advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতি ও জনগণ সর্দারিটা এখন কার হাতে : মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
২৫ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯ ০৯:১৭
advertisement

‘জনগণ’, ‘রাজনীতি’, ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’- এই তিনের মধ্যে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ই এখন সর্দারের আসনে অধিষ্ঠিত। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। এমনটি হবে, সে জন্য দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধ করেনি। কথা ছিল যে, দেশের ওপর সর্দারি থাকবে ‘জনগণের’।

‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ বিষয়টির দিকে প্রথমে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ স্থায়ী হলেও তার নাট-বল্টুগুলো স্থায়ী নয়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কোনো পদে আজ হয়তো কেউ আছে, কিন্তু কাল সেখানে হয়তো আছে অন্য কোনোজন। ব্যক্তিগুলো ক্রমাগত অদল-বদল হচ্ছে। মেয়াদ শেষে প্রশাসন থেকে বিদায় নিচ্ছে। আসছে নতুন কেউ। প্রশাসনের ব্যক্তিরা বদল হচ্ছে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ বদল হয় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ (বা অকাজ!) যথাবিহিত চলতে থাকে।

কথায় বলে, কুকুরের লেজ বাঁশের চোঙ্গায় যতই ঢুকিয়ে রাখা হোক না কেন, তা কখনই সোজা হয় না। চোঙ্গা থেকে বের করা মাত্র তা আগে যেমন বাঁকানো ছিল, সেটি তেমন আকারই আবারও ধারণ করে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ ব্যাপারটিও অনেকটা তেমন। তার ‘খাইসলত’ সচরাচর (কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সংগঠিত একটি গণবিপ্লবের অভিঘাত ব্যতীত) বদলায় না। অথচ ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ ভূমিকা ও চরিত্রের ওপর সাধারণ মানুষের ও দেশের অবস্থা বহুলাংশে নির্ভর করে।

এদিকে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে চালানোর কথা সরকারের। কিন্তু সরকার সেটিকে চালানোর বদলে, তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে দেশ চালায়। তাই মানুষ এটিই দেখে চলেছে যে, রাজনীতিতে গদির বদল হচ্ছে, সরকার আসছে যাচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের ও দেশের অবস্থার মৌলিক কোনো হেরফের ঘটছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘব হচ্ছে না। সেই যন্ত্রণা বরং নতুন নতুন চেহারা নিয়ে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

সংবিধানে লেখা আছে যে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। কিন্তু দেশ পরিচালনায় জনগণের (ঢ়বড়ঢ়ষব)-এর সে ক্ষমতা লুপ্ত করা হয়েছে। বহুদিন ধরেই প্রকৃত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে লুটেরা বুর্জোয়াদের বড় দুটি রাজনৈতিক দল তথা ‘রাজনীতি’ (ঢ়ড়ষরঃরপং)। ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। বর্তমানে ‘রাজনীতি’র হাত থেকে প্রকৃত ক্ষমতা এখন হস্তান্তরিত হয়েছে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ (ংঃধঃব ধঢ়ঢ়ধৎধঃঁং) ‘রাজনীতি’র কাছে।

সরকার আসে যায়। ক্ষমতাসীনরা ‘জনগণের’ মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে, রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজের দলের পক্ষে ব্যবহার করে ‘ভুয়া নির্বাচনের’ মাধ্যমে নতুন মেয়াদে জোর করে আবার ক্ষমতা ধরে রাখে। কিংবা হয়তো নতুন দল ক্ষমতায় আসে। কিন্তু নতুন সরকার এসে সেই পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সওয়ার হয়ে দেশ পরিচালনা করতে শুরু করে। এ রকমই চলছে বহুদিন ধরে।

তবে আমাদের দেশে বর্তমানে এ ক্ষেত্রে নতুন একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নটি হলোÑ আসলে কে কার ওপর সওয়ার হচ্ছে? সওয়ার হওয়ার মতো ক্ষমতা এখন আসলে কে রাখে? ‘জনগণ’ সরকারকে এবং সরকারের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে? নাকি ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ সরকারকে এবং ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ সরকারকে ব্যবহার করে ‘জনগণ’কে? বর্তমানে দ্বিতীয়টিই বহুলাংশে সত্য হয়ে উঠেছে। এ কারণেই এখন মানুষের মুখে মুখে এ দেশ সম্পর্কে এ কথা চালু হয়েছে যে, ‘মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ’।

আইন-কানুন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আমলা-অফিসার-কেরানিকুল, পুলিশ-মিলিটারি প্রভৃতিকে অবলম্বন করে দেশের ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ গঠিত। এসব উপাদান নিয়ে গঠিত ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’টি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার অঙ্গীভূত। একই মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশরূপে এর উপাদানগুলো কাজ করে। কোনো একটি যন্ত্রাংশ ‘গোলমাল’ দিতে শুরু করলে গোটা ব্যবস্থা তা মেরামত করে নেয়। নতুন সব উপাদানকে নিজের সিস্টেমে অঙ্গীভূত ও সংশ্লেষিত (হজম) করে নিয়ে অটলভাবে সচল থাকতে সক্ষম হয়। ফলে সরকার আসে যায়, কিন্তু ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ তার আপন চরিত্রে নিয়ে বহমান থাকে। কেবল একটি বলপূর্বক সাধিত আমূল বিপ্লবী আঘাতের দ্বারাই এই ‘স্থিতাবস্থা’র অবসান ঘটানো সম্ভব হতে পারে।

একটি দেশের ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ চরিত্র নির্ভর করে সে দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি-দর্শনের ওপর। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষক শ্রেণির হাতে থাকে ক্ষমতার আধিপত্য। আর শোষিত শ্রেণি থাকে পদানত। অর্থনৈতিকভাবে সমাজে যে শ্রেণি নিয়ন্ত্রকের আসনে থাকে, রাষ্ট্রক্ষমতার আধিপত্যও থাকে তার হাতে। এই আধিপত্যকারী শ্রেণির স্বার্থকেই ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ শ্রেণিচরিত্র এভাবেই নির্ধারিত হয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ কখনই ‘শ্রেণি নিরপেক্ষ’ হয় না। তাই সরকার পরিবর্তন ঘটলেও ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের শ্রেণিচরিত্র’ অপরিবর্তিত থাকায় আধিপত্য স্থাপনকারী শ্রেণির শাসন ও শোষণ অব্যাহতই থাকে।

গত চার দশকে এ দেশে ডজনখানেক বারেরও বেশি সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের শ্রেণিচরিত্রের’ বদল কখনই হয়নি। এমনিতে সচরাচর তা বদল হওয়ার কথা না। একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট বিপ্লবী পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ প্রগতিশীল রূপান্তরের একটি বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু শাসক দল আওয়ামী লীগের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন হয়নি। অতঃপর, পঁচাত্তরের পর সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকে উল্টো পথে যাত্রা। ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ আবার তার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাবর্তন করেছিল। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ সেই একই প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও সিস্টেমিক (ব্যবস্থাগত) বৈশিষ্ট্য এখনো অব্যাহত আছে।

২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল ‘দিন বদলের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ ‘সিস্টেমিক’ বদল ঘটানোর পথে সে এগোয়নি। অথচ ‘ব্যবস্থা বদল’ না করে ‘দিন বদল’ ঘটানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। প্রচলিত পুরনো ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ কাঁধে সওয়ার হয়ে দিন বদলের চেষ্টা তাই কথার কথাই থেকে গিয়েছিল। জাতি পেয়েছিল আগে থেকে চলে আসা গণবিরোধী অপশাসনেরই একটি ‘নব সংস্করণ’। খুব বেশি হলে ‘সড়ৎব ড়ভ ঃযব ংধসব’ (আরও বেশি করে একই জিনিস)।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে সে জনসমর্থনহীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার উদ্দেশ্যে সে ২০১৩ সালে ‘একতরফা’ ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী পাঁচ বছর পুরনো ব্যবস্থা-ধারাতেই সে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ পরিচালিত করেছিল। ফলে ক্ষমতাসীনদের জনসমর্থনে আরও ধস নেমেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষমতায় অব্যাহতভাবে অধিষ্ঠিত থাকতে সে ‘নৈশকালীন ভোটে’ ‘ভুয়া বিজয়ের’ তামাশা সংগঠিত করেছিল। এই দুষ্কর্ম সংগঠিত করার কাজে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে সরাসরি ও পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছিল। এভাবে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে ‘নিয়ামক’ শক্তি হয়ে উঠতে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ আজ ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’র বদলে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ হাতে চলে গেছে।

রাষ্ট্রের কাজকর্ম প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের কাজ হলো ‘নিবর্তনমূলক’, আর অন্য ধরনের কাজ হলো ‘জনকল্যাণমূলক’। লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণির সরকারগুলো রাষ্ট্রের নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ ও স্বক্ষমতাকে দক্ষতা ও ক্ষীপ্রতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়েছে। এ জন্য অঢেল টাকা খরচ করে চলেছে। কিন্তু জনকল্যাণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের অনীহা, অনাগ্রহ আলসেমি ও অর্থ বরাদ্দে কার্পণ্যের সীমা নেই।

সারা দুনিয়ায় বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী নয়া উদারনৈতিক দর্শন চিন্তা অবলম্বন করে অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে, তার একটি অন্যতম নীতি হলো ‘রাষ্ট্রকে ছোট করা’। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক কাজকর্মে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থা, স্যানিটেশন ইত্যাদি থেকে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা উঠিয়ে নেওয়া। এসব কাজ বেসরকারি ব্যক্তি খাতের হাতে এবং কতক ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার (নন-গভর্মেন্ট অর্গানাইজেশন-এনজিও) হাতে ছেড়ে দেওয়া। এসবই হলো ‘রাষ্ট্রকে ছোট করা’র তত্ত্বের প্রায়োগিক উপাদানগুলো। চার দশকের বেশি সময় ধরে এই দর্শনের ভিত্তিতে আমাদের দেশ পরিচালিত হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ‘ছোট’ হচ্ছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের মোট অবয়ব কমার বদলে তা ক্রমাগত বাড়ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশের যে প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন, তার পরিমাণ ছিল ৮০০ কোটি টাকার কম। এবারের ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট সেই তুলনায় টাকার অঙ্কে ৬৬০ গুণেরও বেশি। উন্নত দেশ হোক কিংবা প্রান্তস্থিত অনুন্নত কোনো দেশ হোক, পুঁজিবাদী বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রবণতা এ রকমই ঊর্ধ্বমুখী। রাষ্ট্র ‘ছোট’ হওয়ার বদলে বাস্তবে তা আসলে ক্রমাগতভাবে ‘বড়’ হচ্ছে। রাষ্ট্র ‘বড়’ হচ্ছে এ কারণে যে, অর্থনৈতিক কর্মকা- ও সমাজকল্যাণে ব্যয় কমিয়ে তা স্থানান্তর করা হচ্ছে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক কর্মকা-ে। মিলিটারি, পুলিশ, গোয়েন্দা, জেলখানা- এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যয় আনুপাতিকের চেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্রযন্ত্র স্ফীত হচ্ছে। তাই দেখা যাচ্ছে যে, পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী নীতির প্রকৃত স্বরূপ হলো, রাষ্ট্রকে ‘ছোট’ করা নয়। তার প্রকৃত স্বরূপ হলো রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থকে রাষ্ট্রের নিপীড়নযন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার জন্য স্থানান্তর করা।

সরকার সামরিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ, বড় আকারের নতুন অস্ত্রশস্ত্রের মার্কেটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে ক্রমাগত ব্যয় বাড়াচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রগুলোর পেছনেও ব্যয় হু হু করে বাড়ানো হচ্ছে। নিত্যনতুন বাহিনী সেখানে যুক্ত করা হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীকে ‘রোবোকপ’-এর সাজে সজ্জিত করে নতুন ইউনিট যুক্ত করা হয়েছে। শ্রমিকদের ‘ডা-া মেরে ঠা-া’ করে রাখার জন্য মহা ধুমধাম করে ‘শিল্প পুলিশ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পুলিশ-র‌্যাব বাহিনীর জন্য দ্রুতগতির যানবাহন কেনা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও কেনা হয়েছে। রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক সময়ই পুলিশের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু ভিআইপিদের যাতায়াত নির্বিঘœ করার জন্য কিংবা ‘বড় রাস্তা’য় রিকশা চলাচল ঠেকানোর জন্য, ডবল ডবল সংখ্যায় পুলিশকে ডিউটি করতে দেখা যাচ্ছে। ফটকাবাজি, ভেজাল, মজুদদারি দমনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যাস্বল্পতা দেখা দিলেও রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় মোবাইল কোর্টে সামারি ট্রায়াল করার জন্য তাদের সংখ্যায় কমতি হচ্ছে না। এ ধরনের ভূরি ভূরি আরও দৃষ্টান্তের অভাব হবে না।

মানুষের জীবনযন্ত্রণা বাড়ছে। সে কারণে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য। সমাজে বাড়ছে শোষণ-বৈষম্য। রাষ্ট্র বনাম জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনগণের মধ্যে বাড়ছে হতাশা, ক্ষোভ। অন্যদিকে লুটেরা গোষ্ঠীর বিভিন্ন শিবিরের মধ্যে লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে রাজনীতিতে সংঘাত-নৈরাজ্য বাড়ছে। এসব ‘অনাকাক্সিক্ষত’ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে তার নিপীড়নের যন্ত্র আরও শক্তিশালী করতে হচ্ছে। এভাবে রাষ্ট্রকে ক্রমাগত আরও নিবর্তন-নিপীড়নমূলক হয়ে উঠতে হচ্ছে।

এমনই এক পরিস্থিতিতে এবারের জাতীয় নির্বাচনে ‘নৈশকালীন ভুয়া ভোটের’ দুষ্কর্মটি রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ ক্ষমতার পাটিগণিতে ‘জনসমর্থনের’ মাপকাঠিতে যা অসম্ভব ছিল, তা সম্ভব করতে নিজের হাতে কর্তৃত্ব তুলে নিয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার অদম্য লালসায় ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে বহুলাংশে রাষ্ট্রক্ষমতার ফব-ভবপঃড় ‘নিয়ামকের’ আসনে বসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’কে আজ ‘রাজনীতি’র নিয়ন্ত্রক হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ‘জনগণের’ ওপরে আগে থেকে বরাবরই স্থান করে নিয়েছিল লুটেরা বুর্জোয়া দলগুলোর দলবাজির ‘রাজনীতি’। এখন সেই ‘রাজনীতি’র ওপরে স্থান করে নিয়েছে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’। এ অবস্থায় দেশে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্যাসিস্ট শাসনের আশঙ্কা আজ মহাবিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে দেশের সর্দারিটা ‘জনগণের’ হাতে নিয়ে আসতে হবে। ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন’ তথা ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ’ রূপায়ণের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের নব অধ্যায় রচনা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে গণমানুষের নব উত্থান সংগঠিত করা আজ ইতিহাসের দাবি।

য় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

advertisement