advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সবাই বলছে অনিয়ম বিপরীত অবস্থানে প্রশাসন-ছাত্রলীগ

মেহেদী হাসান
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:৩৭
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে চিরকুটের মাধ্যমে ৩৪ শিক্ষার্থীকে ভর্তি এবং তারমধ্যে আট জনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত হওয়ায় বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই এভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর বিষয়টিকে অবৈধ বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম এতে কোন অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন। যাদের এভাবে চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তি করা হয়েছে তারা সবাই ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা। ছাত্রলীগও এতে কোনো অন্যায় দেখছে না।
ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। ভিসি ও ডিনের পদত্যাগ দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল, বাম ছাত্রসংগঠনগুলো ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। জালিয়াতি করে ভর্তি হয়ে যারা ডাকসুর নেতা নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরসহ সবাইকে পদ থেকে অব্যাহতি ও বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
চিরকুট কা-ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর ডাকসু নির্বাচনের কিছুদিন আগে ওই ৩৪ জন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একটি সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ওই কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায় অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, যথাযথ নিয়ম মেনেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইভিনিং প্রোগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটা অনুষদের নিজস্ব প্রোগ্রাম। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সার্কুলারের বাইরেও ভর্তি করানোর সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। ¯œাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে তারা ভর্তি হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা একবার লিখিত পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়েছে, দ্বিতীয়বার দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
গতকাল দুপুরে ছাত্রদল টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শেখ রাসেল টাওয়ারের সামনে গিয়ে শেষ করে। বিক্ষোভ মিছিল থেকে ওই ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ভিসি ও ডিনের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এছাড়া অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি হওয়াদের ডাকসুর সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি এবং বহিষ্কারেরও দাবি জানানো হয়।
ছাত্রদলের ঢাবি শাখা সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলে এসেছি ডাকসুর নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এ খবরের মাধ্যমে সেটাই প্রমাণিত হলো। এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করব।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদও গতকাল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। এসময় সংগঠনটির আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ ছাত্রদের দিকে নজর না দিয়ে ছাত্রলীগের প্রতিনিধিত্ব করছে। ছাত্রলীগ কোনো অপকর্ম করলে প্রশাসন তার বিচার করে না। ভিসি ছাত্রলীগের অন্যায়ের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।
সান্ধ্য কোর্সটিকে অবৈধ দাবি করে ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, এ ধরনের সান্ধ্য কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে যায় না। এখন এই অবৈধ কোর্স ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা ধরনের অবৈধ কর্মকা- করে যাচ্ছে। আমরা আশা করব সিন্ডিকেট এবং সিনেট এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
এই ঘটনা এবং সম্প্রতি রোকেয়া হলে ঘটা নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। গতকাল দুপুরে টিএসসিতে সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি জানান বামজোটের নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য ও ডিন এবং রোকেয়া হলের প্রাধাক্ষ্য জিনাত হুদার পদত্যাগ দাবি করা হয়। সংগঠনটি আজ দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘গানের মিছিল’ এবং আগামী রবিবার ‘দুর্নীতির ভূত তাড়ানো’ শীর্ষক অনুষ্ঠান পালনের ঘোষণা দেয়।
তবে ঠিক উল্টো অবস্থানে ছাত্রলীগ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সাদ্দাম হোসেন বলেন, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের নিয়মিত শিক্ষার্থীর নিয়ম এবং ইভিনিং এমবিএতে যারা ভর্তি হয় তাদের শিক্ষা পদ্ধতির নিয়ম এক হওয়ার কথা নয়। তিনি আরও বলেন, এই সুযোগ নিয়ে শুধু ছাত্রলীগ ভর্তি হয়নি। ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরাও ভর্তি হয়েছেন। কেউ ছাত্রলীগের পরিচয়ে ভর্তি হয়নি। তারা ছাত্র পরিচয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা বিশ^বিদ্যালয়ের নিয়মের মধ্যে থেকেই ভর্তি হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাবি প্রশাসন একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের সময় উপাচার্যের চিরকুটে ছাত্রলীগের ৩৪ নেতার ভর্তি হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
তদন্তের দাবি টিআইবির
চিরকুট কা-ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, উত্থাপিত অভিযোগের ফলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থার সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। এটি মোকাবিলার জন্য সৎসাহসের সাথে অভিযোগ আমলে নিয়ে সুষ্ঠুু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল বুধবার বিকেলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকে ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযোগ সঠিক হলে তা হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি বলেন, উত্থাপিত অভিযোগ বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎ তথা মেধাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সকল প্রত্যাশার জন্য অশনি সংকেত। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও সুনাম অক্ষুন্ন রাখার জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে নিয়মনীতি অনুসরণ করে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করে স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার চর্চার মাধ্যমে ভর্তি প্রত্যাশী সকল শিক্ষার্থীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করাও তেমন কর্তৃপক্ষের গুরু দায়িত্ব। এক্ষেত্রে কোন প্রকার ব্যত্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য হবেনা বলেও প্রত্যাশা করেন সংস্থাটির এ নির্বাহী।
সংস্থাটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্বের অবস্থাকে রাজনৈতিক বা অন্যকোন সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে পরিণত করার যে কোন প্রয়াসকে কর্তৃপক্ষ প্রতিহত করবেন। অন্যথায় গুণগত শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে যুগোপযোগী বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যুব সমাজের যে স্বপ্ন তা ধূলিসাৎ হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা অন্যকোন সাময়িক সুবিধা অন্বেষী স্বার্থান্বেষী চক্রান্তের কাছে জিম্মি হয়ে ঢাবি কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের আত্মঘাতী অবস্থান প্রতিরোধের আহ্বান জানায় সংস্থাটি।
উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে একদিকে যেমন এই অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে গভীরতর আস্থাহীনতার শিকার হবে’ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

advertisement