advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জাতীয় পার্টি : ভাঙনের শব্দ শুনি

৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৫৮
advertisement

রাজপথে বা জনমনে জায়গা যাই থাক, খাতা-কলমে এরশাদের জাতীয় পার্টিই আমাদের প্রধান বিরোধী দল। ধান ভানতে শীবের গীত গাইব না। না হলে বলতাম প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে কী জিনিস সেটা জাতি হাড়ে হাড়ে টের পেত। নিজের দলকে নিয়ে এত নাটক, এত অভিনয়, এমন প্রহসন কোনো কৌতুক অভিনেতাও করতে পারবে না। জাতীয় পার্টির মতো পায়া ভাঙা একটি দলকে বিরোধী দলে পরিণত করতে পারার কারণ ছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের স্থবিরতা। মূলত বিএনপিই এর জন্য দায়ী। খালেদাপুত্র তারেক রহমান এই দলের কফিনে পেরেক ঠোকার কী কী কারণ তা বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। কিন্তু সময় তো কোনো বিষয়, কোনো গ্যাপ শূন্য রাখে না। এটা তার অভিধানে নেই। তাই দেশের অচল রাজনৈতিক অঙ্গনে মহাপ্রতাপে বিরাজমান আওয়ামী লীগের সামনে কোনো বিরোধী দল নেই। কিন্তু আমরা তো ডেমোক্রেসির চর্চা করছি তাই নয়? আর গণতন্ত্র মানেই একাধিক রাজনৈতিক দল। সে রাজনৈতিক দল না থাকলে বিদেশি ও দেশি টক শো সমালোচক, লেখক, আমাদের মতো খুঁত ধরা কলাম লেখকরা লিখবেন আর কাহিনি বানাবেন। কাজেই যেনতেন প্রকারে একটি বিরোধী দল থাকা চাই।

সে দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছিল জাতীয় পার্টি। একনায়ক, স্বৈরশাসক, জেনারেল যাই বলি না কেন, এরশাদের ক্যারিশমা ছিল ভিন্ন। আমি তাকে মূল্যায়ন করি এভাবে, তিনি একমাত্র শাসক যাকে এত অনাচারের পরও কেউ কঠিন দ- দিতে পারেনি। তাকে যে কেউ জীবদ্দশায় মারতে পারবে না সেটা তিনিই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এবং তা কেউ পারেওনি। এরশাদ নিজে কখনো ইলেকশনে হারেননি। এমনকি কারাগার থেকেও জেতা বিরল নেতা বৈকি। রংপুরভিত্তিক একটি পার্টি সারাদেশে এতটা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসাও সহজ ব্যাপার নয়। তার পরও একা এরশাদের নেতৃত্ব বা কৌশল-অপকৌশলে তাই করিয়ে দেখিয়েছে জাতীয় পার্টি। এখন তিনি মরহুম। আর মরহুমের শরিকানা নিয়ে যে লড়াই বাধবে সেটা কারও অজানা নয়। কিন্তু কখন কীভাবে তা বাধে সেটাই ছিল দেখার বিষয়। সবাই কমবেশি জানেন, এই দলের মূল দুই নেতা এরশাদের পরিবারের লোক। একজন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ, আরেকজন তার অনুজ জিএম কাদের। তাদের মধ্যে যে ভাবি-দেবরের মজা ও রসময় সম্পর্ক নেই সেটাও সবাই জানেন।

জানা গেছে, রংপুর তিন আসনের উপনির্বাচন নিয়ে দুজনের মধ্যে এই বিরোধের সূত্রপাত। গত ১৪ জুলাই সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর ইতোমধ্যে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৫ অক্টোবর এই আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। রওশন এরশাদ এই নির্বাচনে তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে নিজের প্রার্থী এরশাদের ছেলে শাদ এরশাদকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা চালান। অপরদিকে জিএম কাদের চেয়েছেন স্থানীয় কোনো নেতার মধ্য থেকে কাউকে দলের মনোনয়ন দিতে। এই চেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত রওশনের প্রার্থী শাদ এরশাদকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

উপনির্বাচনে নিজের প্রভাব ক্ষুণœ হওয়ায় জিএম কাদের জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হওয়ার জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন। রওশনপন্থিরা এই চিঠি দেওয়াকে ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। ফলে বিরোধ চরমে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে দলের একাংশ রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। দেবর-ভাবির এই দ্বন্দ্ব এখন দলের ওপর এসে পড়ছে। আগে একাধিকবার জাতীয় পার্টি ভাঙলেও এরশাদের মৃত্যুর পর আবারও বড় ধরনের ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে দলটি।

জাতীয় পার্টি যদি ভাঙে কার লাভ? তার আগে বলি রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরকে নিয়ে বলা যাক। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ আর অতীত বিশ্লেষণ করলে এটা সুস্পষ্ট, রওশনই সঠিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কীভাবে? একমাত্র জামায়াত ও বিএনপি ছাড়া আর কেউ তখন দেশের শাসনভারের পরিবর্তন চায়নি। বিএনপি-জামায়াত যখন জনগণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল তখন তারা যত ধরনের অপকৌশল সব নিয়ে মাঠে নামে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই। যতটা আওয়ামী লীগ তার চেয়ে বেশি টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। আজ একমাত্র অন্ধ আর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছাড়া সবাই মানেন দেশের এই উন্নয়ন অগ্রগতি কোনোটাই শেখ হাসিনা ছাড়া সম্ভব ছিল না। আর যারা তাকে সরানোর জন্য যে কোনো পথে যেতে রাজি ছিল তাদের সামাল দিতে আওয়ামী সরকারের দরকার ছিল একটি বিরোধী দল। মন্দের ভালো হিসেবে জাতীয় পার্টির বিকল্প ছিল না তখন। অথচ চতুর এরশাদ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য কত রকমের যে ফিকির করেছিলেন সেটাও আমাদের অজানা নয়। কখনো বাড়িতে, কখনো গলফ ক্লাবে, কখনো হাসপাতালে শুয়ে তিনি নাটকের পর নাটক করতেন। এমনও আভাস ছিল, কোনো কারণে যদি পরিবেশ বৈরী হয় তো ডিগিবাজি খেতে চোখের পলক ফেলার দেরি। সে সময় রওশন এরশাদ আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার হয়ে শক্ত অবস্থানে থাকেন। অন্যদিকে জিএম কাদের নেতা হিসেবে ভাইয়ের চেয়ে কিছুটা কম হলেও নড়বড়ে। এমনকি মন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি পদ হারানোর পরপর আবোল-তাবোল বকতে কসুর করেননি। তার অনেক কর্মকা-ে এটা প্রকাশ্যÑ তিনি সরকার বিরোধিতার নামে অন্ধ। বিরোধিতা আমরা সবাই চাই এবং তা জরুরি। কিন্তু তার মতো করে ভাবলে তো জাতীয় পার্টির উচিত সবকিছুর জন্য মাফ চেয়ে সংসদ ছেড়ে রাজপথে যাওয়া। সেটা না করলে শুধু কথায় কি কোনো লাভ আছে?

জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ দুজনই কোনো মেধা বা যোগ্যতা যাচাইয়ে নেতা হননি। আমরা আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে পারিবারিক রাজনীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলি কিন্তু ভুলে যাই জাতীয় পার্টিও এ ধারায় চলে। ভাই না পতœী এই দ্বন্দ্বে যে জয়ী হোক না কেন, তাতে বাংলাদেশের রাজনীতির আসলে কোনো লাভ-লোকসান নেই। তবে আপাতত দেশ যেভাবে চলছে বা চলা উচিত অথবা উন্নয়ন বজায় রাখতে রওশন এরশাদের দিকটা সরকারের জন্য স্বস্তিকর। কারণ কাদের সাহেব কথা বদলে ফেলেন। তার ভেতরে কোথাও কঠিন আওয়ামী বিরোধিতা আছে। কিন্তু এসব অনুমান বা মন্তব্যের চেয়ে অনেক বড় তাদের দলের নেতাকর্মীরা কী চান? নিশ্চয়ই টপ ফাইভের আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দীন বাবলু হাওলাদার বা রাঙ্গা এরাই কলকাঠি নাড়বেন। আর তাতেই ঠিক হবে এই দলের ভবিষ্যৎ। তবে এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টি কতদিন জোড়াতালিতে এক থাকবে বলা মুশকিল। কারণ ওই একজনই সত্য-মিথ্যার ককটেল, ব্যক্তিগত ভুল-ঠিক আর নিজের অতীত ভাঙিয়ে দলকে চাঙ্গা রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এই দল না আওয়ামী লীগের মতো ইতিহাস ঐতিহ্য বা জনগণ নিয়ে চলতে পারবে, না বিএনপির মতো অন্যমুখী রাজনীতির ঝা-া নিয়ে এগোতে পারবে।

সময় এসেছে দেখার। যদি ভাঙে সেটা তাদের জন্য, সরকারের জন্য, রাজনীতির জন্য সুখকর হবে না। আর যদি এখন তা না হয় তা হলে সবুর করতে হবে কখন ভাঙছে। ভাঙন রোধ করা যে কঠিন সেটা বোঝার জন্য খুব বেশি মাথা ঘামানো বা মেধার দরকার পড়ে বলে মনে হয় না।

য় অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক

advertisement