advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আসা-যাওয়ার পথে দিন কেটে যাবে

আহমদ রফিক
৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:৩৮
advertisement

একসময়কার অখ- ভারতবর্ষ-এখন ত্রিধাবিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত। স্বভাতই পরস্পরবিরোধী স্বার্থের টানাপড়েনে ব্যস্ত। কূটনীতি, চতুর রাষ্ট্রনীতি ও স্বার্থনির্ভর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশ প্রতিবেশী বিধায় রাজনীতির নানা টানে মিত্রদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে সেটা বড় করে প্রকাশ বাংলাদেশের পক্ষেই বিশেষভাবে দৃশ্যমান।

স্বভাবতই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে আসা-যাওয়ার রীতিসম্মত পদ্ধতিতে আলোচনা কম হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসব আলোচনা যখন অনুষ্ঠিত হয় তখন বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণির, বিশেষত রাজনীতিমনস্ক মানুষের প্রত্যাশা থাকে, ‘এবার অন্তত তিস্তা নিয়ে কিছু একটা ফয়সালা হবে।’

কিন্তু না, শিকে ছিঁড়ে না। কোনোবারই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তিস্তা ইস্যু আশ্বাসের বেড়া অতিক্রম করে না। এবারও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর করে গেলেন অনেক কূটনৈতিক আলাপচারিতার রীতিসিদ্ধ চাতুর্যে, কিছু ইতিবাচক কথায়, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুরনো আশ্বাসের পুনরুক্তিতে (বিশেষত তিস্তা ও পানিচুক্তি নিয়ে)।

এর মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ, উভয়পক্ষে ‘উষ্ণ আলোচনা’, ‘গভীর আন্তরিকতা’, ‘পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার আশ্বাস’ ইত্যাদি কূটনৈতিক সুবচন শেষে যা বোধগম্য তা হলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কে ভারতের পূর্ব বিপরীত ধারার নীতি থেকে সরে আসা, প্রত্যাবাসনের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাবা প্রকাশ।

এ পরিবর্তনের পেছনে একমাত্র কারণ আর কিছু নয়, চীনের অবস্থান পরিবর্তন। তারা প্রত্যক্ষ ভাষায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজদেশে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। চীনের বর্তমান অবস্থান কতটা কূটনৈতিক কৌশলগত ভূমিকা, কতটা আন্তরিক বাস্তবতার তা ভবিষ্যৎ সময় পরিষ্কার করে দেবে। ভারত একই ধারার তাস খেলেছে। মাঝখানে অসহায় বাংলাদেশ।

কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জটিলতার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নিরাপত্তা সম্পর্কে রোহিঙ্গারা নিশ্চিত হতে পারছে না। এ সমস্যা সম্পর্কে চীন-ভারত কি আগেই অবহিত ছিল? তাই বাংলাদেশের সমর্থনে রঙের তাস দেখাতে দ্বিধাবোধ করেনি।

লক্ষ করার বিষয়, মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ, তার একটি বিশেষ কেন্দ্র রাখাইন রাজ্য। সবার দৃষ্টি ভূমধ্যসাগরসহ একাধিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রাখাইন রাজ্যটির দিকে। যেমন মিয়ানমারের, তেমনি আন্তর্জাতিক বিদেশি শক্তির। চীন তো এ ক্ষেত্রে বিশাল বিনিয়োগে ব্যস্ত। তা হলে চীন কি সত্যই চাইবে রোহিঙ্গারা তাদের স্বদেশ রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাক। নাকি মিয়ানমার শাসকদের মতো তাদেরও লক্ষ্য বিরান রাখাইন ভূমি? আমরা জানি না। জানি না এ ব্যাপারে ভারতের অন্তর্নিহিত গূঢ় বাসনার কথা।

দুই.

ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর একজন ঝানু কূটনীতিক, সেই সঙ্গে দক্ষ আমলা এবং রাজনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত একজন মননশীল বিশ্লেষকও বটে। অনেক অভিজ্ঞতার পথ মাড়িয়ে তিনি এখন বিজেপির বিশেষ দৃষ্টিতে মনোনীত একজন মন্ত্রী।

স্বভাবতই বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের তার সম্বন্ধে প্রত্যাশা কম নয়। যেহেতু এর আগে নানা দায়িত্বে তিনি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন, অর্জন করেছেন পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশি মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান। এই বহুমাত্রিক জ্ঞানঋদ্ধ ব্যক্তিটির কাছ থেকে সহজ প্রাপ্তির প্রত্যাশা কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে?

এ বিষয়ে আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের কূটনীতিক, আমলা, প্রশাসনিক উচ্চবর্গীয়দের অতীত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে আলোচনায় পদক্ষেপ নির্ধারণ করাই বাস্তবোচিত হবে। কারণ এর আগে আমরা ভারতীয় মন্ত্রী, সচিব, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও অনেক আশ্বাস পেয়েছি। আশ্বাসে-আশ্বাসে নিঃশ্বাস ভরে তুলেছি, কিন্তু প্রাপ্তির থলিতে অন্বিষ্ট ধরা দেয়নি।

এবারকার আলোচনায় পুরনো নতুন বহু বিষয় স্থান পেয়েছে। সবই সমস্যাজটিল বিষয়। বিশেষ করে নদীর পানি (বিশেষত তিস্তাকে বাঁচানো) থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিনিয়োগÑ কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। এমনকি বিতর্কিত সীমান্ত সমস্যার সমাধান।

সীমান্ত সমস্যার প্রশ্ন এলেই আমার মনে পড়ে যায় তারকাঁটার বেড়ায় আটকে পড়া গুলিবিদ্ধ কিশোরী ফেলানীর লাশের কথা। যাকে নিয়ে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশি কবির হাতে প্রতিবাদী পঙ্্ক্তিমালা জন্ম নিয়েছে। এত যে খ্যাতি ভারতীয় বিচার বিভাগের সুবিচারেরÑ কিশোরীর লাশের মতোই হাইকোর্টে ঝুলে আছে ফেলানী হত্যার মামলা। সুবিচার পায়নি হতভাগিনী ফেলানী, পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি না।

তেমনি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জলধারার বিচারে তিস্তার গুরুত্ব আমরা জানি। তিস্তা নিয়ে গত কয়েক বছরে টানাপড়েন কম হয়নিÑ আশ্বাস, হতাশ্বাসও কম জোটেনি বাংলাদেশের কপালে। কিন্তু এবারও বহু প্রত্যাশিত তিস্তা প্রসঙ্গে কোনো সুবচন উচ্চারিত হয়নি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কণ্ঠে। অপেক্ষা শুধু অপেক্ষা।

তবে আপাতত আমার বিবেচনায় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আসাম থেকে বাঙালি মুসলমান বিতাড়নের পরিকল্পনা। শুরুটা যদিও ভিন্নভাবে সেই ১৯৪৫-৪৬ থেকে ‘বঙ্গালখেদা’ উচ্চারণে। এখন গেরুয়া ঝড়ের ঝাপটায় তার চরিত্রবদল ঘটে গেছে। তাই আদমশুমারির জরিপের ধারায় আসামে এনআরসির পাখা ঝাপটানো।

আশ্বর্য, এতবড় একটি মানবিক ইস্যুকে ভারতীয় পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এ তো দেখছি হানাদার, বর্বর পাকিস্তানিজান্তার একাত্তরের ঘটনাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে দাবির মতনই শোনা যাচ্ছে। জানি না এ ব্যাপারে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাবনা কোন ধারায় বইছে।

যে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু অভ্যন্তরীণ বলে বিবেচিত হয় যতক্ষণ তা অন্য রাষ্ট্রকে স্পর্শ না করে, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি আলোড়িত না করে, যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যু। জাতিসংঘসহ সব মহলই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, মিয়ানমারজান্তার দাবি মতে, ওটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।

আসামে বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়টি ততক্ষণই তাদের অভ্যন্তীরণ বিষয় থাকবে যতক্ষণ তা বাংলাদেশকে স্পর্শ না করবে, পুশব্যাক বা অনুরূপ ঘটনা না ঘটিয়ে।

তিন.

মিত্রদেশ, প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ততক্ষণ ওই গুণগ্রামে চিহ্নিত হয়ে থাকে যতক্ষণ তা পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর হয় যুক্তিসঙ্গত বিচারে। মিত্রদেশের ওপরও বেহিসাবি, অতিমাত্রিক নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক যুক্তির ধোপে টেকে না। বাংলাদেশি শাসকদের রাষ্ট্রনৈতিক বিবেচনায় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনে থাকলেও তা অধিকতর মাত্রায় বিবেচনার দাবি রাখে।

কমবেশি সব দেশের সঙ্গে নিজ স্বাস্থ্যনির্ভর সম্পর্ক গড়ে তোলাই যথার্থ পররাষ্ট্রনীতি বলে বিবেচ্য এবং উন্নয়নশীল সব দেশের জন্য তা সত্য। এক দেশের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা যুক্তির ধোপে টেকে না, ইতিহাস তা সমর্থন করে না। তাতে দেশের স্বার্থ ব্যাহত হতে বাধ্য।

বাংলাদেশের মতো সমস্যাজড়িত দেশের পক্ষে ভারসাম্য রক্ষাকারী, সুচিন্তিত বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতিই নিজ স্বার্থ রক্ষার পক্ষে দেয়াল তৈরি বলে মনে হয়। মিত্রদেশের চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এটা যে প্রতিষেধক পন্থা, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাতে অসহায়তার দুর্বলতা হ্রাস পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এতে করে আসা-যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে চেয়ে প্রত্যাশা ও অপেক্ষায় দিন কাটাতে হবে না।

আহমদ রফিক : কবি, ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

advertisement
Evall
advertisement