর্তি সম্পদ রেখে পালিয়ে আসার লড়াই। সেনাদের বন্দুকের নলের মুখ থেকে আড়ালে থাকতে ডোবা-নদী-পাহাড় ঘুরে নাফ নদ এবং বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তে ২৪ আগস্টেই জড়ো হন লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু। নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীর কান্নায় সেদিন বাংলাদেশ সীমান্তের আকাশ যেন কাঁদছিল। অন্ন-বস্ত্রহীন রোহিঙ্গাদের চোখ ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এপারেও অস্ত্র তাক করেছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। নিরুপায় হয়ে নো-ম্যান্সল্যান্ড কিংবা কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে খোলা আকাশের নিচে ছিল তাদের অপেক্ষা।

এর পর রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে মানবতার ভূমি হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি পায় বাংলাদেশ। বিশ্বে এখন সবার্ধিক শরণার্থী আশ্রয় দেওয়া দেশের নামও বাংলাদেশ। বিভিন্ন সংস্থার মতে, ২০১৭ সালে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আগে বিভিন্ন সময় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে ছিল আরও পাঁচ লাখ। সে হিসাবে ১২ লাখেরও বেশি শরণার্থী এ দেশের ভূখ-ে অবস্থান করছে। যদিও পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর হাতের আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক সংগ্রহ করা হয়েছে।

রাখাইনের পুলিশচৌকিতে হামলার অজুহাতে অপারেশন শুরু হলেও রোহিঙ্গা নিধনের চূড়ান্ত নীলনকশা আঁকা হয় ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি‘ ও ‘সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে সু চি সরকারকে ওই দিন ১১টি সুপারিশসংবলিত খোলা চিঠি দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সমর্থিত ২০টি রাজনৈতিক দল। চিঠি দেওয়ার আগে দলগুলো আলোচনায়ও বসে। ওই চিঠিতে বলা হয়, ১১ লাখ বাঙালি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে বসবাস করছে। তারা সহিংসতার গুজব ছড়িয়ে রাজ্যটির নিরাপত্তা বিঘিœত করছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’দের বিতাড়ন করতে হবে। ‘টুয়েন্টি পলিটিক্যাল পার্টিস আর্জ গভর্নমেন্ট টু অ্যাক্ট অন রাখাইন ইস্যু’ শিরোনামে এ খবর প্রকাশিত হয় মিয়ানমার থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী দৈনিক ‘মিয়ানমার টাইমস’ ও ‘মিজিমা’তে। শান্তি ও সংঘর্ষ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন প্রস্তাবের ১০ দিনের মাথায় বিতাড়ন শুরু হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত রোহিঙ্গা গণহত্যা-নির্যাতন-অগ্নিসংযোগ-বিতাড়নের নীলনকশা ওই প্রস্তাবের মধ্যেই অন্তর্নিহিত।

রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার সূত্র ধরে মিজিমার প্রধান সংবাদে বলা হয়, দেশটির নিউ ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি উ থেইন নায়ান্ট বলেনÑ “রাখাইনে সব ঘটনায় রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব ঘটনা মোকাবিলার জন্য সরকার ‘কাউন্টার টেররিজম’ আইন প্রয়োগ করতে পারে, যা ২০০৪ সালে পার্লামেন্টে প্রণয়ন করা হয়।” ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স পার্টির মুখপাত্র উ নে মি জ বলেন, ‘মিয়ানমার নিয়ে আমরা কোনো আন্তর্জাতিক মতামত বিশ্বাস করি না।’ দলগুলোর নেতারা বলেন, ‘১১ লাখ বাঙালি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে বসবাস করে। নিরাপত্তা ইস্যুতে বাঙালি সন্ত্রাসীদের বিতাড়ন করতে হবে।’

advertisement