advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইতিবাচকতার সন্ধানই নজরুলের ধর্ম

ড. সৌমিত্র শেখর
২৭ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০১৯ ০৯:২৩
advertisement

 

‘ধর্ম’ শব্দটির সঙ্গে জগৎ-স্রষ্টায় বিশ্বাসের ব্যাপারটি আপাতভাবে জড়িত বলে নজরুলের চিন্তায় এর স্বরূপটা কেমন, এ আলোচনা এসে যায়। বলতে হয়, রবীন্দ্রনাথ ও যতীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তী ছিল নজরুল-বিশ্বাস। তিনি যেমন ঘোরতর আস্তিক ছিলেন না, তেমনি ছিলেন না নাস্তিক বা সংশয়বাদী। নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিলেও নজরুল নিজের সৃষ্টিকে সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদ্ধ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি মুসলমানÑ কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের, সকল কালের এবং সকল জাতির। কবিকে হিন্দু-কবি, মুসলমান-কবি ইত্যাদি বলে বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি!’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, ১৯৯৬, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ৩৭১)। এর পরও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের কাছে ‘ঈশ্বর’ বা ‘খোদা’ একই শক্তির প্রতিভূ এবং তিনি এই এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে। কবিতাটি তো নজরুলের আত্মসত্তার জাগরণের জয়গাথা। ফলে এ কবিতায় নজরুল-মানসের অনেক প্রতিচ্ছবিই প্রকাশিতÑ অন্তত প্রথম জীবনের স্রষ্টাভাবনাও। একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেও যখন কোনো মুসলিম লেখক খোদা বা খোদা বিশ্বাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তার যুক্তিপূর্ণ ভাষণ তুলে ধরতে ‘খোদা’ বা ‘আল্লাহ’ শব্দ স্বেচ্ছায় পরিহার করে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ভগবান’ শব্দ ব্যবহার করেন; শওকত ওসমানের মতো নির্ভীক সেক্যুলার লেখকও যখন বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে লেখেন ‘খোদার প্রতিদ্বন্দ্বী’ নয়, ‘ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী’Ñ এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে বলতে হয়, নজরুল ইসলাম অমিত সাহসী এক কবিপ্রাণ, তার সময়ে তো বটেই, এখনো। কারণ তিনি ১৯২২ সালেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘ভগবান’ বা ‘ঈশ্বর’-এর আসন নয়, ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ উঠতে চেয়েছেন। মনে হয়, মুসলিম লেখকদের মধ্যে নজরুল ইসলামের আগে এমন দুঃসাহস আর কেউ দেখাতে পারেননি। একই কবিতায় তিনি ‘ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন’ বলে প্রচলিত ঈশ্বর-বিশ্বাসের বিরুদ্ধাচরণও করেছেন। ঈশ্বর বা খোদাভাবনা তো বটেই। আর এ কারণেই ধর্মীয় শ্রদ্ধেয় পৌরাণিক অনুষঙ্গকে আপাত তুচ্ছভাবে কবি এ কবিতায় ব্যবহার করেছেনÑ যেন নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী। পিনাকপাণির ডমরু বা ইস্রাফিলের শিঙা খুব সাদামাটা বিষয় নয়। কিন্তু নজরুলের হাতে এর ব্যবহার পৌরাণিক শ্রদ্ধার আবহঘন বলে মনে হয় না। ‘বিদ্রোহী’ যখন সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তখন এর অব্যবহিত আগে ও পরে ‘মোস্লেম ভারত’সহ বেশ কয়েকটি সাময়িকীতে কবি যে কবিতাগুলো লিখেছেন, এর মধ্যে ‘সাত-ইল আরব’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘কামাল পাশা’, ‘মোহররম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’ ইত্যাদির পাশাপাশি ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’, ‘আগমনী’Ñ এসব কবিতা রয়েছে। এই কবিতাগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির একটা সম্পর্ক তো রয়েছেই। দেখা যাচ্ছে, এর দু-একটি কবিতায় নজরুল যেন একটু বেশি ইমোশনাল। বিশেষ করে ‘মোহররম’ কবিতায় তিনি তো আহ্বানই জানালেন, ‘দুনিয়াতে দুর্ম্মদ খুনিয়ারা ইসলাম!/লোহু লাও, নাহি চাই নিষ্কাম বিশ্রাম।’ অবশ্য গ্রন্থভুক্তির সময় এ পঙ্ক্তি দুটি পরিত্যাগ করা হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কবিতার বিষয় হলেও কবি প্রচলিত ধর্মীয় মাহাত্ম্যের চেয়ে বরং সমসাময়িক ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবতাবাদকেই উচ্চমূল্য দিয়েছেন। ‘কামাল পাশা’ কবিতায় ইসলামের পুনর্জাগরণ নয়, সেক্যুলার তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্কের জয়গাথা রচিত ‘কোরবানী’তে রয়েছে দেশমাতৃকার জন্য জীবন সমর্পণের আহ্বান। তাই বলে নজরুল সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী ছিলেনÑ এমন বলা যাবে না। তিনি প্রচলিত ধর্মাচারের নামে মনুষ্যত্ব যেখানে ভূলুণ্ঠিত, সেখানে নীরব দর্শকও নন। এ কারণে তিনি ঘোষণা করেন, ‘মিথ্যে শুনিনি ভাই/হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই।’ এ জন্যই মোল্লা ও পুরুতের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে তার লেখনী সোচ্চার। ‘যত্র জীব তত্র শিব’ বলেও দরিদ্র ভিখেরি দেখে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে যে পুরোহিত, অনাহারীকে না খাইয়ে মাংস-রুটি নিয়ে যে মোল্লা মসজিদে তালা লাগায়Ñ তাদের বিরুদ্ধেই নজরুল বরং বেশি উচ্চকণ্ঠ। পুরোহিতকে ব্যঙ্গ করেছেন তাই; মৌলবিকে বলেছেন ‘মৌ-লোভী’।

এ চেতনার নিরিখেই নজরুল-ধর্মের মূল্যায়ন আবশ্যক। নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে সুন্দরভাবে বাঁচার পক্ষপাতী ছিলেন। সাম্প্রদায়িক বিভেদ, শোষণ ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন তিনি। সৎ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকাই তার কাছে প্রধান, তার ধর্ম। ‘আমার ধর্ম’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘কিসের ধর্ম? আমার বাঁচাই আমার ধর্ম। দেবতার জল ঝড়কে আমি বাঁধবো, প্রকৃতিকে আমি প্রতিঘাত দেবো। আচারের বোঝা ঠেলে ঢেলে দেবো, সমাজকে ধ্বংস করবো। সব ছারে-খারে দিয়েও আমি বাঁচাবো’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ৯)। কিন্তু এ কেমন বাঁচা তাঁর, কেমন জীবন তার প্রত্যাশা? নজরুলের অভিভাষণ ও প্রবন্ধগুলোয় তিনি এর উত্তর প্রায় সরাসরি দিয়েছেন। পর পর সংঘটিত দুটি বিশ্বযুদ্ধ, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময় অবিভক্ত ভারতের যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক টানাপড়েনÑ এ সময় কাজী নজরুল লিখছিলেন। তার উপলব্ধি, ‘ভারতের রাষ্ট্রে, সমাজে, ধর্মে প্রায় ষোল আনা ঘুণ ধরে গেছে।’ এর মধ্যে অবস্থান করে নজরুল ঘোষণা করেন, ‘আজ চাই, ভরাট-জমাট জীবনের সহজ, স্বচ্ছন্দ, সতেজ গতি ও অভিব্যক্তি। কোথাও কোন জড়তা, অজ্ঞতা, অক্ষমতা ও আড়ষ্টতা না থাকে। আজ পথের বাধা পাষাণ অটল হিমাচলের মত বজ্রদৃঢ় হলেও সত্য-সাধকের পদাঘাতে চক্ষের নিমিষে চূর্ণিত হইবে’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ৩১)। নজরুলের এই ‘ভরাট-জমাট জীবন’ কীভাবে পূর্ণায়ত হবেÑ যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মে ঘুণ ধরে? ব্রিটিশশাসিত ভারতে রাষ্ট্রীয় পরাধীনতা তো ছিলই। এ ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় পশ্চাৎপদতাও কম ছিল না। ‘ভিক্ষা দাও’ প্রবন্ধে নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘অত্যাচার! অত্যাচার ঐ দেখ অত্যাচার তার ভীষণ মূর্তি ধরে বসেছে। ধনী তার ধন নিয়ে, বলবান তার লাঠি নিয়ে, কাজী আর প-িত তার শাস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করবার কি ভীষণ চেষ্টা করছে’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ১৬)। আসলে বিত্তবৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় বিধি-নিষেধে মানুষ যখন আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা, মুক্তি বা পূর্ণায়ত জীবনধারাÑ তখন বিঘিœত হতে বাধ্য। ‘ধর্ম’ তার কাছে নামাজ, রোজা, পূজা, উপাসনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা নয় অথবা কর্তব্যকর্মকে ভুলে থেকে অন্যভাবে সময় অতিবাহিতও নয় (দ্রষ্টব্য : ‘ধর্ম ও কর্ম’)। যারা আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে মত্ত থাকেন, দেশ-সমাজ ও মানুষের জন্য কিছুই করেন নাÑ সেসব শাস্ত্রজ্ঞের সমালোচনা করা হয়েছে ‘লাঙল’-এর (প্রথম খ-ের বিশেষ সংখ্যা) সম্পাদকীয়তে। তিনি নিজে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি। তার বক্তব্যÑ ‘জাতি-ধর্ম-ভেদ আমার কোনোদিনও ছিল না, আজও নেই’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ৩৩)। হিন্দু-মুসলিম সমস্যায় তিনি পীড়িত হয়েছেন, চেষ্টা করেছেন এ দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ নিরসন করতেÑ ‘আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ৯১)। তিনি মনে করেন, হিন্দু-মুসলিমের ঐক্য যতদিন না হবে, ততদিন ভারতের স্বাধীনতার পথ যেমন প্রশস্ত হবে না, তেমনি সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত হানাহানিও বন্ধ হওয়ার নয়। ‘মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের ঘবীঃ ফড়ড়ৎ হবরমযনড়ঁৎ-এর মন থেকে আমাদের প্রতি এই অশ্রদ্ধা দূর হবে এই এক উপায়ে আর তবেই ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হবে। সমস্ত সাম্প্রদায়িকতার মাতলামিও অবসান হবে সেই দিন, যেদিন হিন্দু মুসলমান পরস্পর পরস্পরকে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা নিয়ে আলিঙ্গন করতে পারবে’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ১০৬)। নজরুলের এই বিশ্বাস ছিল আন্তরিক। নিজে এই ‘মাতলামি’র শিকার যদিও। যদিও তাকেই যবন বা কাফের ফতোয়া শুনতে হয়েছে, তবুও তিনি তার এই আন্তরিক বিশ্বাস বর্জন করেননি। নেতির মধ্যে তিনি অন্বেষণ করেছেন ইতিবাচকতা। যে সম্প্রদায়ের মানুষ তাকে যবন বা কাফের বলেছে, তাদেরই গরিষ্ঠ অংশের প্রীতি ও শ্রদ্ধা পেয়ে নজরুল নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। এর উল্লেখও আছে তার লেখায়। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকে লেখা এক চিঠিতে (সওগাত, পৌষ ১৩৩৪ সংখ্যায় প্রকাশিত) নজরুল উল্লেখ করেছেন, ‘‘হিন্দু-লেখক জনসাধারণ মিলে যে ¯েœহে যে নিবিড় প্রীতি-ভালবাসা দিয়ে আমায় এত বড় করে তুলেছেন, তাদের সে ঋণকে অস্বীকার যদি আজ করি, তাহলে আমার শরীরে মানুষের রক্ত আছে বলে কেউ বিশ্বাস করবে না। অবশ্য কয়েকজন নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমায় কিছুদিন হতে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করছেন এবং কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দু-সভাওয়ালা’ আমার নামে মিথ্যা কুৎসা রটনাও করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু এঁদের আঙুল দিয়ে গোনা যায়। এঁদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এঁদের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দুসমাজকে দোষ দিই নাই এবং দিবও না। তাছাড়া আজকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে আমি যে মুসলমান এইটেই হয়ে পড়েছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধ, আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন। প্রথম গালাগালির ঝড়টা আমার ঘরের দিক অর্থাৎ মুসলমানের দিক থেকেই এসেছিলÑ এটা অস্বীকার করি নে; কিন্তু তাই বলে মুসলমানেরা যে আমায় কদর করেন নি এটাও ঠিক নয়। যাঁরা দেশের সত্যিকারের প্রাণ, সেই তরুণ মুসলিম বন্ধুরা আমায় যে ভালবাসা, যে প্রীতি দিয়ে অভিনন্দিত করেছেন, তাতে নিন্দার কাঁটা বহু নিচে ঢাকা পড়ে গেছে’ (নজরুল রচনাবলি, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ৩৯৪)। বস্তুতপক্ষে নেতির মধ্যে ইতিবাচকতার সন্ধানই নজরুলের ধর্মÑ যেন ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’।

 

য় ড. সৌমিত্র শেখর : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement