advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সরকারি ব্যাংকের ইতিবাচক ইউটার্ন কতদূর, আর কতদূর

মাহফুজুর রহমান
৩০ আগস্ট ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০১৯ ০৮:৪০
advertisement

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ইতিবাচক ইউটার্ন নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো সবার মনে আশার সঞ্চার করেছে। যোগ্যতা অনুসারে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যাংক রদবদল করা হয়েছে। তা ছাড়া বড় ব্যাংকগুলোতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, জ্ঞানী এবং সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যা এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম ব্যাংকগুলোকে অচল করে দিচ্ছিল। এ বিষয়ে সর্বমহলে বারবার হুশিয়ারি উচ্চারণ সত্ত্বেও বারবার হোঁচট খাচ্ছিল ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জড়িত মানুষরা। এ জন্য পরিচালনার দায়িত্বে অযোগ্য ও সততার বিবেচনায় অনুত্তীর্ণ লোক নিয়োগ এবং সরকারের অনেকটাই লাগামছাড়া ভাবই দায়ী। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের আমানত নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে তারা বিভিন্ন বিবেচনায় পার পেয়ে যাওয়ায় কেউই অপরাধটিকে গুরুত্ব দেয়নি।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক প্রতিবছর লোকসানের মুখোমুখি হবে এবং সরকার বাজেটে তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে এটাই ছিল প্রচলিত ধারা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বিগত ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মূলধন, সুদ, ভর্তুকিসহ নানা কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচটি ব্যাংককে মোট ১২ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা প্রদান করতে হয়েছে। এবার অর্থমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকে আর পুনঃঅর্থায়ন করা হবে না। ব্যাংকগুলোকে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েই ব্যবসা করতে হবে। নিজস্ব টাকা খাটিয়ে বা আমানত থেকে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে হবে এবং পাশাপাশি কর প্রদান করতে হবে।

অর্থমন্ত্রীর এই নির্দেশনাটির ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই সরকারের ইচ্ছাটি বুঝতে পেরেছেন; গাছাড়া ভাব নিয়ে লোকসানি ব্যবসা পরিচালনা করা বা হলমার্ক স্টাইলে ঋণ প্রদান করা এখন থেকে আর চলবে না।

এদিকে বিশ্ব অর্থবাজারের মুরব্বি ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডের (আইএমএফ) ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ (এফসিসিআর) মিশন ১২ দিনের সফরে এসে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সভা শুরু করেছে। সফরকালে সব বিষয়াদি পর্যালোচনা শেষে মিশন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে। তবে আলোচনামালা শুরুর প্রাক্কালেই এক গুচ্ছ সুপারিশ প্রদান করেছে মিশন। এই সুপারিশগুলো থেকে অনুমান করা যায় যে, দলের প্রধান আলোচনার বিষয়ই হচ্ছে সরকারি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করা। মিশনের এই সুপারিশ পালন করতে হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৬ ধারা সংশোধন করতে হবে। এই ধারায় ব্যাংক বা আমানতকারীদের ক্ষতিকর কার্যকলাপ রোধকল্পে বা জনস্বার্থে ওই ব্যাংক-কোম্পানির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক-কোম্পানির চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীকে অপসারণ করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত হয়েছে। তবে একই ধারার শেষ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘(৬) সরকার কর্তৃক মনোনীত বা নিযুক্ত কোনো চেয়ারম্যান, পরিচালক, প্রধান নির্বাহী, যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, এর ক্ষেত্রে এই ধারার কোনো কিছুই প্রযোজ্য হইবে না : তবে শর্ত থাকে যে, উক্তরূপ চেয়ারম্যান, পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর আচরণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নিকট কোনো প্রতিবেদন পেশ করিলে সরকার উহা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করিবে।’

প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় যে, এর আগে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর অন্যায় কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠালেও সরকার কর্তৃক যথাযথ গুরুত্ব প্রদানের নজির লক্ষ করা যায়নি। এর প্রধান কারণ, সরকারের বিশেষ আনুকূল্য পাওয়া লোকরাই ব্যাংকের এসব পদ অলঙ্কৃত করে আসছিলেন। অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত হলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীরা আরও সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলেই আশা করা যায়। তা ছাড়া একই অঙ্গনে দুই রীতি থাকা বাঞ্ছনীয় বলে বিবেচিত হতে পারে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান, পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী অপসারণের যে বিধান আইনে প্রদত্ত হয়েছে, একই বিধান রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের বেলাতেও প্রযোজ্য হওয়া দরকার।

আইএমএফের মতে, সরকারি ব্যাংকে পরিচালকের সংখ্যা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংকেই পরিচালকের সংখ্যা ২০ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা ৩ জন। আইএমএফ স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়াতে এবং মোট পরিচালকের সংখ্যা কমাতে পরামর্শ প্রদান করেছে।

পরিচালকের সংখ্যাগত বিষয় এর উত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে বলে মনে হয় না। পক্ষান্তরে ব্যাংক পরিচালনায় অভিজ্ঞ এবং সততার বিচারে উত্তীর্ণ পরিচালকের সংখ্যা যাই হোক না কেন, ব্যাংক পরিচালনার মান উত্তম হতে বাধ্য। কিন্তু ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কহীন পেশায় কর্মরত একজনকে পরিচালক করা হলে তিনি ব্যাংকের কৌশলগত বিষয়গুলো বুঝতে পারেন না এবং সঙ্গত কারণেই মনোযোগী হন না। তারা শুধু বোর্ড সভায় নিজেদের নীরব উপস্থিতি নিশ্চিত করেন, ব্যাংক পরিচালনায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। তাই পরিচালকের সংখ্যা বিবেচনা করার চেয়ে তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

আইএমএফ পরামর্শ দিয়েছে, ব্যাংকের অডিট কমিটি ও ঝুঁকি নিরূপণ কমিটি যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সে বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার। মিশনের এই পরামর্শটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের অডিট কমিটি এবং ঝুঁকি নিরূপণ কমিটি ব্যাংকটির সঠিক সমস্যা নিরূপণ ও তা প্রতিকারের উপায় নিয়ে কাজ করে থাকে। এদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, প্রধান নির্বাহী এবং মালিকপক্ষের জন্য উপকারী। অডিট কমিটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা হলে পূর্বোক্তরা অনেকটাই নিরাপদে থাকতে পারেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরকার সঠিক সময়ে জানতে পারবে ব্যাংকের সমস্যার কথা এবং সেটি সমাধান করা খুব সহজ হবে। কিন্তু অডিট কমিটির কাজে বাধা সৃষ্টি হলে ব্যাংক ভেতরে ভেতরে পচে গেলেও কর্তৃপক্ষ তা জানতে পারবে না।

আইএমএফ মিশন আরও যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলো হলো-ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৫৮ ধারার সংশোধন। এই ধারায় সরকার কর্তৃক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করার ক্ষমতা প্রদত্ত হয়েছে। এ ছাড়া একই আইনের ৫৯ ধারায় সরকারের স্কিম প্রণয়নের ক্ষমতা এবং ৭৭ ধারায় ব্যাংকিং কোম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ ও অবসায়নের লক্ষ্যে সরকারকে প্রদত্ত ক্ষমতার অবসায়ন চেয়েছে আইএমএফ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুশাসনের সুযোগও কমিয়ে আনার পরামর্শ তাদের। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিষয় দেখভাল করার জন্য একটি ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল গঠনের জন্য আইএমএফ পরামর্শ দিয়েছে। এরূপ কাউন্সিল গঠন নিয়ে এর আগে নানা ধরনের বিতর্ক উত্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের কাউন্সিল আদৌ আর্থিক খাতের জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা তা গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। একটি শক্তিশালী ও যোগ্যতর কেন্দ্রীয় ব্যাংক গড়ে তোলা সম্ভব হলে এ ধরনের কাউন্সিলের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে অনেকে মতামত দিয়েছেন।

সবশেষে ব্যাংকের সেই পুরনো ক্ষত নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। সরকারের নানা প্রতিশ্রুতি এবং কৌশল প্রয়োগকে পাশ কাটিয়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যমতে, ১৮ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বেড়ে বিগত জুন সমাপনীতে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অবলোপন করা টাকার অঙ্ক যোগ করা হলে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি বোঝা নিয়ে ব্যাংকগুলো আজ ন্যুব্জপ্রায়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকেই বেশি। জুন শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের নতুন নতুন কৌশল ও উদ্যোগকে ফাঁকি দিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে ৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক পরিবর্তন ব্যাংক পরিচালনায় দক্ষতা সৃষ্টি করবে এবং ব্যাংকগুলোতে ইতিবাচক টার্নওভার হবে এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে সময়ই বলে দেবে হাজারো প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে নতুন কা-ারিরা ব্যাংকগুলোকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেন!

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement