advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এবার পদ্মার রেলে নকশা জটিলতা

তাওহীদুল ইসলাম
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১১:৩১
advertisement

পদ্মা রেলসেতুর নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিষেবা সংযোগ স্থানান্তরÑ ইত্যাদি নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। মাটি পরীক্ষার পর সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী নকশা করা হলেও ট্রায়াল পাইলের লোড টেস্ট করতে গিয়ে ত্রুটি ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত ১৫টি ট্রায়াল পাইল নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টির লোড টেস্ট করে মাত্র ৩টি ট্রায়াল পাইল টেস্টে সন্তোষজনক হয়েছে। ফলে ট্রায়াল পাইল সফলভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া আরও ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর বিপরীতে বাজারমূল্য অনুযায়ী অর্থ জমা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বরাবর। অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ, পরিষেবা স্থানান্তর, এসবের বিপরীতে বাড়তি অর্থের সংস্থান, সময় বেড়ে যাওয়া এবং এ কারণে শর্তানুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঝুঁকিÑ এসব কিছু মিলিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে পদ্মা রেলসেতুর নির্মাণকাজ।
প্রসঙ্গত, এর আগে মূল পদ্মা সেতু নির্মাণেও জটিলতা সৃষ্টি হয় পিলারের নকশা নিয়ে যা পরবতী সময়ে পরিবর্তন করা হয়। নদীর তলদেশে মাটির স্তর নরম হওয়ায় পরিকল্পিত স্থানে পিলার স্থাপনে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মূল নদীতে স্থাপিত ৪০টি পিলারের মধ্যে ২৪টিরই পাইলের পুণঃনকশা করতে হয়। একই কারণে চলমান আরও ৮টি পিলারের পাইল ডাইভিংয়ের কাজ বন্ধ রাখা হয়। ফলে ২২টি পিলারের নতুন নকশা করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অন্যতম একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প পদ্মা সেতু

নির্মাণ। প্রাথমিকভাবে শুধু সড়কসেতুর পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে এতে পৃথক রেলপথ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত আসে এবং একসঙ্গে সেতুটির সড়ক ও রেলপথ চালুর ঘোষণা দেয় সরকার। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুন মাসে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা। উদ্বোধনের দিন থেকেই সড়কপথের পাশাপাশি রেলপথ চালু করতে আপাতত এ প্রকল্পের মাওয়া-ভাঙা রেলরুটের কাজ সম্পন্নের পরিকল্পনা সামনে রেখে এগোচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, পদ্মা সেতুর বর্তমান অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। মূল সেতুর ২.১ কিলোমিটার দৃশ্যমান; স্প্যান বসেছে ১৪টি। অন্যদিকে নির্মাণকাজ শুরু করতেই সময় পার হয়েছে পদ্মা রেলসেতুতে। চীনের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন এ কাজের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১৭.১৫ শতাংশ।
রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পদ্মা সেতুতে সড়ক ও রেলপথ যেন একসঙ্গে উদ্বোধন করা যায়, সে চেষ্টা চলছে। পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেলরুটের কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশের কাজ ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। এই ৪২ কিলোমিটার অংশ সম্পন্ন করাটাই বড় টার্গেট বলে মন্ত্রী এদিন জানান।
এদিকে মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রায়াল পাইল সফলভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। তাতে করে প্রকল্প এলাকায় অধিকাংশ পাইলের ডিজাইন এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এর সমাধানে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত প্যানেলের মতামত নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরইসি থেকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এইকম’কে ডিজাইন করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ডিজাইন পর্যালোচনায় অভিমত এসেছে, পাইলের লোড ঠিক রাখতে হলে এরিয়া বাড়াতে হবে। এতে করে সঙ্গত কারণেই প্রকল্প ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। নকশা চূড়ান্তকরণ, অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়ের বিষয়ে করণীয়Ñ ইত্যাদি বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
যদিও পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন এ. চৌধুরী গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ডিজাইন নিয়ে জটিলতা ছিল। এর রিপোর্ট পেয়েছি। সমাধান হয়ে গেছে। আশা করি আর সমস্যা থাকবে না।
এদিকে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের জমি সময়মতো ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিলম্ব হচ্ছে পরিষেবা সংযোগ স্থানান্তরের কাজেও। প্রথমে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর থেকে বিনামূল্যে সরকারি জমি পাওয়া যাবে। কিন্তু সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, ভূমি পেতে হলে এর বিপরীতে বর্তমান বাজারমূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জমা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে। এ কারণে অতিরিক্ত ৪২৮ একর জমি কেনার বিপরীতে টাকা লাগবে নতুন করে। অথচ প্রকল্পের ডিপিপিতে এ অর্থের বরাদ্দ নেই। এ ছাড়া পরিষেবা স্থানান্তরে ১৫০ কোটি টাকার সংস্থান আছে যা অপ্রতুল। এ খাতেও প্রয়োজন আরও অর্থ। প্রকল্পের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে এ বাড়তি অর্থের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত (ফাস্ট ট্র্যাক) পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অতিদ্রুত সম্পন্ন করতে হলে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি শিফটিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা জরুরি। নয়তো একদিকে কাজে বিলম্ব হবে, অন্যদিকে গুনতে হবে অতিরিক্ত অর্থ। কারণ শর্তানুযায়ী জমি বুঝে না পেলে ঠিকাদার ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। এ জন্য ডিপিপি সংশোধনের আগে ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিষেবা স্থানান্তরে ব্যয় বরাদ্দের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের সহায়তা চেয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এতে বলা হয়েছে, আপাতত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যের অনুমতির মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয়ের ৫ শতাংশ খরচের সুযোগ আছে। পরবর্তীকালে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীর সময় অতিরিক্ত পরিমাণ ও ব্যয় সংযোজন করা যেতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ তৈরি করা হবে। পথিমধ্যে থাকবে ১৪টি স্টেশন। রেলপথটি এখন সিঙ্গল লাইন করা হচ্ছে। পুরো পথটি পরবর্তী সময়ে যেন ডাবল লাইন করা যায়, সে সুযোগ রাখা হয়েছে। কারণ ডাবল লাইন ছাড়া পর্যাপ্ত রেল চলাচল সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হবে সেতুর অংশের রেলপথটি নিয়ে। কারণ সেতুতে সিঙ্গল রেললাইন রাখা হয়েছে যা পরবর্তী সময়ে ডাবল করা সম্ভব নয়।
সেতু বিভাগের অধীনে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু। এ জন্য খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় অর্থে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে চললেও সেতুটির রেলপথ নির্মাণকাজ চলছে রেলওয়ের অধীনে। প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকায় নির্মাণ হচ্ছে পদ্মা রেলসংযোগ। এর মধ্যে ৩১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেবে চীন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট ঠিকাদার সিআরইসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় রেলওয়ে।
এ সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, পদ্মা সেতুর ডিজাইনে ডাবল লাইনের সুযোগ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল রেলওয়ের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও হয় বনানী সেতু কর্তৃপক্ষের অফিসে। তখন সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডাবল লাইন সংস্থানে নকশা পাল্টাতে হবে; বাড়াতে হবে সেতুর ধারণক্ষমতা। এতে করে সেতু নির্মাণে বিপুল পরিমাণ ব্যয় বেড়ে যায়। তৎকালীন বাস্তবতায় অর্থ সংস্থানে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সিঙ্গল লাইনই চূড়ান্ত করা হয়।

advertisement