advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

একটি চিরতরুণ প্রতিভা

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০৪
advertisement

আহমদ রফিক ৯১ বছরে পা দিতে যাচ্ছেন, আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন, এটা আমাদের পরম পাওয়া। কেউ ৯১ বছরের ওপর আরও ৯১ বছর বাঁচে তার সম্ভাবনা নেই। তবু প্রার্থনা করি, তিনি তার চিন্তা ও কর্মের তারুণ্য নিয়ে আরও ৯১ বছর আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকুন

আহমদ রফিকের সঙ্গে আমার পরিচয় কবে, তা আর এখন মনে পড়ে না। স্মৃতির বালুকাবেলায় তা মুছে গেছে। শুধু এটুকু মনে আছে, বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে তাকে আমি চিনি। বয়সের ব্যবধানে তখনই আমি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। তার জন্ম ১৯২৯ সালে। আমার জন্ম ১৯৩৪ সালে। পাঁচ বছরের ব্যবধান। আমি ছিলাম ঢাকা কলেজের আর্টসের ছাত্র। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। পরে ধীরে ধীরে আমি তার লেখার অনুরাগীতে পরিণত হয়েছি। ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়ে উঠেছে।

তার স্ত্রী রুহুল হাসিনও ছিলেন ডাক্তার। দু’জনেই চিকিৎসাশাস্ত্রের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ছিলেন প্রবলভাবে সাহিত্যানুরাগী। পুরোপুরি চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হওয়া এবং বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তিনি মেডিক্যাল শিক্ষার শেষ পর্যায় ইন্টার্নশিপ সমাপ্ত করার অনুমতি পাননি, কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার জন্য। হয়েছেন ফুলটাইম লেখক।

আমরা দুজনেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। তিনি ৯১ ছুঁতে যাচ্ছেন। আমিও আশির দরজা পেরিয়েছি বহু বছর হয়। বহুকাল ধরে আমি তার লেখার অনুরাগী এবং শেষ বয়সে এসে অন্তরঙ্গ হয়েছি। আমাদের বয়সের ব্যবধান ঘুচে গেছে কবে। এখন লন্ডন থেকে ঢাকায় গেলে তার সঙ্গে প্রায়ই আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। আমরা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দেশের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করি।

বিস্মিত হয়ে দেখেছি, তার মননে-মানসে বার্ধক্যের রক্ষণশীলতা এখনো স্পর্শ করেনি। তিনি দেহমনে এখনো তরুণ। আমার পরিচিত অনেক প্রগতিশীলের চেয়েও অগ্রসরমনা এবং মুক্তমনা। তার পা-িত্যের সঙ্গে অহঙ্কার যুক্ত হয়নি। তিনি ‘মৌলবাদী বামপন্থি’ নন। অগ্রসরমনা বামপন্থি, মার্কসবাদকে তিনি সামাজিক বিজ্ঞান মনে করেন। ধর্মের মতো ক্রীড়াসর্বস্ব তত্ত্ব মনে করেন না। এটা তার সঙ্গে একাধিকবার দেখা হলে আলোচনার সময় লক্ষ করেছি। ভারতের বিখ্যাত প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও লেখক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে এক সময় বলা হতো ধ সধৎীরংঃ রিঃযড়ঁঃ ধ চধৎঃু নধফমব পার্টিব্যাজ ছাড়া একজন মার্কসবাদী। বাংলাদেশের আহমদ রফিক সম্পর্কে আমারও তাই ধারণা। আগেই বলেছি, তিনি মার্কসবাদকে গতিশীল, পরিবর্তনশীল সমাজ দর্শন মনে করেন। স্থবির কোনো তত্ত্ব মনে করেন না। তাই দেশের কমিউনিস্টদের অনেকের মধ্যেও যে মৌলবাদ গড়ে উঠেছে, তার সঙ্গে তিনি সব সময় সহমত পোষণ করতে পারেননি। এটা আমার ধারণা। তার বিভিন্ন লেখা পড়ে এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় আমার মনে হয়েছে এটা।

এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার মানসিক গড়ন অভিন্ন। শুধু পার্থক্য এই যে, তিনি প-িত। আমি প-িত নই। তিনি তার পা-িত্য দিয়ে যা উপলব্ধি করেছেন, আমি তা সহজ মনে ধারণ করেছি। পঞ্চাশের দশকে যখন ভারতে ও বাংলাদেশে বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ হঠাৎ আবিষ্কার করেন, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি। তাকে এবং তার সাহিত্যকে বর্জন করাই হচ্ছে প্রগতিশীল মানুষের দায়িত্ব, তখনো আহমদ রফিক নিবিষ্ট মনে রবীন্দ্রচর্চা করেছেন। রবীন্দ্রনাথে নিবেদিত রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে এত বই দুই বাংলাতেও কেউ লেখেননি। খ-িত রবীন্দ্রনাথ নয়, রবীন্দ্রনাথ ও তার কাব্যদর্শনের সামগ্রিক রূপ এমনভাবে কেউ তুলে ধরেছেন বলে আমার জানা নেই।

রবীন্দ্রবিষয়ক তার গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা সম্ভবত দুই ডজনের বেশি। ২০১২ সালেও রবীন্দ্রনাথ, দেশপ্রেম নামে বই লিখেছেন, ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছে প্রসঙ্গ বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ। ২০১১ সালে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ এই বাংলায়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ। এই বইগুলোতে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ মোটেও গণবিচ্ছিন্ন বুর্জোয়া কবি ছিলেন না। তার দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয় এবং বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র-ভাবনার পেছনেও তার অবদান ছিল। নইলে ‘সোনার বাংলার’ মতো গান তার হাত থেকে বেরোতো না। রবীন্দ্র গবেষণায় তার অতুলনীয় অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে দিয়েছে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি।

আহমদ রফিককে নিজের বন্ধু ভাবতে এজন্যই গর্ববোধ করি যে, তিনি একজন

আত্মপ্রচারবিমুখ নীরব মানুষ; কিন্তু তার প্রজ্ঞা ও পা-িত্যের কোনো সীমা নেই। যিনি রবীন্দ্রচর্চায় আত্মনিবেদিত ছিলেন, তিনি নজরুল ও জীবনানন্দ দাশকে নিয়েও গবেষণামূলক বই লিখেছেন। তার লেখার বিষয়বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। আশির বেশি গ্রন্থ সংখ্যা। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। তিনি কবি, গবেষক, ছোটগল্প লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, জীবনীকার এবং অনুবাদকও। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যাই তেরোটির মতো। তিনি দেশের জন্য, মানুষের জন্য ঘরে বসে কলম চালনা করেছেন, আবার রাজপথে নেমে এসে ভাষা-সংগ্রামের সংগঠকের ভূমিকা নিয়েছেন। নারী জাগরণেরও তিনি একজন সরব সমর্থক।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত রক্তের নিসর্গে স্বদেশ, সুজনেষু, ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত বিপ্লব ফেরারী, তবু, রূপম, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ভালোবাসা ভালো নেই এবং ২০১২ সালে প্রকাশিত বাউল মাটিতে মন, গোমতী কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি যদি গবেষক ও প্রাবন্ধিক না হয়ে শুধু কবিতা লিখতেন, তা হলেও বাংলাদেশের সেরা কবিদের একজন বলে বিবেচিত হতেন। তবে গল্পের বই অনেক রঙের আকাশ এবং সব পাখি ঘরে ফেরেতে রয়েছে মানুষ ও তার চরিত্রের নিপুণ চিত্রাঙ্কন। ভাষার ক্ষেত্রেও তিনি মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন।

তার সবচেয়ে বড় অবদান ভাষা সংগ্রাম সংগঠনে এবং তার সঠিক ইতিহাস প্রণয়নে। একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসও তিনি অপক্ষপাতভাবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষা-আন্দোলনবিষয়ক বইয়ের সংখ্যা এক ডজন। এসব বইয়ের মধ্যে ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার একুশ থেকে একাত্তর বইটির মধ্যে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে বস্তুনিষ্ঠ, সঠিক পটভূমি ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন, তা আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেক পাঠককে ইতিহাস-বিকৃতির বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করবে।

ভাষা-সংগ্রামের অনেক ইতিহাস লেখা হয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রথম বদরুদ্দীন উমর সর্বপ্রধান গ্রন্থটি লিখেছেন। আমার ধারণা, তাতে সমদর্শিতার কিছু অভাব আছে। আহমদ রফিকের বইগুলোতে এই অভাব নেই। তিনি এই ভাষা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তার বইগুলোতে একজন নিরাসক্ত, নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে ঘটনাগুলোর শুধু বিবরণ নয়, বিশ্লেষণও দিয়েছেন। বাংলাদেশে এই ইতিহাস-বিকৃতির যুগে তিনি তরুণ প্রজন্মের সামনে জাতির ভাগ্য গড়ার সংগ্রামের সঠিক ইতিকথা তুলে ধরেছেন এবং তাদের বিভ্রান্তি দূর করার জন্যও অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের তিনি কতটা বিরোধী, তার সাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতি ভাবনা বইটিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সাহিত্য পত্র থেকে মেডিক্যাল জার্নাল পর্যন্ত বহু রকমের সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন।

আহমদ রফিক দেশ-বিদেশের নানারকম সম্মাননা ও পুরস্কারও পেয়েছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং কলকাতা থেকে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি। এমন একজন বিরল প্রতিভার মানুষের সঙ্গে আমি পরিচিত এবং তার সান্নিধ্য পেয়েছি এটা ভেবে আমি গর্ববোধ করি। দিন যায় কথা থাকে। মানুষ চলে যায় স্মৃতি থাকে। আহমদ রফিকও বেঁচে থাকবেন তার সৃজনশীল কর্মের মধ্যে। সেই সৃষ্টির পরিধি তো বিশাল।

আহমদ রফিক ৯১ বছরে পা দিতে যাচ্ছেন, আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন, এটা আমাদের পরম পাওয়া। কেউ ৯১ বছরের ওপর আরও ৯১ বছর বাঁচে তার সম্ভাবনা নেই। তবু প্রার্থনা করি, তিনি তার চিন্তা ও কর্মের তারুণ্য নিয়ে আরও ৯১ বছর আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকুন।

য় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

advertisement