advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অসামান্য নাজমা আপার কথা

মযহারুল ইসলাম বাবলা
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০৪
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের বরেণ্য অধ্যাপক, প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী নাজমা আপা। স্যারের বিশাল ব্যক্তিত্বের সীমা অতিক্রম করে স্বীয় প্রতিভায় উদ্ভাসিত একজন সফল নাট্যকার, লেখক, সংগঠক এবং একজন স্নেহপ্রবণ মা। নিজগুণে তিনি তার অবস্থান শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে গেছেন। যেটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বটে। নাজমা আপার ডাক নাম মেরী। মেরী মাতার মতো তিনি ছিলেন মাতৃস্নেহপ্রবণ। নামের এমন সার্থকতা আমাদের সমাজে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তাসের দেশ সর্বাধিক মঞ্চস্থ এবং মঞ্চসফল নাটক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমী আয়োজিত শিশু-কিশোর নাট্য উৎসবে রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি নাট্যকারের অভিযোগে তাসের দেশ ওই উৎসবে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। শিশু একাডেমীর তৎকালীন পরিচালক প্রয়াত জোবেদা খানম রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি লেখক আখ্যায়িত করে আমাদের সব যুক্তি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাচারিতার নগ্ন দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের সেই সময়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের কারণে আমাদের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বিদেশি হয়ে যান। শিশু একাডেমীর স্বেচ্ছাচারিতায় সাপ্তাহিক নয়া পদধ্বনি পত্রিকায় আমি নিবন্ধও লিখেছিলাম। সামরিক শাসনের সেই অন্ধকার সময়ে সামরিক শাসকের স্বেচ্ছাচারী দর্শন-মতাদর্শ জাতির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বেশি কিছু করারও উপায় ছিল না। স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নাজমা জেসমিন চৌধুরী রচিত ঢাকা লিটল থিয়েটারের পথনাটক ‘সন্ত্রাস’ শহীদ মিনার, প্রেসক্লাব, কলাভবনসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়েছিল। সময়োচিত এই নাটকটি তখন যথেষ্ট সাড়া ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পা-িত্য, একাডেমিক শিক্ষায় সুশিক্ষিতা, বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি অভিসন্দর্ভ থিসিস সম্পন্নে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরীকে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সনাতনী স্নেহময়ী মায়েদের থেকে পৃথক কখনো মনে হয়নি। পেশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক নাজমা আপার সান্নিধ্যে যারাই এসেছেন তার অনন্য আচরণে-আন্তরিকতায় ও নির্মল মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হননি। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চাসনে থেকেও সামান্যতম অহঙ্কারবোধ তার চিন্তাকর্মে ও আচরণে কখনো দেখা যায়নি।

তাসের দেশ নাটকের পর নাজমা আপাকে কোনোরূপ অবসর না দিয়ে নতুন মৌলিক নাটক লেখার বোঝা চাপিয়ে ছিলাম। বাসাভর্তি শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতির কথা ভেবে বিলম্ব না করে দ্রুত শেষ করেছিলেন যেমন খুশি সাজো নাটকটি। বলা বাহুল্য, নতুন নাটকের মাধ্যমে আবার তার বাসাটি সরব হয়ে উঠেছিল। মহড়া-মঞ্চায়ন ব্যস্ততা। আত্মীয়-পরিজনরা আমাদের মহড়ার সময় তেমন আসতেন না। সবাইকে মহড়ার ব্যস্ততার বিষয়ে তিনি আগেই অবগত করে দিতেন। না জেনে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কেউ এলে আমাদের দখলদারিত্বে টিকতে পারতেন না। নাজমা আপা দ্রুত কথা সেরে বিদায় দিতেন। নাজমা আপাদের গাড়ি ছিল না। নিজেদের গাড়ি না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের গ্যারেজ বরাদ্দ ছিল। সেই গ্যারেজে নিরাপত্তায় থাকত আমাদের নাটকের সেট-প্রপস্ ইত্যাদি।

অধিক ব্যস্ততায়ও নাজমা আপা সংসারের যাবতীয় কাজ নিজেই সামাল দিতেন। বাজার-সদাই হতে সবই নিজ হাতে করতেন। আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের স্যারের গবেষণা, সভা-সমাবেশ, পেশা-লেখালেখিতে যেন কোনোরূপ বিঘœ না ঘটে সেজন্য আমি সব দায়িত্ব শুরু থেকেই পালন করে এসেছি। আত্মীয়-পরিজন থেকে সব সামাজিকতাও আমি একাই সামাল দিয়ে আসছি।’ অসামান্য পা-িত্যের অধিকারী দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জ্ঞানে-মননশীলতায় সৃজনশীল কর্মকা-ের নেপথ্যে নাজমা আপার অবদান স্বীকার করতেই হবে।

নাট্যকার-সংগঠক নাজমা জেসমিন চৌধুরী বাংলাদেশের শিশু-কিশোর নাট্য আন্দোলনে অসামান্য-যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন। একদিকে যেমন শিশু-কিশোর উপযোগী নাটক লিখে; পাশাপাশি সাংগঠনিক নানা কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে তিনি শিশু-কিশোর নাট্য আন্দোলনে বিশাল অবদান রেখেছিলেন। ঢাকা লিটল থিয়েটারের তাসের দেশ, যেমন খুশি সাজো নাটকের বাহারি পোশাকগুলো প্রদর্শনীর আগের দিন তিনি নিজেই ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখতেন। প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, পারিবারিক শত ব্যস্ততা হার মেনেছিল ঢাকা লিটল থিয়েটারের প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসার কাছে।

আমি বিদেশ অবস্থানে প্রচুর ব্যস্ততার ভিড়েও নাজমা আপা প্রায়ই চিঠি লিখতেন। তার এবং স্যারের প্রকাশিত বই এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বিদেশে আমাকে পাঠাতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্যানেল নির্বাচনে সর্বাধিক ভোটে বিজয়ী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার স্বইচ্ছায় উপাচার্য পদ প্রত্যাখ্যানে নাজমা আপা চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন, ‘তোমাদের স্যার ভাগ্যিস ভিসির পদ প্রত্যাখ্যান করলেন। বড্ড বাঁচা বেঁচে গেলাম। ভিসি হবে হবে সেই সময় আমাদের চারপাশে সুযোগসন্ধানী-সুবিধাভোগী মানুষের ভিড়ে আমরা আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের হারাতে বসেছিলাম। ভাগ্য ভালো এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।’

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মুখে ক্যানসার এবং অপারেশন-পরবর্তী তার মুখের পরিবর্তন প্রসঙ্গে অধিক দুঃখে হতাশ হয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের সময়ের অনিন্দ্য সুন্দরী মানুষটি কেমন হয়ে গেল। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ সুচিত্রা সেন। ক্যানসার নামক দানবীয় রোগে সব শেষ।’ সেই দানবীয় রোগ যে তার পানে ধেয়ে আসছে তিনি কি তা কল্পনা করতে পেরেছিলেন? নাজমা আপার জরায়ুতে টিউমার বাসা বেঁধেছিল। টিউমারটি ১৯৮৭ সালে ধরা পড়ে এবং অধ্যাপক টিএ চৌধুরীর পরামর্শে পিজিতে ভর্তি হলেও অপারেশনের সিরিয়াল পেতে বিলম্ব হওয়ায় টিউমারটি দ্রুত বৃহৎ আকার ধারণ করে। সময়ক্ষেপণে সফল অপারেশন হলেও টিউমারটি ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। সেই সময়ে ক্যানসার রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসা-সরঞ্জামের অপ্রতুলতায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে রেডিও থেরাপির মাধ্যমে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। সেকেলে এবং জরাজীর্ণ চিকিৎসা-সরঞ্জাম দিয়ে রেডিও থেরাপিতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে আমেরিকা প্রবাসী ডাক্তার ভাইয়েরা তাকে আমেরিকা নিয়ে যায়। সেখানে সিটিস্ক্যানের মাধ্যমে ধরা পড়ে ক্যানসার তার পুরো শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কেমোথেরাপি দিলেও ক্যানসার নিরাময়ে তা যথেষ্ট ছিল না। অগত্যা নিরুপায়ে নাজমা আপাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কেমোথেরাপি দেওয়া হলেও তাকে আর সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ আমাদের সবার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রিয় মানুষটি নীরবে চলে গেলেন। ক্ষণজন্মা নাজমা আপার দীর্ঘ স্মৃতি এই ছোট্ট পরিসরে লিখে শেষ হওয়ার নয়। নাজমা আপা স্বীয় কর্মগুণে আমাদের মাঝে আজও অনুপ্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে রয়েছেন এবং থাকবেনও অনন্তকাল।

য় মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

advertisement