advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পুলিশ কেন ধারাবাহিক জঙ্গি হামলার লক্ষ্যবস্তু

চিররঞ্জন সরকার
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৯:২০
advertisement

পুলিশ কেন বারবার জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? এর কারণটি স্পষ্ট। জঙ্গিরা পুলিশের গাড়ি অথবা পুলিশ বক্সে হামলা করে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি ও পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জঙ্গিগোষ্ঠীর কর্মকা- দমনে বেশ কঠোর অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের বিদ্বেষ রয়েছে জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গটি আমরা যখন প্রায় ভুলতে বসেছি, তখন আবারও কিছু জঙ্গি আক্রমণের ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব হামলায় বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটায় সেগুলো তেমন মনোযোগ পাচ্ছে না।

সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পুলিশ বক্সের সামনে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই হামলায় পুলিশের অন্তত দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের একজন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের প্রটোকলের সদস্য।

এর আগে গত ২৬ মে রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই গাড়িতে থাকা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক রাশেদা আক্তার ও রিকশাচালক লাল মিয়াসহ দুই পথচারী আহত হন। মালিবাগে যে গাড়িতে বিস্ফোরণটি ঘটেছে, সেটি পুলিশের বিশেষ শাখা এসবির একটি পিকআপ ভ্যান। আর এর পাশেই ছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি এবং এসবির প্রধান কার্যালয়। গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে একটি পুলিশ বক্সে একই ধরনের হামলা হয়েছিল। প্রতিটি হামলা ঘটনারই দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠী!

২০১৭ সালেও কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলার লক্ষবস্তু হয়েছে। ওই বছরের মার্চেই দুটি হামলা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে পুলিশের একটি চেকপোস্টের কাছে বোমা বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিল। যে নিহত হয়েছিল, সে নিজেই ওই বোমা বহন করছিল বলে এটিকে ওই সময় আত্মঘাতী হামলাও বলা হয়েছে। একই মাসে র‌্যাবের একটি অস্থায়ী সদর দপ্তরের নির্মাণকাজ চলাকালীন এক যুবক তার সঙ্গে বহন করা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। আইএস পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট ‘আমাক’ থেকে দুটি হামলারই দায় স্বীকার করা হয়েছিল।

এই হামলার ঘটনাগুলো মোটেও উপেক্ষণীয় নয়, বরং এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ ধরনের ছোটখাটো হামলা ঘটনার মানেই হচ্ছে জঙ্গিরা এখনো সক্রিয় আছে। তারা হয়তো হাত পাকানোর চেষ্টা করছে। সুযোগ পেলে তারা ২১ আগস্ট কিংবা হলি আর্টিজান হামলার মতো ঘটনা আবারও ঘটাবে। এ ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই মনোযোগী হতে হবে। গুজব, বালিশ, রোহিঙ্গা, নারী, যৌনতা, শাড়ি ইত্যাদি নিয়ে মগ্ন থাকলে জঙ্গিরা আরও প্রশ্রয় পাবে।

আমাদের স্বভাবই হচ্ছেÑ বড় কোনো রক্তপাত না হলে, অনেক মৃত্যু ও ছিন্নভিন্ন লাশ না দেখলে আমরা তেমন বিচলিত কিংবা চিন্তিত হই না। আমাদের দেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা তেমনভাবে ওই ঘটনার পরিণতি বা ভবিষ্যৎ ফল নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ফলে দেশে জঙ্গি হামলা ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ঘটল, ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করা হলো। তখন আমাদের টনক নড়ল। এর পর চলল জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পুলিশ-র‌্যাবের ডাইরেক্ট অ্যাকশন। বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা ঘেরাও করে গুলি করে তাদের হত্যা করা শুরু হলো। তখন থেকে জঙ্গি হামলার ঘটনা কমতে শুরু করল। গত তিন বছরে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। আর এতেই আমাদের সব শঙ্কা কেটে গেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও যেন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এ সুযোগে জঙ্গিরা ঠিকই পুলিশকে টার্গেট করে হামলা পরিচালনার দুঃসাহস দেখিয়ে যাচ্ছে।

পুলিশ কেন বারবার জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? এর কারণটি স্পষ্ট। জঙ্গিরা পুলিশের গাড়ি অথবা পুলিশ বক্সে হামলা করে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি ও পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জঙ্গিগোষ্ঠীর কর্মকা- দমনে বেশ কঠোর অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের বিদ্বেষ রয়েছে।

পুলিশ খুব সহজ টার্গেট। তারা রাস্তাঘাটে অ্যাক্টিভ থাকেন। তাদের ওপর হামলা করাটা সহজ। এ ছাড়া জঙ্গিরা পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীকে যেভাবে দেখে, তারা তাদের একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখে। তাদের জন্য লোভনীয় টার্গেট পুলিশ। তারা আদর্শিকভাবে এটিকে একটা বড় অর্জন বলে মনে করে।

জঙ্গিবাদ বিকাশ ও জঙ্গি উৎপত্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ অনুকূল। এখানে জঙ্গিবাদের সমর্থক মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়। ভিনদেশের জঙ্গিবাদ থেকেও এই দেশের অনেক মানুষ উৎসাহ পায়। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ ও টাকা-পয়সা আনার ঘটনাও ঘটেছে। এর শুরুটা গত শতকের আশির দশকে। আফগানিস্তানের যুদ্ধে যায় প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি। তারা সেখানে প্রশিক্ষিত হয়। তাদের মধ্য থেকে অন্তত আড়াই হাজার দেশে ফিরে আসে। তাদের মাধ্যমেই শুরু হয় হরকাতুল জিহাদের মতো জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম। এ ছাড়া নানা ব্যানারে নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে গত দশকজুড়ে তারা নাশকতামূলক বিভিন্ন কর্মকা- চালিয়েছে সারাদেশে। তাদের সবাই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে।

গত কয়েক বছরে এই চেহারা পাল্টে গেছে। এর পর জঙ্গিবাদের দীক্ষা নিতে অনেকে সিরিয়া ও তুরস্কে যায়। আইএসের দল ভারী করতে আগ্রহী যেসব বাংলাদেশি বিভিন্ন রুটে সিরিয়া ও তুরস্ক গেছে, তাদের প্রায় সবাই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তাদের কেউ চিকিৎসক, কেউ বা প্রকৌশলী।

এদিকে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশে জঙ্গিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের বিষয়ে পাকিস্তানেরও হাত আছে। আর এই দেশের অনেক জঙ্গি গ্রেপ্তার এড়াতে ভারতে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ অবশ্য ভারতে কারাবন্দি হয়েছে, কেউ বা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।

এটি ঠিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার কারণে বাংলাদেশে জঙ্গিরা কোণঠাসা অবস্থায় আছে। কিন্তু তারা অনেক অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে জঙ্গি উৎপত্তির যে জায়গা ও উপাদান, এগুলো এখনো মজুদ রয়েছে। তাই বাংলাদেশ জঙ্গিমুক্ত হয়ে গেছেÑ এটি ভাবার কারণ নেই।

তৃণমূলের যারা জঙ্গিবাদে জড়িত, তাদের মগজ ধোলাই করে ধর্মের নামে নাশকতামূলক কর্মকা-ে ব্যবহার করা হয়। একটি অংশকে অবশ্য অর্থ বা কর্মসংস্থানের প্রলোভনে ফেলে বিপথগামী করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা পথে এ দেশে জঙ্গিবাদের জন্য অর্থ এসেছে। বিশেষ করে বেসরকারি সাহায্য সংস্থার ব্যানারে বিভিন্ন সময় জঙ্গি অর্থায়ন করা হয়েছে। নব্বইয়ের দশক বা নতুন শতকের শুরুতে একাধিক এনজিও এই অপকর্মে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট এনজিও বেনোভেলেন্স ইন্টারন্যাশনাল, আল হারাইমান, কুয়েতভিত্তিক এনজিও রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি (আরআইএইচএস)। এতে দেখা যাচ্ছে, ধনী আরব দেশগুলোর অর্থায়নেই এ অঞ্চলে জঙ্গিবাদী সংগঠন তৈরি হয়েছিল।

এদিকে বছর কয়েক আগে তুরস্কের উগ্রপন্থিরা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারে টাকা ঢেলেছে। এ ক্ষেত্রেও এনজিওর আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর কৌশল হাতে নেয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে জঙ্গি অর্থায়ন করে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেররা এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করে থাকেন।

আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাওয়া ব্যক্তি কিংবা দেশে থাকা তাদের অনুসারীÑ এমন অনেকেই অভিজাত পরিবারের সন্তান। তাদের পড়াশোনা ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যাপীঠে। অনলাইনভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই তারা জঙ্গিবাদে অনুরক্ত হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর জঙ্গিরা যে ধরনের বোমা ও গ্রেনেড ব্যবহার করে, এর বেশিরভাগই তৈরি হয় জঙ্গিদের স্থানীয় আস্তানাগুলোয়। কোথাও হামলার পরিকল্পনা করার পর খুব কম সময়ের মধ্যে জঙ্গিরা এসব বোমা ও গ্রেনেড তৈরি করে। ২০০৯ সালের পর থেকে জঙ্গিরা এই হ্যান্ডমেড গ্রেনেড তৈরি শুরু করে।

আগে বোমা তৈরির কলাকৌশল ইংরেজিতে লেখা বিভিন্ন ওয়েব বা নিবন্ধ পড়ে জানতে হতো। এখন বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী পরিচালিত ওয়েবসাইটে বাংলা ভাষায় বোমা তৈরির সহজপাঠ পাওয়া যাচ্ছে। কোনো সুস্বাদু খাবার রান্নার মতো এখন ওয়েবসাইট থেকেই দিব্যি শিখে নেওয়া যায় বোমা বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির কলাকৌশল। বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম বা সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বোমা তৈরির ওই সহজপাঠ প্রাঞ্জল ভাষায় ওয়েবসাইটে তুলে দিয়েছে। আসলে এটি একটি ওয়েব বই। ৮৮ পাতার ওই ওয়েব বুকের নাম ‘গোলাবারুদ সম্পর্কিত গবেষণাধর্মী বই’। এখানে প্রতিটি পাতায় রাসায়নিকের বিশ্লেষণ দেখিয়ে রীতিমতো ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে কীভাবে বিস্ফোরক ও তা দিয়ে আইইডি বা বোমা কিংবা দেশি গ্রেনেড তৈরি করতে হবে। তা একবার পড়লেই বোমা তৈরির বিদ্যা পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এ কথা ঠিক, শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিপাত করা যাবে না। এ জন্য পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে প্রতিরোধমূলক শক্ত কর্মসূচি থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা যেভাবে সোচ্চার হন, পরে সেভাবে থাকে না। ফলে মানুষের সচেনতার জায়গায় ঘাটতি তৈরি হয়। ২-৩ বছর আগে যখন ভয়ঙ্কর সব জঙ্গি আক্রমণের ঘটনাগুলো ঘটছিল, তখন সঙ্গত কারণেই সবাই সরব হয়েছিলেন। সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে বহুমুখী কর্মসূচি রাষ্ট্র, সমাজ ও মিডিয়ার পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল। এখন যেহেতু জঙ্গিদের তৎপরতা প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না, সেহেতু হয়তো সচেতনতামূলক কর্মসূচিই কমে গেছে। এটি মোটেও ঠিক নয়।

জঙ্গি থাবা থেকে আমাদের প্রিয় স্বদেশকে মুক্ত রাখতে হলে অবশ্যই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক কঠোর উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হবে।

 

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement