advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খাদ্য অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন : নীতিমালা জারির পর পরই স্থগিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন

মো. মাহফুজুর রহমান
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:২২
advertisement

‘খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০১৯’ জারি করা হয় গত ১ সেপ্টেম্বর। মাত্র একদিন পরই এটি স্থগিত করা হয়। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নতুন নীতিমালা স্থগিত ছিল। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না খাদ্য বিভাগের পরিচালক (প্রশাসন), মূলত যেখান থেকে বদলি ও পদায়ন করা হয়। মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিমালাটিতে সংযোজনÑবিয়োজন ও সংশোধন প্রয়োজন, বিধায় স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ মাত্র দুই পৃষ্ঠার একটি নীতিমালা প্রণয়নে ছয় মাস সময় নেওয়ার পরও কেন তাতে ত্রুটি থেকে গেল? ত্রুটি থাকার পরও কেন সেটি জারি করা হলো এবং এর একদিন পর কেনইবা সেটি স্থগিত করা হলো?

আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন নীতিমালা প্রণয়নে খাদ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ আমলে নেয়নি মন্ত্রণালয়। এদিকে নতুন নীতিমালাকে স্থগিতের ফাঁদে ফেলে পুরনো নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে চলছে দেদার বদলি-পদায়ন বাণিজ্য।

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মওকা বুঝে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রসঙ্গত এ অধিদপ্তরের কার্যক্রম দেশের জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত।

নতুন নীতিমালায় কেউ এলএসডি বা সিএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করলে সেই কর্মকর্তাকে আবার ওই পদে পদায়ন করতে হলে কমপক্ষে দুই বছর ভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে হবে। সাভার সিএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলামকে গত সপ্তাহেই বদলি করা হয়েছে কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা সিএসডিতে। ওদিকে কোনাখোলা সিএসডির কর্মকর্তা উত্তম কুমার দাশের বদলি হয়েছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর সিএসডিতে। অধিদপ্তরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, অসাধু কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এগুলো খুবই লোভনীয় পোস্টিং। শুধু এ দুজনই নয়, দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এ অধিদপ্তরে এমন ‘লোভনীয় পোস্টিং’-এর ঘটনা ঘটছে প্রচুর। নতুন যে নীতিমালা জারি করা হয়েছিল, তাতে এভাবে বদলি হওয়া সম্ভব হতো না।

নতুন নীতিমালা স্থগিত প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, কিছু ক্লারিক্যাল মিসটেক (করণিক ভুল) হয়েছে, সংশোধন করা হচ্ছে। অনিয়মের সঙ্গে আমরা আপস করব না।

সূত্র জানায়, স্থগিত হওয়া নীতিমালার (১৩.০০.০০০০.০২২.১৯.০০১.১৯/৪২৬, তারিখ ০১-০১-১৯) ২ নম্বর অনুচ্ছেদে মূলত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কোথায় কী পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা হয়নি ওই নীতিমালায়। এতে উল্লেখ আছেÑ নিজ জেলা ও উপজেলায় পদায়ন বা বদলি হতে পারবেন না খাদ্য অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা। আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা নিজ বিভাগে; জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা সমমানের পদ, ৯ম গ্রেডের ক্যাডার, নন-ক্যাডার পদের কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় বদলি বা পদায়ন হবে না। একইভাবে সিএসডির ম্যানেজার ও এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও নিজ জেলায় বদলি হতে পারবেন না। এ ছাড়া ১০ম থেকে শুরু করে ১৬তম পর্যন্ত গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ উপজেলায় বদলি হতে পারবেন না। তবে ৯ম গ্রেডভুক্ত পদে কোনো কর্মকর্তা ৫৮ বছর বয়সে নিজ জেলায় বদলি হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রেও নিজ উপজেলায় নয়। এমন বিধান রেখে ১ সেপ্টেম্বর ‘খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০১৯ জারি করা হয়েছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে, যা পরদিন স্থগিত হয়।

জারি করা নীতিমালা অনুযায়ী, খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক/সাইলো অধিক্ষক ও সমমানের কর্মকর্তাসহ ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি হবে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে। জেলাপর্যায়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক/সমমানের ৯ম গ্রেডভুক্ত নন-ক্যাডার সব কর্মকর্তা, ‘এ’ ও ‘বি’ গ্রেডভুক্ত এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সিএসডির ব্যবস্থাপক এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আন্তঃবিভাগীয় বদলির ক্ষমতা খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হাতে। খাদ্য পরিদর্শক ও সমমানের কর্মকর্তাদের এবং ‘সি’ গ্রেডের এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি করবেন নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। আর জেলার অভ্যন্তরে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বদলির ক্ষমতা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে। এতে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, একই কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একাধিকবার বদলি, পদায়ন বা সংযুক্তি দেওয়া যাবে না। একবার এলএসডি বা সিএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করলে কোনো কর্মকর্তাকে আবার ওই পদে পদায়ন করতে হলে কমপক্ষে দুই বছর ভিন্ন কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োজিত থাকতে হবে। বদলির আদেশ জারির পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এটি লঙ্ঘনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নীতিমালা স্থগিতের সুযোগে জনপ্রতিনিধিদের ভুয়া ডিও লেটার বা সুপারিশপত্র নিয়ে বদলির ধুম পড়েছে অধিদপ্তরে। এ নিয়ে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ মহাপরিচালক। এ নিয়ে অফিস আদেশও জারি করেছেন তিনি; যাতে বলা হয়েছেÑ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বদলি ও পদায়নের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জাল স্বাক্ষরযুক্ত সুপারিশ উপস্থাপন করছেন। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীর আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদবির ও চাপ প্রয়োগ করছেন। বদলি, পদায়ন ইত্যাদি সুবিধা আদায়ের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জাল স্বাক্ষরযুক্ত সুপারিশপত্র/ডিও লেটার অধিদপ্তরে পাঠাচ্ছেন খাদ্য বিভাগেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চাকরির নিয়ম ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত এমন কর্মকা- থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে মহাপরিচালকের আদেশে বলা হয়েছেÑ অন্যথায় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাল সুপারিশসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির শৃঙ্খলাবহির্ভূত বিভিন্ন কর্মকা- তুলে ধরে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আদেশে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির শৃঙ্খলাবহির্ভূত আচরণ বা কর্মকা- যথাযথ কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হয়েছে। তারা বিনাঅনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে খাদ্যভবনে তদবিরের জন্য ঘোরাঘুরি এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল্যবান সময় অপচয় ঘটানোসহ দাপ্তরিক কর্মপরিবেশ বিনষ্ট করছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাপ্তরিক নথিপত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গ ও তথ্য পাচার করছেন জানিয়ে অফিস আদেশে বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যম ছাড়া শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ (সরাসরি মন্ত্রী/সচিব/মহাপরিচালক/পরিচালক বরাবরে বিভিন্ন ধরনের আবেদন ও চিঠিপত্র পাঠানো) কাজও তারা করছেন।

 

 

advertisement