advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বীজ ও সভ্যতা সমীরণ বিশ্বাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০৬
advertisement

সম্ভবত দানাশস্যের চাষ দিয়ে কৃষি এবং সভ্যতার শুরু হয়েছিল; যখন মানুষ জানতে পারল এক ধরনের ঘাস বীজজাতীয় গাছের বীজ বপন করলে তা থেকে অনেক বীজ হয়। উৎপাদিত বীজ খাওয়া যায় এবং তা পরবর্তী ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায়, তখন সে খাদ্যের অন্বেষণে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে স্থায়ী হয়ে বসবাস শুরু করল। মানবেতিহাসের সব বড় সভ্যতাই এরূপ ঘাসজাতীয় গাছ থেকে উৎপাদিত দানাশস্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। কারণ দানাজাতীয় শস্যের খাদ্যমান বেশি এবং সংরক্ষণ সুবিধাও বেশি। তাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় মেসোপটেমিয়ানরা গমের আবাদ করত। হোয়াংহো ও ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় চীনারা ধান উৎপাদন শুরু করেছিল। ইউকানান অঞ্চলের শুকনো সমতল এলাকায় মায়ারা ভুট্টা উৎপাদন করত।

বীজ অতীতকালে এবং এখনো মানুষের প্রধান খাদ্য উৎপাদনের উৎস। বীজ না থাকলে কৃষিকাজ শুরুই করা যেত না এবং কৃষিকাজকে স্থিতিশীল করা সম্ভব হতো না। সভ্যতার বিকাশ সাধন কৃষিকাজের অস্থিতিশীলতার কারণে বিঘিœত হতো এবং গতি শ্লথ হয়ে পড়ত। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বীজের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীরভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে এবং বীজ ব্যবহারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

অসম্ভব বিষয় নিয়ে কিছু সময় চিন্তা করা যাক। ধরে নেওয়া যাক পৃথিবীতে বাতাস নেই বা পৃথিবীর বাতাস সব দূষিত হয়ে গেছে কিংবা পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ সামান্য বেড়ে গেছে বা কমে গেছে। অথবা পৃথিবীর পানি সব উধাও হয়ে গেছে বা দূষিত হয়ে গেছে। এর যে কোনো একটি ঘটলে আমাদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে এবং বেশি দিন এ ধরনের বিরূপ অবস্থা বিরাজ করলে আমাদের তথা সারা জীবের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এখন আমরা চিন্তা করি বীজ নিয়ে। পৃথিবীতে বীজ নেই বা সব বীজ মরে গেছে। তা হলে কী ঘটবে। পৃথিবীতে গাছ বিলীন হয়ে যাবে। বাতাস, তাপ বা পানি এদের প্রাচুর্য কোনো সময় আমাদের ভাবতে বাধ্য করে না যে এমনটি ঘটতে পারে। বীজের বেলায়ও এ কথা সত্যি। গাছ প্রচুর বীজ উৎপাদন করে এবং এর প্রাচুর্যের কারণে মনে হয় না যে, বীজ কোনোদিন নিঃশেষ হবে। বীজে কোনো বিরূপ ঘটনা ঘটলে আমাদের অস্তিত্বের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই বলা যায়, বীজের প্রতি অবহেলা আমাদের অস্তিত্বের প্রতি অবহেলার শামিল।

সব গুণসহ বীজ যখন কৃষকের কাছে যায়, তখন শুধু বীজই তার হাতে পৌঁছায় না, গবেষণাগার থেকে উদ্ভূত এসব প্রযুক্তির ফলাফলও তার কাছে পৌঁছায় এবং প্রযুক্তির বিস্তার ঘটে।

বীজের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগুলো বীজকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের অতি প্রয়োজনীয় অসংখ্য কার্যসম্পাদনে বীজ ব্যবহৃত হয়। তাই উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জন্য বীজের গুরুত্ব অপরিসীম।

গাছের বংশ বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হলো বীজ। বীজ উৎপাদন না করতে পারলে একটি গাছ তার বংশধর রেখে যেতে পারত না। বীজ ভ্রƒণকে নানাবিধ প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে। উপযুক্ত সময়ে ভ্রƒণকে খাদ্য সরবরাহ করে চারায় রূপান্তরিত করে, পরে যা গাছে রূপান্তরিত হয়। বীজ ভ্রƒণকে পরবর্তী উৎপাদন কাল পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখে। অনেক বীজ বহুদিন পর্যন্ত জীবিত থাকে। বীজ না থাকলে পৃথিবী থেকে গাছপালা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে ওইসব গাছের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতো।

বীজ পশুপাখির প্রধান খাদ্য। মানুষের খাদ্যের মধ্যে দানাশস্যের বীজ সর্বপ্রধান। পৃথিবীতে গাছের বীজ, যে কোনো উদ্ভিদ ও প্রাণীজ দ্রব্য থেকে বেশি খাদ্যের জোগান দেয়। গমের বীজ খাদ্য হিসেবে প্রথম স্থানে এবং ধানের বীজ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। ভুট্টা, বার্লি, জোয়ার, বাজরা, ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদি ফসলের বীজ মানুষ ও পশুপাখির খাদ্য। আমাদের দেশে দানাশস্য, বিশেষ করে ধানবীজ মানুষের শরীরের তিন-চতুর্থাংশ শক্তি সরবরাহ করে থাকে, অর্থাৎ আমরা যে চলাফেরা, কাজকর্ম করছি সবই আসছে ধানবীজ থেকে।

বীজ উদ্ভিদের জাত উন্নয়নের একটি ইতিহাস। মানুষ ভালো জাত দেখে বীজ সংরক্ষণ করছে এবং তা থেকে পরবর্তী সময়ে ফসল উৎপাদন করছে। এভাবে বীজের মাধ্যমে ভালো জাত বাছাই অতীতে শুরু হয়ে অদ্যাবধি চলছে।

ভালো জাতের গাছ উদ্ভাবনের প্রচেষ্টায় বীজ এভাবে মানুষকে সাহায্য করে চলেছে।

বীজ ছাড়া ফসল উৎপাদনের কথা চিন্তাই করা যায় না। ফসল উৎপাদনের শুরুই হচ্ছে বীজ। অন্যদিকে বীজ যদি ভালো গজানোর ক্ষমতাসম্পন্ন না হয়, তা হলে মাঠে গাছের সংখ্যা কম হবে এবং তাতে ফসল কম হবে।

শিল্পদ্রব্য উৎপাদনের বীজ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনশিল্পে তেলজাতীয় বীজ বহুল পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। নানাবিধ রাসায়নিক দ্রব্য তৈরির কাঁচামাল হচ্ছে দানা শস্যবীজ ও তেলবীজ। মাদকজাতীয় পানীয় তৈরিতে গম, বার্লি, ধান ব্যবহৃত হয়। অনেক ওষুধের অন্যতম প্রধান উপাদান বীজ।

বীজের আকার, আকৃতি, রঙ ইত্যাদি অত্যন্ত সুন্দর। একেকটি বীজ একেক আকারের। আকৃতির কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় কোনোটি গোল, কোনোটি চ্যাপ্টা, কোনোটি ডিম্বাকৃতি। বীজের রঙ বীজকে সৌন্দর্যের আধারে পরিণত করেছে। হরেক রঙের সংমিশ্রণে বীজ যেন শিল্পির আঁকা নয়নাভিরাম এক ছবি। বীজের সৌন্দর্য মানুষের মনের খোরাক জোগায়।

য় সমীরণ বিশ্বাস : কো-অর্ডিনেটর, কৃষি ও বীজ কর্মসূচি, সিসিডিবি, ঢাকা

advertisement