advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঘুষ চলছে, চলবে

চিররঞ্জন সরকার
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০৪
advertisement

নগদপ্রাপ্তিতে সবাই খুশি। পিয়ন থেকে শুরু করে অফিসের বড়কর্তাÑ সবাই তৎপর এই ঘুষের কারণে। তুমি আমাকে ঘুষ দাও, আমি তোমাকে ফাইল দেব। সহজ গাণিতিক সমাধান। ঘুষ না খেলে শুনেছি অনেক কর্মকর্তার হুঁশ থাকে না। ঘুষ পেলে তারা খুশ থাকেন

যত কথাই বলি না কেন, ঘুষ-দুর্নীতি আসলে খুবই ভালো জিনিস। এর অনেক উপকারিতা আছে। উপকারিতা আছে বলেই আমাদের সমাজে ওই জিনিস বীরবিক্রমে টিকে আছে। আইন করে, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে, বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেও ঘুষ-দুর্নীতি কমানো যাচ্ছে না। এর সামাজিক উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দুর্নীতি নিয়ে মানুষের অসীম উৎসাহ। কে খেলো, কত খেলো, কীভাবে খেলোÑ এসব জানতে মানুষের মন আকুপাকু করে। ঘুষ-দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে মানুষ রসিয়ে রসিয়ে পড়ে। অনেকে গোপনে দীর্ঘশ্বাসও ফেলে। ইস, এমন একটা সুযোগ আমি কেন পেলাম না! সরকারি কোনো প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতির খবর যখন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, মানুষের মধ্যে তখন বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এই যেমনÑ বালিশ কেনা, বই কেনা, পর্দা কেনা, মেডিক্যাল সরঞ্জাম কেনা। এসব নিয়ে লোকজন ক্ষোভও প্রকাশ করে। কারণ যে পেরেছে আর যে পারেনিÑ দুইয়ের একটা দ্বন্দ্ব-ক্ষোভ থাকবেই!

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আপনারা ঘুষ খান। কিন্তু সহনীয় হয়ে খান। কেননা আমার এটা বলার সাহসই নেই যে, ঘুষ খাবেন না। তা অর্থহীন হবে।’ মন্ত্রীর ওই বক্তব্য তখন অনেক আলোড়ন তুলেছিল। নাহিদ সাহেব মন্দ বলেননি। আসলে এ জগতে কমবেশি সবাই চোর, সবাই ঘুষখোর। কেউ ধরা খায়, কেউ খায় না। ঘুষ বন্ধ করা স্বাভাবিক কম্ম নয়, বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের পরিম-লে। কিন্তু সমস্যা হলো, সরকারের আকৃতি এত বড় যে, পুরোটার কাজকর্ম দেখা সহজ কাজ নয়। আমরা একটা-দুটো প্রকল্পের দুর্নীতির খবর মাঝে মধ্যে পাই।

মনে রাখতে হবে, প্রকল্প বানানো ও বাস্তবায়ন করা সরকারের একটা ধারাবাহিক কাজ। সারাবছর ধরে এই কাজ চলে, নতুন প্রকল্প যুক্ত হয় আর পুরনো প্রকল্প শেষ হয়। জুলাইয়ের শুরুতে (বাজেট পাস হওয়ার পর) এসব প্রকল্পের একটা প্রাথমিক তালিকা পাওয়া যায়। আর অর্থবছর শেষে জুনে চূড়ান্ত আরেকটা তালিকা পাওয়া যায়। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকার বলেছে, সে এবার মোট ১ হাজার ৫৬৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প মাত্র ৪১টি। বছর শেষে হয়তো এই নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে যাবে ও পুরনো অনেক প্রকল্প শেষ হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এই ১ হাজার ৫৬৪ প্রকল্পের মধ্যে কয়টির খবর রাখি? ‘পারমাণবিক বালিশ’ কিংবা মেডিক্যাল কলেজের বই-পর্দা কেনার কাহিনি তো মাত্র একটি-দুটি প্রকল্পের ভেতরের খবর। বাকি ১ হাজার ৫৬৩টি প্রকল্পের খবর কি জানি আমরা? জানি না। তা ছাড়া কেনাকাটা যে শুধু প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা নয়। প্রকল্পের বাইরেও সরকারকে প্রচুর কেনাকাটা করতে হয়। সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকাই নানা ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় করতে হয়। এই বিপুল টাকার কেনাকাটার দুর্নীতি আমরা কেমনে ঠেকাব?

যাহোক, ঘুষকে আমরা ‘খাদ্য’ বানিয়ে ফেলেছি। এ দেশে এখন মানুষ ঘুষ ‘খায়’। কেউ আমিষ কেউ খায়, কেউ খায় নিরামিষ। কারও মাছ, ডিম না হলে গলা দিয়ে ভাত ঢোকে না। কেউ শাকপাতা, কচু-ঘেঁচুতে আনন্দ পায়। কেউ মদ, গাঁজা, ভাং, চরস খেয়ে সেলিব্রেট করে। কারও আবার পছন্দ পান-দোক্তা, গুড়াকু, খইনি। কেউ রসগোল্লা-সন্দেশ পেলে দিগি¦দিক ভুলে যায়। কেউ মিষ্টির নাম শুনলে সাড়ে ছয় হাত ব্যাকফুটে চলে যায়। কেউ চকোলেট, আইসক্রিম, পেস্ট্রি খেয়ে চর্বির ফিক্সড ডিপোজিট ঘ্যাতায়। ফিক্সড নিয়ম কোত্থাও নেই। তোমার যাতে খুব খুব ফ্যাসিনেশন আমার, তাতে চূড়ান্ত অ্যালার্জি থাকতেই পারে। তুমি গদগদে টিভি সিরিয়াল গেলো তো আমার পছন্দ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি। তুমি খবরের কাগজ খুলেই ধর্ষণের খবর খোঁজা তো, আমি চোখ রাখি বাইশ গজে। আবার কেউ সাদা ধবধবেতে সাবলীল তো আরেকজন ক্যাটকেটে সবুজ রঙের শার্ট ছাড়া পরতেই পারে না। বলতে গেলে এ লিস্ট জন্মেও ফোরাবে না। কারণ পছন্দ-অপছন্দের উপপাদ্যটাই সেরিব্রাল লটঘটের ওপর ঠ্যাকনা মেরে আছে। যত মানুষ, তত তার খাওয়ার ভ্যারাইটি। কিন্তু বিবিধের মধ্যে আমি একখানা মহান মিলন আবিষ্কার করেছি একলা দুপুরে খাটে শুয়ে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে। ভিড় বাসে গাদাগাদি করে দেড় পায়ে দাঁড়িয়ে বা নিশ্চিন্ত কমোডে রিলিজিং মুডে বসে সব জায়গাতেই আমি সলিড সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, সব ব্যাটাই ঘুষ খায় এবং গ্যাস খায়। নেতা টু অভিনেতা, সাদা টু কালো, লম্বু টু বাটলু, দারোয়ান টু ম্যাডাম। এমনকি মাইরি, যাদের আমরা কেউ কেউ ফুল, বেলপাতা দিয়ে পূজা করি, সেই দেবদেবীরাও অকেশনালি ও রেগুলারলি ঘুষ খায়।

আমাদের মতো অতি ও তস্য অতিসাধারণ মানুষের একটা ধারণা ভয়ঙ্করভাবে প্রবল। সেটি হলো ঘুষখোর মানেই পুলিশ। শুধু যারা চোখে দেখে নাÑ এমন মানুষ ছাড়া এ বিশ্বসংসারের কোন পথচলতি মানুষটা দেখেনি বলুন তো। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশ ট্রাক, বাস, প্রাইভেট, সিএনজিচালকের হাত থেকে পয়সা নিচ্ছে না? আমার অবশ্য এই লেনদেনকে ভিক্ষা ছাড়া আর কিছুই কস্মিনকালে মনে হয়নি। আসল ঘুষ তো পুলিশ নেয় শুনেছি অন্য জায়গায়। কেস, বিশেষ করে মার্ডার কেসটেস হলে পুলিশ নাকি জব্বর ঘুষ নেয়। ইদানীং ফিফটি ফোর হলেও পুলিশ খুশি হয়। যে বাড়ির বউ মরল বা তাকে পিটিয়ে যে শ্বশুরবাড়ি কেস খেলো, তাদের পেলে পুলিশ নাকি কষে বগল বাজায়। বরের বাড়ি এবার যত শাঁসালো হবে, পুলিশ নাকি তত বেশি বগল বাজাবে। তাতে বগল কেটে রক্ত বেরিয়ে উর্দি ভিজে গেলেও পুলিশের নাকি অসুবিধা নেই। এর পর শুনেছি পোস্টিং নিয়েও দরকষাকষি চলে পুলিশের অফিসের মধ্যেই। ব্যবসায়ী এলাকা বা শিল্প এলাকায় পোস্টিং পেতে তারা নাকি তস্য বড়কর্তাদের কাছে ইজ্জত পর্যন্ত বন্ধক রাখে। এত কিছু শুনেটুনে অনেকের মতো আমারও মনে হয়েছিল, পুলিশের মতো ঘুষখোর এ দুনিয়ার আর দুটো নেই। কিন্তু কোনও এক কাগজে পড়েছিলাম, ঘুষখোরদের তালিকায় এই দেশে পুলিশের স্থান নাকি এখন দশের পরে! বাপরে বাপ! তা হলে ওপরে দশ নম্বর পর্যন্তও আছে!

নেতানেত্রীরা নির্ঘাত আছেন ও থাকবেন। তবে তা প্রমাণ করা যাবে না। তাদের দেশে-বিদেশে আয়-ব্যবসা বাড়বে। বাড়ি-গাড়ি-ব্যাংক ব্যালান্স বাড়বে। কিন্তু তারা জনদরদি হিসেবেই সমাজে আছেন এবং থাকবেন। আমাদের পরিচিত পরিম-লেই তো দেখি, আগে যে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাকিতে চা খেত, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-মশকারা করতÑ রাজনীতির ছোঁয়ায় রাতারাতি সে বদলে গেছে। সম্প্রতি সে নেতা হয়েছে এবং একটা পদও পেয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে সাপের পাঁচখানা পা দেখেছে এবং দিনের বেলাতেও আকাশে দিব্যি তারা দেখতে পাচ্ছে। তার বউয়ের হাত-গলায় সোনার চকমকি বেড়েছে, বাড়িতে জিনিসপত্রের ঝকমকি বেড়েছে। এ বিষয়ে বেশি বলা নিষ্প্রয়োজন। কারণ কলম ফসকে কোন কাঠি শেষে বাম্বু হয়ে আমার পেছনেই তাক করবে কে জানে?

এ যুগে ঘুষ নিয়ে ঘুষাঘুষি করে কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। কান পাতলে এখন বরং এমন কথা শোনা যায়Ñ

পাত্র কী করে?

: সরকারি চাকুরে।

: তা ওপরি কত?

: এ আবার কেমন কথা! সবাই কি ঘুষ খায়?

: কেন খাবে না? আরে ভাই, যা দিনকাল পড়ছে। সংসারটা তো চালাতে হবে। মাসের বেতনের টাকা তো মোবাইল বিল দিতেই চলে যায়। তার পর বাসা ভাড়া, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, বউয়ের বায়নাÑ এসবও তো মেটাতে হবে, নাকি?

এবার পাত্রপক্ষ ভাবতে বসে। কিন্তু মুখ খোলে না। কারণ ঘুষই একমাত্র খাদ্যÑ যা মুখ না খুলেই খাওয়া যায়। আসল কথা হলো, নগদপ্রাপ্তিতে সবাই খুশি। পিয়ন থেকে শুরু করে অফিসের বড়কর্তাÑ সবাই তৎপর এই ঘুষের কারণে। তুমি আমাকে ঘুষ দাও, আমি তোমাকে ফাইল দেব। সহজ গাণিতিক সমাধান। ঘুষ না খেলে শুনেছি অনেক কর্মকর্তার হুঁশ থাকে না। ঘুষ পেলে তারা খুশ থাকেন। মানুষের দেখাদেখি না মানুষজনও এখন ঘুষ খেতে শিখেছে। চিড়িয়াখানায় বানরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে যতই ভেংচি কাটেন, বানর কিছুতেই সাড়া দেবে না। ও ব্যাটা ঠিক ‘লিভ মি এলোন’ ভাব নিয়ে বসে থাকবে। একটা কলা ছুড়ে দিন। এবার দেখুন বানরের বাদরামো। আবার টিউবওয়েলের কথাই ধরুন। সকাল থেকে চাপাচাপি করছেন, পানি বের হচ্ছে না। অথচ যন্ত্রপাতি সব ঠিক আছে। টিউবওয়েলের মধ্যে একটু পানি ঢালুন। এবার চাপতে থাকুন। দেখবেন জোয়ারের মতো পানি বেরিয়ে আসছে। এ আসলে ঘুষের ব্যারাম। মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো ঘুষ নিয়ে ঘুষাঘুষিও এখন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। পার্থক্য শুধু নামে। কেউ একে বলেন উপহার, কেউ বলেন ডোনেশন আবার কেউ বলেন পার্সেন্টেজ। এ চলছে, চলবে!

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement