advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির পিলার নাড়াচ্ছেন কারা

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:২৬
অঘোর মন্ডল
advertisement

রাজনীতিতে ঔদ্ধত্য বড্ড ভয়ঙ্কর জিনিস। ঔদ্ধত্যের স্পর্ধা দেখালে এর ফল খারাপ হতে বাধ্য। সেটি ব্যক্তি, দল, সমাজ সবার জন্য। এর সর্বশেষ নজির ছাত্রলীগের দুই নেতা। ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া সংগঠন। আওয়ামী লীগেরও আগে বঙ্গবন্ধু গড়েছিলেন ছাত্রলীগ। তিনিই গর্বভরে বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস।’ বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু তার বাংলাদেশ আছে। ছাত্রলীগও আছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের গায়ে শুধু কালির ছোপ পড়েছে এবং তা ছাত্রলীগ নেতাদের সৌজন্যে! ওই কালির ছাপ মুছে ফেলার উদ্যোগটি নিতে হলো বঙ্গবন্ধুকন্যাকেই। তার নির্দেশেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানী।

শোভন-রাব্বানীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ দায়মুক্ত হয়ে গেলÑ বিষয়টি মোটেও তা নয়। এত সহজ-সরল ভাবনার অবকাশও নেই। তবে তাদের পদত্যাগ আদর্শচ্যুতি আর ঔদ্ধত্যের স্পর্ধা দেখানোর প্রতিফল। একই সঙ্গে এ দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষের সামনে ছাত্র রাজনীতির কঙ্কালটিও বেরিয়ে পড়ল। ছাত্র রাজনীতির নামে পেশিশিক্ত প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ছাড়া এসব নেতাদের ছাত্রসমাজের জন্য করার কিছু নেই। দেওয়ার কিছু নেই। অথচ ছাত্র রাজনীতির পথ ধরে এ দেশ পেয়েছে বড় বড় রাজনীতিবিদ। তারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ পরিচালনাতেও রেখেছেন ভূমিকা। এ দেশের ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের বিভিন্ন অনুষঙ্গ। তবে ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারণটিই সত্যি হয়ে বেরিয়ে আসে। ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মতো জড়িয়ে থাকবে ছাত্রলীগের নামটিও।

এ দেশটির বয়স যখন পঞ্চাশের কাছাকাছি আর জাতি বাংলাদেশের স্থাপতির জন্মশতবর্ষ পালনের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ছাত্রলীগ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভালোবাসা নয়, ভয়ের নাম। এটিই সত্য। এটিই বাস্তবতা। ছাত্রলীগ সম্পর্কে মানুষের এই ধারণা একদিনে হয়নি। এক-দুইজন শোভন-রাব্বানীর কারণেও হয়নি। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বেপরোয়া ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগ সভাপতি বারবার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। কে শোনে কার কথা! ক্ষমতার অপব্যবহার, ভোগবিলাসই ছাত্রলীগ নেতাদের পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। সেটি কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। তাদের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বÑ যারা ছাত্রলীগকে দেখভালের দায়িত্বে আছেন। ছাত্রলীগের এই বেপরোয়া হয়ে ওঠার দায় এড়াতে পারবেন না তারাও।

বেশ কিছুদিন ধরে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মুখেও একটি কথা শোনা যায়, রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই! দুঃখ, হতাশা ও আক্ষেপে হোক আর যে কারণেই হোক, তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে পড়া কথাটিই সত্যি। রাজনীতি এখন সত্যিকার রাজনীতিবিদের হাতে নেই। ব্যবসায়ী, সামরিক-বেসামরিক আমলারা যখন রাজনীতিতে ঢুকে পড়বেন, তখন সেখানে নীতি-আর্দশের চেয়ে টাকা-পয়সাই রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে- এটিই স্বাভাবিক। ছাত্র রাজনীতি যারা করেন, তারাও হয়তো বর্তমান বাস্তবতায় আগেভাগে টের পেয়ে যান, আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতি তাদের জন্য নয়। তাই চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির মধ্য দিয়েই নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শোভন-রাব্বানীর মনোজগতেও যে তেমন কিছু কাজ করেনি, সেটি জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ছাত্রনেতা হয়ে গিয়ে চাঁদাবাজের খাতায় নাম লেখাতে হবে! নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিতে হবে।

শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুত্বর। তা না হলে আওয়মী লীগ সভাপতি এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেন না। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত আওয়ামী রাজনীতিতে অন্য এক বার্তাও দিয়ে গেল। সেটি দলের সাধারণ সম্পাদক জোরেশোরে বলতে শুরু করেছেন। অপকর্ম করে কেউ ছাড় পাবেন না। ধরে নেওয়া যেতে পারে, আওয়ামী লীগ সভাপতি দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন। আগামী কাউন্সিল সামনে রেখে ওই শুদ্ধি অভিযানের সূচনা হলো কি ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে? অপরাজনীতি-অপকর্মের অভিযোগ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অনেকের বিরুদ্ধেই উঠেছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অভিযোগ বিভিন্নভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষী হলে কেউ ছাড় পাবেন না। পাওয়ার কথা নয়। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগ, নাকি দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে? যদি তা-ই হয়, তা হলে তারা কোনোভাবেই শুধু পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দায়মুক্তি পেতে পারেন না।

নৈতিকতার প্রশ্ন হোক আর দুর্নীতির প্রশ্ন হোক, ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক হয়ে যাওয়া সাধারণ সম্পাদক ডাকসুরও সাধারণ সম্পাদক। ওই পদেই বা তিনি থাকেন কীভাবে? যদি তিনি স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ান, তা হলে আর কিছু না হোক, ডাকসুর ঐতিহ্যের ঘটিটা ফুটো হয়ে যাবে। সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা নোংরা পানি পড়বে। তা ডাকসু শব্দটির সঙ্গেই বেমানান। এ দেশের আন্দোলন-সংগ্রামে এগিয়ে থাকা নাম ডাকসু। সেখানে এমন একজন জিএস কীভাবে থাকবেনÑ যাকে তার নিজের সংগঠন থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অধিকার হারানো একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ হাজার ছাত্রছাত্রীর প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার রাখে কি!

মানছি, বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দিনে দিনে বাড়ছে। সেটি প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। গণমাধ্যমে যেসব খবর বেরিয়ে আসে, এতে পরিষ্কার এই নৈতিক অবক্ষয় এক গভীর সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে প্রান্তিক জনপদে। নৈতিকতা কাউকে জোর করে শেখানো যায় না। শেখার আগ্রহ থাকতে হয়। তা ছাড়া নৈতিক অবক্ষয়ের আরও একটি বড় কারণ আমাদের সমাজব্যবস্থা। ভোগবাদী সমাজে প্রলোভনের প্রচুর উপকরণ ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ। সাধারণ ছাত্রছাত্রী থেকে ছাত্রনেতা ওই প্রলোভনের হাতছানি এড়াতে পারছেন না। সেটি আরও প্রবল হয়ে গেছে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে। রাব্বানী ডাকসুর জিএস পদে থাকতে পারবেন কিনা, ওই প্রশ্নে জড়তা মেশানো উত্তর এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মুখ থেকে। অনেক গঠনতন্ত্র-টঠনন্ত্রের কথা বলে তিনিও বুঝিয়ে দিলেন, স্বাধীনভাবে কথা বলার সাহস রাখেন না! গঠনতন্ত্রে অনেক কিছু লেখা থাকে। সেটি পড়ে নৈতিকতা প্রচার করলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কোনো উপাচার্যও যদি কোনো অনৈতিক কাজকে সমর্থন করেন, তা হলে পরোক্ষভাবে তিনিও বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যান। দোষী প্রমাণিত হলে চাঁদাবাজদের পাশাপাশি কোনো উপাচার্য কি ছাড় পাবেন? পেতে পারেন? এই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি শুনতে চায় না সমাজ, চায় উত্তর।

এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি। ধন্যবাদ জানাতেই হবে প্রধানমন্ত্রীকে। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, বৈরী সময় আসার আগেই আগাছা পরিষ্কার করা দরকার। সেটি দল থেকে, সরকার থেকে, প্রশাসন থেকে। এর কিছু উদ্যোগ দৃশ্যমান। কিন্তু সব কিছুই প্রধানমন্ত্রীকে করতে হবে কেন? বাকিরা কি শুধু দল আর সরকারের পদ-পদবী উপভোগ করার জন্য? তা হতে পারে না। একজন দেশের সব মানুষের ভাগ্য বদলের দায়িত্ব নেবেন। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। একই দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষার পুরো দায়িত্ব তাকে কাঁধে নিতে হবে! গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সমালোচকরা এটিকে বাঁকা চোখে দেখবেন। বলবেন, একনায়কতন্ত্র! আর সেটি বলার সুযোগ করে দিচ্ছেন তার দলেরই কয়েক ব্যক্তি। তবে এখন তাদের বলা হয়, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ‘কাউওয়া’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা ঢুকে পড়েছেন, তারা অনুপ্রবেশকারী বা কাউওয়া নন, রীতিমতো শকুন। তারা এখন যা করছেন, এতে শুধু আওয়ামী লীগ নামক দলটির ক্ষতি হচ্ছে তা নয়। ক্ষতি হচ্ছে সমাজ, রাষ্ট্র, জনগণ, সবার। আবার তারাও ওই দলটিরই কারও না কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দল ও সমাজে শিকড় গাড়ার চেষ্টা করছেন।

শোভন-রাব্বানীরা শুধু নিজেরা অপকর্ম করেছেন, তা নয়। অন্যদের অপকর্মকেও প্রশ্রয় দিয়েছেন। তা শুধু নীতি-নৈতিকতাবিরোধী নয়, আইনের চোখেও অপরাধ। আর এখন আমরা সাদা চোখে যা দেখছি, তা ছাত্রলীগ নামক ঐতিহ্যবাহী একটি সংগঠনের কঙ্কাল। শিক্ষা-শান্তি-প্রগতিÑ এই তিন শাব্দিক পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রলীগ আদর্শচ্যুত হয়ে ভেঙে পড়ল কি! সেটি শুধু শোভন-রাব্বানীদের কারণে, নাকি তাদের উল্টোপথ চিনিয়ে দেওয়ার কয়েক ব্যক্তিও আছেন পেছনে?

অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

advertisement