advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চুনোপুঁটি জয়নালের পকেটে রাঘববোয়াল

হামিদ উল্লাহ ও তৈয়ব সুমন, চট্টগ্রাম
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:২৩
advertisement

রোহিঙ্গারা কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাচ্ছে এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা মহলে চলছে আলোচনা। পরে তদন্তে জানা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি চক্র মিলে তিন বছর ধরে রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির কাজ করছিল। আর এতে যুক্ত খোদ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। ইতোমধ্যে এ অভিযোগে ইসির চট্টগ্রামের ডবলমুরিং

কার্যালয়ের অফিস সহকারী জয়নাল আবেদীনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় উপজেলা নির্বাচনী কার্যালয় থেকে ছয়টি ল্যাপটপ চুরি হয়। এর বাইরে ঢাকার

বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যালয় থেকেও চুরি হয় একাধিক ল্যাপটপ। এগুলো দিয়েই তারা তিন বছর ধরে ক্রমাগতভাবে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তার জয়নালের তিন দিন এবং সীমা দাশ ও বিজয় দাশের একদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়–য়া এ তথ্য জানান।

নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত সোমবার সারারাত নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জয়নালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জয়নাল পুলিশকে রোহিঙ্গাদের এনআইডি দেওয়ার ব্যাপারে যে তথ্য দেন তা কর্মকর্তাদের ধারণারও বাইরে ছিল। জয়নাল জানিয়েছেন, নির্বাচনী কার্যালয় থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ ল্যাপটপগুলো চুরি হলেও থানায় একটি জিডি করেই সে সময় দায় সেরেছিল ইসি। পরে সেগুলো অকেজো করার কাজটি আর করা হয়নি। ফলে নির্বাচনী কার্যালয়ের কর্মকর্তারাই এসব ল্যাপটপ নিয়ে ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করে আসছেন। জয়নাল বলেন, এনআইডি নিতে এখন রোহিঙ্গারা রীতিমতো নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে দরদাম করে। যে কর্মকর্তা কম দামে সার্ভারে ঢুকাতে চান, তারা ওই কর্মকর্তার কাছেই যায়।

সিএমপি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ইতোমধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল ও তার সহযোগীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আশা করছি, রিমান্ডে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। পুলিশ সূত্র জানায়, জয়নাল আবেদীন পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি যে ল্যাপটপ ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করতেন, সেটি ঢাকার সাগর নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। এর বাইরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ নির্বাচনী কার্যালয় থেকে চারটি, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাচনী কার্যালয় থেকে একটি এবং মিরসরাই উপজেলা নির্বাচনী কার্যালয় থেকে আরও একটি ল্যাপটপ চুরি হয়েছিল। এগুলো আর উদ্ধার হয়নি। মূলত এসব ল্যাপটপ রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ঢাকার সাগর নামের যে ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি ল্যাপটপটি কিনে নিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনী কার্যালয়ে কাজ করতেন। এখন সাগর বিআরটিএতে কাজ করেন। নির্বাচন কমিশনের বেশির ভাগ ওয়েবসাইট, ল্যাপটপসহ সংবেদনশীল সাইটগুলোর পাসওয়ার্ড সাগরের জানা বলেও দাবি করেন জয়নাল।

পুলিশ সূত্র আরও বলছে, ২০১৬ সাল থেকে নজিব উল্লাহ ও মাস্টার নামে দুই দালাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যালয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করার কাজটি শুরু করে। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বিনিময়ে তারা ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিত। চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার জয়নালের দাবি, তিনি এনআইডি সার্ভারে সংযুক্তির জন্য কেবল ৭ হাজার টাকা পেতেন। অবশিষ্ট টাকা চলে যেত উপরের দিকের কর্মকর্তাদের হাতে। তিনি অফিস সহকারী হয়েও নির্বাচনী কার্যালয়ে বসেই ওই চোরাই ল্যাপটপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এনআইডির কাজ করতেন। তবে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করার কাজটি করতেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা, শুক্রবার ও শনিবারসহ অন্যান্য ছুটির দিনে। এর জন্য বৃহস্পতিবারই জয়নাল থানা নির্বাচনী কার্যালয় থেকে সরকারি ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার ও সিগনেচার প্যাডসহ ভোটার নিবন্ধনের আনুষঙ্গিক সামগ্রী বাসায় নিয়ে যেতেন। এরপর বাসায় বসে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করতেন। জয়নালের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার দক্ষিণ জলদি গ্রামে। বাবার নাম আবদুল মোনাফ। তিনি কী পরিমাণ রোহিঙ্গাকে এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করেছেন তা এখনো জানা যায়নি। তবে গত দুই বছরে তিনি বাঁশখালী পৌর সদরে প্রায় চার কাঠা জমিতে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। বাড়িটি নির্মাণাধীন।

জয়নাল জানিয়েছেন, তিনি ছাড়াও মোস্তফা ফারুক নামে এক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ থানা নির্বাচনী কার্যালয়ে কাজ করার সময় রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করতেন। কোতোয়ালি থানার নির্বাচনী কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখ বিষয়টি জানার পর মোস্তফাকে চাকরিচ্যুত করেন। কিন্তু আবদুল লতিফ শেখ বদলি হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় মোস্তফা আবারও চাকরিতে ফিরে আসেন। এর বাইরে চট্টগ্রামের বন্দর থানার উচ্চমান সহকারী আবুল খায়ের সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গাকে এনআইডি সার্ভারে যুক্ত করার কাজ করেন।

দুদকের অনুসন্ধান : চট্টগ্রাম জেলার সমন্বিত কার্যালয় ২-এর সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দীন বলেন, যেসব ল্যাপটপ চুরি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি। এ ছাড়া নির্বাচন ও পাসপোর্ট অফিস থেকে সন্দেহজনক যেসব ফরম সংগ্রহ করেছি, সেগুলোতে যেসব জন্ম নিবন্ধন, অনলাইন কপি, অন্যান্য কাগজপত্র সংযুক্ত রয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করছি। মনে হচ্ছে, অধিকাংশ ভুয়া সনদ ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে, রোহিঙ্গাদের এনআইডি সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিতে নির্বাচন ভবনের অফিস সহকারীরা ছাড়াও শীর্ষ কর্মকর্তারা জড়িত। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এখনই বলছি না। তবে খুব দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা নির্বাচন ভবনের এনআইডি টেকনেশিয়ান শাহ নূর মূলত সারাদেশ থেকে আসা রোহিঙ্গা এনআইডিগুলো সংযুক্ত করতেন। রোহিঙ্গাদের যে ১১৮টি নিবন্ধিত (অপেক্ষমাণ) ফরম পাওয়া গেছে, তা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এনআইডি সংযোজনের কাজ করার জন্য সারাদেশে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে দিয়ে এ কাজটি করে যান শাহ নুর। চট্টগ্রামের মোস্তফা ফারুক তাদেরই একজন। এর বাইরে কক্সবাজারেও তার লোকজন রয়েছে। কিছু আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও তিনি এ কাজ করিয়েছেন। বর্তমানে শাহ নুর পলাতক আছেন। দুদক তাকে খুঁজছে।

advertisement