advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রযুক্তির উন্নতির সময়ে চিন্তাশীলতার সংকট

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০৬
advertisement

প্রযুক্তির উন্নতি নিয়ে বর্তমানে অনেক মানুষই আনন্দিত। ইন্টারনেটের কারণে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের কিবোর্ডে চাপ দিলেই মেলে অজ¯্র তথ্য। বিদেশে থাকা নিকটজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা এখন অতিসহজ, দ্রুত ডাউনলোড করে নেওয়া যায় পছন্দের চলচ্চিত্র বা সংগীত। কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ থেকে আমরা তা জানতে পারি। কখনো দেখা যায় ওই ঘটনার ছবি আর ভিডিও। কী ঘটেছে, তা জানতে পরদিনের সংবাদপত্রের জন্য এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হয় না। প্রযুক্তির কারণে পাওয়া বিভিন্ন সুবিধা আমাদের জীবন সহজ করেছে। কিন্তু আমাদের সমাজের বর্তমান রূপ বোঝার জন্য কিছু প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজনÑ প্রযুক্তির কারণে অনেক তথ্য পাওয়া এখন সহজ হলেও আমাদের সমাজে অনেক মানুষ কি চিন্তাশীল হয়ে উঠছে? অনেক মানুষের মধ্যে কি সামাজিক আর রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হচ্ছে? বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে কি আমরা দেখতে পাচ্ছি বিচক্ষণতা আর সুরুচি? বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা কি দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানে বা জানতে আগ্রহী? প্রযুক্তির উন্নতি কি অনেক মানুষকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে আগ্রহী করে তুলছে? মানুষের মন মুক্ত হচ্ছে অযৌক্তিক, অসহিষ্ণু, অন্ধ চিন্তা থেকে? মানুষ কি বুঝতে পারছে কোন কাজ করা উচিত আর কী করা কোনোভাবেই উচিত নয়?

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘আগন্তুক’-এর (১৯৯১) একটি দৃশ্যে প্রধান চরিত্র মনোমোহন মিত্র (এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত) বলেছিল, ‘এখানে হাসির খোরাক পান আপনারা? আমি তো আজকের কাগজে শোক সংবাদ ছাড়া কিছুই পেলাম না।’ ইদানীং প্রতিদিন সকালে যখন আমাদের দেশের সংবাদপত্রের দিকে তাকাই, তখন বিভিন্ন সংবাদের শিরোনাম দেখে কি ‘আগন্তুক’ ছবির এ সংলাপটিই মনে পড়ে না? সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ হারানো, খুন, ধর্ষণসহ নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির সংবাদ। এমন দুঃখজনক আর অগ্রহণযোগ্য বিভিন্ন ঘটনা অনুভূতিশীল মানুষের মনের ওপর প্রতিদিন তৈরি করছে তীব্র চাপ। প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে, সময় হচ্ছে আরও আধুনিক। কিন্তু সমাজে যদি অনিয়ম, অপরাধ, অন্ধচিন্তা, অসহিষ্ণুতা বাড়তেই থাকেÑ তা হলে প্রশ্ন করতে হয়, আধুনিক এই সময় কোন কল্যাণ আর সুফল সৃষ্টি করছে সংবেদনশীল মানুষের জন্য? সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যদি অসংবেদনশীল হয়ে যায়, তা হলে সমাজ হয়ে উঠবে অসুস্থ। এমন সমাজে অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়ে উঠবে নিয়মিত ব্যাপার। যে সমাজে জ্ঞান, সুরুচি, যুক্তি আর আদর্শের মূল্য থাকে নাÑ ওই সমাজে রুচিবান, অনুভূতিশীল, উজ্জ্বল ব্যক্তিরা কি বসবাস করতে আগ্রহী হবেন? যদি এমন ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হনÑ তা হলে এই সমাজে মেধা, মননশীলতা আর বিচক্ষণতার আলোও থাকবে না।

সমাজে অনেক মানুষের সংবেদনশীল হওয়া এবং বিদ্যমান সামাজিক আর রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ যাদের সচেতনতা আর সংবেদনশীলতা নেই, তারা অনিয়ম দেখলে প্রশ্ন আর প্রতিবাদ করবে না। কীভাবে সমাজে শোষণ টিকে থাকছে, তা বোঝার ক্ষমতাও বোধহীন মানুষের থাকে না। কোনো সমাজে বহু মানুষ যুক্তি দিয়ে ভাবতে না শেখে মননশীলতার অর্থ কী এবং তা যদি অনেক মানুষ না বোঝেÑ তা হলে ওই সমাজে নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা, সুরুচি আর আদর্শবাদিতা গুরুত্ব পাবে না। ভালো ও মন্দ, চিন্তাশীলতা আর স্থূলতার পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা মানুষের থাকবে না। আমাদের সমাজে বহু মানুষ বর্তমানে কোন ধরনের চিন্তা আর আচরণ করছে, তা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার।

আমার পেশা অধ্যাপনা হওয়ার কারণে প্রতিবছরই শ্রেণিকক্ষে দেখি এই প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের। হতাশার সঙ্গে দেখি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীরই চিন্তাশীল বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়নি। বক্তব্যধর্মী ও সমাজ সচেতন চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাসও তাদের নেই। দেশের ইতিহাস সম্পর্কেও তাদের ধারণা কম। যখন তাদের প্রশ্ন করি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে, তখন বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম বলতে পারে না। তাদের যখন জিজ্ঞেস করি আমাদের দেশে আর বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের বিখ্যাত উপন্যাস, গল্প তারা পড়েছে কিনাÑ তখন দেখতে পাই বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই বিখ্যাত লেখকদের রচনা পড়েনি। মনে পড়ে, আশির দশকের কথাÑ যখন দেশে একটিই টেলিভিশন চ্যানেল ছিল আর ছিল না ইন্টারনেট, তখন কম বয়সীরা বই পড়ত। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে মেতে থাকা এই সময়ে বই পাওয়া তো সহজ। কিন্তু এখন আমাদের দেশে মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ব্যাপারে অনেক মানুষ, বিশেষ করে কম বয়সীরা যে উৎসাহ দেখাচ্ছেÑ তেমন উৎসাহ নিয়ে কি এই সমাজে অনেক মানুষ বই পড়ছে? কেবল পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করে ডিগ্রি অর্জন করলেই আলোকিত মানুষ হওয়া যায় না। মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করা এবং দুর্নীতিকে ঘৃণা করার মানসিকতা যার আছে, তিনিই আলোকিত মনের মানুষ। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন চিন্তাশীল বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জন করা যায় বিচক্ষণতা আর শুভবুদ্ধি। কম বয়সীদের মধ্যে বর্তমানে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের।

ইন্টারনেট কেবল বিনোদন পাওয়ার জন্য ব্যবহার করলে তা মানুষকে মননশীল করবে না। ইন্টারনেট ব্যবহার করে চিন্তাশীল বই কি পড়ছে অনেক ছাত্রছাত্রী বা বিভিন্ন দেশে তৈরি বিখ্যাত বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র কি তারা দেখছে? এই সময়ে আমি দেখতে পাচ্ছি সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, জহির রায়হান, আলমগীর কবির প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি চলচ্চিত্রকারদের ছবি সম্পর্কে আমাদের দেশের অনেক ছাত্রছাত্রীর কোনো ধারণা নেই। কিন্তু তারা দেশের জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের চেনে, চেনে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের মডেলদের। শৈল্পিক আর সমাজ সচেতন নাটক-চলচ্চিত্র দেখা যে ভালো বই পড়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণÑ গণমাধ্যম কি এই বোধ দর্শকের মধ্যে সৃষ্টির চেষ্টা করছে? বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র আর টেলিভিশন নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রী ও বিজ্ঞাপনের মডেলরা গণমাধ্যমে অনেক প্রচার পান। তারা হয়ে উঠেছেন সেলিব্রেটি। কোথাও তাদের দেখলে হয়তো তাদের সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ নামে যে গেরিলা দল গঠিত হয়েছিল, ওই দলের অকুতোভয় গেরিলা ও অন্য মুক্তিযোদ্ধারা গণমাধ্যমে প্রচারের অভাবে খ্যাতিমান হননি। তারা মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে দেশের প্রতি অসামান্য অবদান রেখে হয়ে উঠেছেন প্রকৃত নায়ক। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের এই শহরের কোথাও দেখলে তাদের চিনতে পারবে এ প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী?

বর্তমানের মানুষজন যেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো প্রকৃত নায়কদের নাম জানে ও তাদের চেহারার সঙ্গে পরিচিত হয়, ওই চেষ্টা কি গুরুত্ব দিয়ে এ দেশে করা হয়েছে? এখন যে আমাদের দেশের বহু কম বয়সী এবং দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্রছাত্রীও আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম জানে নাÑ এর কারণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গণমাধ্যম, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে না। কেবল ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করলে আর সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হলেই কম বয়সীরা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠবে, তা আশা করা যায় না। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া, মোবাইল ফোনে কম খরচে বেশি সময় ধরে কথা বলা আর ফেসবুকে সেলফি আপলোড করার ব্যাপারে যে ব্যাপক আগ্রহ এখন আমরা অনেক মানুষের মধ্যে দেখতে পাইÑ জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, সত্যজিৎ রায়ের চিন্তাশীল কোনো ছবি দেখা আর নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানার ব্যাপারে ঠিক তেমন আগ্রহ বর্তমানে অনেক মানুষের মধ্যে কি আমরা দেখতে পাচ্ছি?

প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে প্রাপ্ত বিভিন্ন সুবিধা যদি মানুষের মধ্যে চিন্তাশীলতা সৃষ্টি না করে মানুষকে হালকা বিনোদনে মশগুল করে রাখে, তা হলে প্রযুক্তির ওই উন্নয়নে সমাজ উপকৃত হবে না। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে তৈরি হয় সুবিবেচনাবোধ আর শুভবুদ্ধি। প্রযুক্তির উন্নয়নের এই সময়ে আমাদের সমাজে জৌলুস বেড়েছে। কিন্তু চিন্তা আর মননশীলতার উন্নয়ন কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? ঢাকা শহরে গত কয়েক বছরে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে অনেক। এই শহরকে এখন যানজটের শহর বলা যায়। গাড়ির পাশাপাশি গত কয়েক বছরে এই শহরের বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান, মোবাইল ফোনের দোকান। অথচ চিন্তাশীল বই ঢাকা শহরে অল্প কিছু দোকানেই কেবল পাওয়া যায়। কোনো সমাজে বই পড়ার প্রতি অনেক মানুষের আগ্রহ না থাকলে আশা করা যায় না ওই সমাজ অগ্রসর আর আলোকিত হয়ে উঠবে। জ্ঞান, সুরুচি আর বিচক্ষণতা অর্জন করা জরুরিÑ এই বোধ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করার উদ্যোগ না নিয়ে নতুন প্রযুক্তি সহজলভ্য করে দিলে ওই প্রযুক্তি সমাজের জন্য সুফল আনবে না। রাষ্ট্রকে ওই শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে যে, শিক্ষা মানুষের মধ্যে যুক্তি আর সুরুচির প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করবে। সমাজে যদি দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ, অনিয়ম আর স্থূলতা টিকে থাকেÑ তা হলে বুঝতে হবে, সুশিক্ষা সমাজে গুরুত্ব পায়নি। উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই সমাজ সুন্দর আর সুস্থ হয় না। মানুষ যুক্তি দিয়ে শুভচিন্তা করতে সক্ষম হলেই সমাজ উপকৃত হবে।

য় ড. নাদির জুনাইদ : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement