advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মেহেদীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ

নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:৪০
advertisement

এখনো কৈশোর পার হয়নি ছেলেটির। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করার পর বলেছিল, ‘মা, দেখো... আমার চাকরি ঠিকই হয়ে যাবে।’ সেদিন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে ইন্টারভিউ ছিল ছেলেটির। এইচএসসি পাস ছেলেটির কাছে ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার চেয়েও জরুরি একটি চাকরি। কারণ চাকরি না হলে সংসার চলবে না; পড়ালেখাও শিকেয় উঠবে।

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার নাবিস্কো বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে চাকরির সাক্ষাৎকার দেয় সে। ওয়াক ইন ইন্টারভিউ (সাক্ষাৎকারের সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ) পদ্ধতিতে চাকরিটা রীতিমতো পেয়েও যায়। বাসায় ফিরেই মাকে জড়িয়ে ধরে সে। বলে, মা, বলেছিলাম না, চাকরিটা হয়ে যাবে। এখন আর আমাদের সংসারে কোনো অভাব থাকবে না। আমিও পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যেতে পারব।’

তার সেই খুশি, আনন্দ একটি রাতও পার করতে পারেনি। সেদিনই ভিক্টর ক্লাসিক বাসের চাপায় মারা যায় সে। এর সঙ্গে মারা যায় তার যত খুশি, যত আনন্দ, তার যত স্বপ্ন; তাকে ঘিরে মা-বাবা আর স্বজনদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাও।

ছেলেটির নাম মেহেদী হাসান ছোটন, বয়স ১৯।

বন্ধু ইয়ামিন আলভীর বাবা পারভেজ রবের কুলখানি অনুষ্ঠানের বাজার করতে গিয়ে নিজেও যে কুলখানির উপলক্ষ হয়ে যাবে; পরিবারের সব আনন্দ মাটি করে দেবে, তা তো ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি ছোটন; বুঝতে পারেনি জীবন থেকে এভাবে ছুট লাগাতে হবে চিরতরে।

মেহেদীর মা পারভীন বেগমের সঙ্গে কথা হয় গতকাল উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ধউর ইস্টওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ এলাকার বাসায়। ধউরের (উত্তরা-বাইপাইল বেড়িবাঁধ সড়ক) অলিগলিতে ডান-বাম পেরিয়ে এক গ্রামীণ পরিবেশে মেহেদী হাসান ছোটনের পৈতৃক ঠিকানা। তিন কাঠা প্লটের এক কোণে দুই রুমের স্যাঁতসেঁতে টিনশেডে তাদের বসবাস। ছেলে হারানোর পঞ্চম দিন গতকাল বুধবার দুপুরেও বাসার সামনে বসে কাঁদছিলেন মা পারভীন বেগম। তিনি বলেন, ঢাকায় এসে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সংসার চালানোর পাশাপাশি একটি গ্রিলের ওয়ার্কশপ দিই। সেই আয়ে তিন কাঠার ডোবা জমি কিনি। পরে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে গেলে টাকার টানাটানিতে পুঁজির অভাবে ব্যবসা মন্দা হওয়ায় গ্রিলের ওয়ার্কশপটি বন্ধ করি দিই। বেকার হয়ে পড়েন ছোটনের বাবা। বড় ছেলে চাকরি খুঁজে হয়রান। এ অবস্থায় কষ্ট করে ছোট ছেলে মেহেদীকে পড়াশোনা করাই।

চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, যে সময়ে আমার মেহেদী আনন্দে বলেছিল, মা তোমাদের আর কষ্ট থাকবে না। ১১ সেপ্টেম্বর চাকরিতে যোগদান করব। আমি ভালো কাজ করতে পারলে দিনদিন পদোন্নতি পেয়ে বড় অফিসার হবো। ধানম-ি বাসা নিয়ে থাকব। সেদিনই বাসের চাকায় আমার আদরের ধন শেষ হয়ে যায়। আমি আর কি স্বপ্ন দেখব। কারে নিয়ে বাঁচব!

কাঁদছেন সন্তানহারা মা। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, মৃত্যুর মুখে যাওয়ার আগেও ছেলেটি দরদ দিয়ে বলে ‘মা আমার গায়ে একটু মালিশ করে দাও।’ আমি বলি, তোর গায়ে কী হয়েছে? ও বলে, ঘাড়ে ব্যাথা। বন্ধু আলভীর বাবার লাশের খাট কাঁধে নিয়েছিলাম যখন তখন ব্যথা পেয়েছি। ছেলেমেয়েদের মানুষ বানানোর যে স্বপ্ন নিয়ে লক্ষ্মীপুর রামগঞ্জের গ্রাম থেকে এসেছি, সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল আমাদের।

আক্ষেপ করে মেহেদীর মা তার ছেলের হত্যাকারী ঘাতক চালকের ফাঁসি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ছেলেকে বাসের চাকায় পিষিয়ে হত্যা করা হলো ৪-৫ দিন হয়ে গেল। পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কেউ এলো না।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা আমাদের সময়কে বলেন, আলভী-মেহেদীকে চাপা দেওয়া বাসচালককে দুদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ শেষে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

এদিকে ইয়ামিন আলভীকে বিশ্রামের জন্য বাসায় পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। কোমর ভেঙে তিনি মোহাম্মদপুর কলেজ গেটের ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

ট্রমা সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, আলভীর কোমরের সামনের মাঝামাঝি কয়েক জায়গায় হাড় ভেঙে গেছে। আশা করছি কোনো ধরনের অপারেশন ছাড়াই তাড় হাড়গুলো জোড়া লাগবে। তাকে নাড়াচাড়া করানো যাবে না। এ জন্য তাকে বিশ্রাম নিতে বাসায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আলভীর মা রুমানা সুলতানা বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে একদিনে যে ব্যয় তা সামলানো কঠিন। সরকারি হাসপাতালে সেভাবে চিবিৎসা পাব কিনা জানি না। চিকিৎসকরা বলেছেন, বাসাতে বিশ্রামে রাখলে আলভী ধীরে ধীরে হাড় জোড়া লেগে আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে ঘাতক বাস চালকের ফাঁসি দাবিসহ প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান এ দুটি পরিবার।

advertisement