advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়নি

রণজিৎ সরকার
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৪:২১
advertisement

রোহিঙ্গা সংকট, আসামের এনআরসি সমস্যা, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতি নিয়ে আমাদের সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন (অব)। তিনি বর্তমানে এসআইপিজিএনএসইউর অনারারি ফেলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রণজিৎ সরকার

 

আমাদের সময় : রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের ভেতরে শুরুটা হয়েছিল কীভাবে?

এম সাখাওয়াত হোসেন : রোহিঙ্গা সংকট এখনকার নয়। অনেক আগের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে তৎকালীন আরাকানে (এখনকার রাখাইন) বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও রোহিঙ্গাদের সংঘাত ঘটে। তখন তারা স্বাধীন একটা আরাকানের জন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১৯৬১ সালে উনু সরকার উত্তর আরাকানে (রাখাইন) মংডু, বুচিডং ও রথিডংয়ের পশ্চিমাংশ নিয়ে ‘মাইয়ু ফ্রন্টিয়ার ডিস্ট্রিক্ট’ গঠনের ঘোষণা দেন। ওই সময় উনু আরাকান স্টেট তৈরির ঘোষণার সঙ্গে অনেকখানি স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসন কায়েম করার উদ্দেশ্যেই ১৯৪৭-৬১ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুজাহিদিনরা অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল তৎকালীন বার্মার উপজাতীয়দের মতো। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মাইয়ু ফ্রন্টিয়ার ডিস্ট্রিক্ট বাতিল হয় এবং রোহিঙ্গাদের উপজাতি গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া রদ করা হয় ১৯৬৪ সালে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা সেই সামরিক সরকার গঠনের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। ফলে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘাত চলতে থাকে। ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একটা অপারেশন নাগামিন নামে অভিযান করল। বাংলাদেশ হওয়ার পর প্রথম রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে থাকে। তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছিল। তখন হয়তো ২৫-৩০ হাজার রোহিঙ্গা এসেছিল। ১৯৯২ সালে দুই দফা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে হয়েছিল বাংলাদেশে। ওই সময়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কিছু সমাধান হলেও ১৯৯২-৯৩ সালে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়া হয়নি। ওপরের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকটে আমাদের জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা নতুন নয়। চার থেকে পাঁচ লাখ লোক বাংলাদেশে চলে আসে। ১৯৯৩ সালে কিছু রোহিঙ্গা ফেরত যায়। তখন কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ২০১২-১৫ সালে জাতিগত দাঙ্গা হয়। ২০১৭ সালে মিয়ানমার আর্মি বা তাদের তৎকালীন সরকার বা এখনকার সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, এদের সমূলে উৎপাটন করে দেশছাড়া করতে হবে। ফলে ২০১৭ সালে ব্যাপক একটা অভিযান চালায়। আরসার কারণ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালানো এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে চলে আসে। আমাদের দেশ ছাড়া আরও দশ-বারোটি দেশে রোহিঙ্গা রয়েছে। তারা এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। রাষ্ট্রহীন একটা জনগোষ্ঠী। সংকট এখনো চলমান।

আমাদের সময় : তা হলে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিনের। এ সংকটের সমাধান এতদিনেও চলমান কেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করলে এদের কি পরিচয় থাকে। সেজন্য রোহিঙ্গাদের ওপর প্রায়ই অত্যাচার হয়। দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। সমস্যার সমাধান কে করবে। সমাধান করার কথা ছিল আন্তর্জাতিক কমিউনিটির। কিন্তু তারা পারেনি। ফলে ২০১৭ সালে মিয়ানমার আবারও এত বড় একটা অভিযান চালিয়ে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে।

আমাদের সময় : আন্তর্জাতিকভাবে সমাধান না করার কারণ?

এম সাখাওয়াত হোসেন : আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মিয়ানমার একটা বড় দেশ। ওই দেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এদের সঙ্গে আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। যদিও সেটা পরে তারা বন্ধ করে দেয়। চীন হলো সবচেয়ে বড় পার্টনার এদের। চীনের সঙ্গে অভিন্ন সীমা রয়েছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে অভিন্ন সীমা রয়েছে। এদের প্রত্যেকের জন্য মিয়ানমার একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। সেই হিসেবে মিয়ানমারের ওপর এমন কোনো আন্তর্জাতিক চাপ আসেনি। ওখানে নির্বাচন হওয়ার ফলে অং সান সু চি আসার পর পশ্চিমা দেশ মনে করল যে, দেশে এখন গণতন্ত্র আসছে। কাজেই তারা গণতন্ত্রের সুবাতাসের অপেক্ষায় ছিল।

আমাদের সময় : বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা অপূরণীয়। এ সমস্যা কীভাবে সমাধান হবে বলে মনে করেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : এ সমস্যার সমাধান এত সহজে হচ্ছে না। হবে না। আমরা এখন যতই অপছন্দ করি বা যাই করি তখন আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু সমস্যা দুটি কারণে সমাধান হচ্ছে না। একটা হচ্ছে যে, আমরা আন্তর্জাতিক চাপ সেভাবে তৈরি করতে পারিনি। প্রথমেই আমরা মনে করেছিলাম দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হবে সে বিশ্বাসে বাংলাদেশ কূটনৈতিক দিকে নজর দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে পাঁচটি দাবি তুলে এলেন, তার মধ্যে আমাদের দেশের কূটনীতিবিদদের কাজ করতে দেখা যায়নি। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে চাপ হওয়ার কথা তা হয়নি, হলে সেই চাপ সৃষ্টি হওয়ার পর অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। আমরাও সেই চাপ ধরে রাখতে পারিনি। যেটা বললাম, আমরা দ্বিপাক্ষিক নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি। যে ধরনের দেশ আমাদের এই সমস্যার সমাধান করতে পারে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হয়তো শিথিল হয়ে আছে। ভারত আমাদের তেমন কোনো সমর্থন করেনি। চীন তো নিজের সুবিধা আগে দেখবে। মিয়ানমারকে বিপদে ফেলে চীন আমাদের জন্য কিছু করবে বলে মনে হয় না। আমরা এখনো এই অবস্থায় আছি।

আমাদের সময় : আপনার একটা লেখার সূত্রে জানতে পারলাম, বাংলাদেশে এখন যে ১১ লাখের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, তাদের ভরণপোষণের ৭৫ শতাংশ এখন বাংলাদেশই বহন করছে বলে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে। আজ দুই বছরের মাথায় এসে রোহিঙ্গা সংকটের নানা ধরনের ডালপালা গজাচ্ছে, এ থেকে উত্তরণের পথ কী?

এম সাখাওয়াত হোসেন : আমাদের আসলে পরিকল্পনার অভাব আছে। একটা পরিকল্পনা উচিত পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে কেমন হবে। বাংলাদেশের জন্য সমস্যা হয়েছে দুই বছরের মাথায়। সেটা আমরা ভাবছি এখন। কিন্তু আসলে তখন থেকেই ভাবা উচিত ছিল। এখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং সেগুলো নিয়ে সমাধানের আলোচনা করা খুবই প্রয়োজন।

আমাদের সময় : বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা কেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : অনিশ্চয়তার কারণ প্রথম বলি এর কোনো সমাধান ছিল না। রোহিঙ্গারা গিয়ে কী করবে। তাদের কি নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এ রকম কোনো আশ্বাস পায়নি তারা। তা হলে তারা বিপদের মুখে যাবে কেন। এই অবস্থায় গেলে তারা থাকবে কোথায়? তাদের বাড়িঘর নেই। নানা কারণে তারা যেতে চায়নি। আর মিয়ানমারকে হয়তো চীন একটু চাপ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনো চাপ আছে। সেজন্য মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ এগুলো দেখে লোক দেখানো কিছুসংখ্যক লোক নিয়ে মনে করেছে আবার দু-তিন বছর কাটিয়ে দেওয়া। তখন তারা বলবে, আমরা তো কিছু লোক নিয়েছি। এটা মিয়ানমারেরই নাটক ছিল। চীনের শক্তিতে মিয়ানমার এমন করছে। আমরা সেটা বুঝতে পারিনি। আমরা এখন অনেককে দোষারোপ করছি। সেটা আসলে কতখানি সত্যি সেটা আমি বলতে পারব না। সেটা সরকার বলতে পারবে।

আমাদের সময় : রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে দাতা সংস্থা, এনজিও, তারা কি কোনো আইনবহির্ভূত কাজ করেছে?

এম সাখাওয়াত হোসেন : এরা আসলে কী করছে, সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এনজিও ব্যুরো তারা তাদের অনুমতি দিয়েছে। তাদের তত্ত্বাবধানেই কাজ করছে। সেখানে অনেক ধরনের গোয়েন্দা সংস্থা তারা ভালো বলতে পারবে। তারা আইনবহির্ভূত কাজ করছে কিনা।

আমাদের সময় : ইতোমধ্যে তো সরকার অপকর্মে লিপ্ত কিছু এনজিওকে প্রত্যাহার করেছে।

এম সাখাওয়াত হোসেন : সরকার যদি তাদের দোষ পেয়ে থাকে, তারা আইনবহির্ভূত কাজ করেছে, হয়তো সে কারণে তাদের প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কোনো রিপোর্ট আমরা দেখিনি। কাজেই আমার পক্ষে এটা বিশেষভাবে বলা কঠিন।

আমাদের সময় : রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ পড়বে। এই সংকটের দ্রুত ও সহজ কোনো সমাধান দেখছি না, এ অবস্থায় অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন।

এম সাখাওয়াত হোসেন : ইতোমধ্যে সরকার ৭৫ শতাংশ টাকা-পয়সা খরচ করছে। এরা যখন দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে অর্থনীতিতে তাদের কোনো ইনপুট নেই। এরা হয়তো নিজের মতো করে ছোট দোকান করে বা নিজেদের মধ্যে ব্যবসা করে। বাংলাদেশ যদি তাদের পেছনে এভাবে টাকা খরচ করতে থাকে তা হলে যে ৭৫ শতাংশ টাকা খরচ হচ্ছে সেই টাকা যদি বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যয় হতো সেটা তো হচ্ছে না। আবার দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের বাজেট থেকে রোহিঙ্গাদের দিতে হবে। প্রথমত, আমাদের দেশ ধনী দেশ নয় যে, টাকা খরচ করতে কোনো সমস্যা হবে না। বড় রকমের সমস্যা হবে। বহিরাগত লোকজনকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো বড় কঠিন। দ্বিতীয়ত, আমাদের স্থানীয়দের ওপর বিশাল একটা চাপ পড়ছে। এখনই স্থানীয় লোকজনের সমস্যা হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে চাপ অবশ্যই পড়বে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

আমাদের সময় : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ বা ইউএনডিপিরই বা ভূমিকা কী হবে এখন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : ভূমিকা তো এখন তারা রাখছে। তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর করা যাবে সেটা আমাদের ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও কী ধরনের সহায়তা চায়। জাতিসংঘ এই দুই বছর থাকার কারণেই তো বাংলাদেশ সরকারের অনেক খরচ কম হয়েছে। আমার মনে হয়, সরকার আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার কথা তুলে ধরতে পেরেছে। তাদের এই সহায়তা না থাকলে আমাদের একক বড় ধরনের সমস্যা হতো।

আমাদের সময় : রোহিঙ্গাদের মধ্যে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ২০১৭ সালে ৭৬টি মামলায় ১৫৯ রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১৮ সালে সংখ্যাটি বেড়ে যথাক্রমে ২০৮ ও ৪১৪ হয়েছে। এ বছরের প্রথম ৭ মাসে ১৮৭টি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ৫১৫ জনকে। অপরাধ প্রবণতা বাড়ার কারণ কী?

এম সাখাওয়াত হোসেন : অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই কারণ হলো ক্যাম্পের ভেতর তাদের তেমন কিছু করার নেই। তেমন কোনো কাজ নেই। একটা ছোট জায়গায় ১১ লাখ মানুষ আছে। যে কোনো জায়গায় এতগুলো মানুষ যদি থাকে তা হলে বিশেষ করে যাদের অনিশ্চিততম ভবিষ্যৎ তাদের ভেতরে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে, শুধু রোহিঙ্গা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে এই অপরাধ প্রবণতা বাড়তে দেখা যায়। এটা আনন্যাচারাল কিছু নয়। তবে আমাদের নজরদারিতে গাফিলতি থাকতে পারে। বাংলাদেশের স্থানীয় লোকজনও রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে। সেজন্য মাদক ব্যবহার বাড়ছে। হিউম্যান ট্রাফিকিং কারা করছে? আমাদের দেশের লোকজন করছে। শুধু রোহিঙ্গারা করছে তা নয়। আমাদের মধ্যেই সমস্যা আছে। নূর মোহাম্মাদ ১৯৯২ সালে আসার পর এত বড় ডাকাত বাহিনী কীভাবে পালন করেছে? এতদিনে এত বড় ডাকাত হলো কী করে? আবার তাকে মেরে ফেলা হলো কেন? ধরা পড়ার পরদিন মারা গেল। তার কি কোনো জবানবন্দি নেওয়া আছে? সে কীভাবে আইডি কার্ড পেল? বিশেষ করে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানাবিধি অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।

আমাদের সময় : দুই বছর পর এসে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কিছুটা কঠোর হচ্ছে সরকার। এ কঠোরতা কতটুকু কার্যকর হবে বলে মনে করেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : আমাদের প্রত্যাবাসন তৎপরতা সঠিক ছিল না। সেজন্য দুই বছর পর এত হতাশা দেখা যাচ্ছে। সরকারের কঠোরতা কতটুকু কার্যকর হয়Ñ সেটা এখন দেখার বিষয়।

আমাদের সময় : আসলে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী?

এম সাখাওয়াত হোসেন : রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ আমি ভালো দেখছি না। কারণ মিয়ানমার এদের সহজে নেবে না। মিয়ানমার যদি গণতান্ত্রিক না হয় তা হলে ফোর্স কীভাবে করা যায় সেটার চিন্তাভাবনা বাংলাদেশকে করতে হবে। অন্য দেশকেও করতে হবে। আর যারা করতে পারবে বাংলাদেশের উচিত হবে তাদের সঙ্গে একটা অবস্থানে যাওয়ার জন্য।

আমাদের সময় : এনআরসি বাংলাদেশের জন্য কতটা দুশ্চিন্তার কারণ?

এম সাখাওয়াত হোসেন : এনআরসিতে যাদের পাওয়া যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশি, বিশেষ করে মুসলিম যারা। এখানে একটা ধর্মীয় ব্যাপার আছে হিন্দু-মুসলিম। মুসলিম যারা আছে তাদের বলা হয় বাংলাদেশে থেকে অনুপ্রবেশকারী। ১৯৭১ সালের পর বিশেষ করে। কিন্তু এনআরসি যেভাবে বলা হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ লোক মুসলিম বাংলাদেশ থেকে এসেছে তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। মাত্র ১৯ লাখ রয়েছে তালিকার বাইরে তাও বিতর্কিত। ৯ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক তারা তো ভারতে থেকে যাবে। আর বাকি ১০ লাখ আইডিডেন্টফাই করা হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা আমরা জানি না। কিন্তু তারা যদি আলটিমেটলি নাগরিকত্ব হারায় তা হলে নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা হয়ে যাবে।

আমাদের সময় : এমনিতেই আমরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা বড় ধরনের সমস্যায় রয়েছি। এবার যদি আসামের এনআরসির ফলে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তা হলে সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের করণীয় কী?

এম সাখাওয়াত হোসেন : রোহিঙ্গা সংকটের মতো যদি পরিস্থিতি হয় তা হলে আমাদের করণীয়Ñ আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হবে। যদি সে রকম কোনো কিছু হয় তা হলে প্রথমে আমাদের বর্ডার ঠেকাতে হবে। আমরা এদের গ্রহণ করতে পারব না। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভারতের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে হবে। ভারতের বড় বড় নেতা বলছেন, পশ্চিম বাংলা থেকেও বাংলাদেশি খেদাবেই। দিল্লি, মুম্বাই সেখান থেকে বেছে বেছে বের করবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বাংলাদেশি বলে বের করার চেষ্টা চলছে। আমাদের এখনই সতর্ক থাকতে হবে। এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কী করব।

আমাদের সময় : সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স এখনো অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণভাবে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারিনি। মাঝে মাঝে তারা হামলা করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা কতটুকু?

এম সাখাওয়াত হোসেন : জঙ্গি হামলার আশঙ্কা সব সময়ে থাকে। কিছুদিন আগে আফগানিস্তান, শ্রীলংকা ও নিউজিল্যান্ডে ভিন্ন আঙ্গিকে হামলা হলো। এদের সংখ্যা শেষ হয়নি। কাজেই এ ধরনে হুমকি যদি থাকে তা হলে বাংলাদেশের জন্য শঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মতৎপরতার কারণে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়েছে বলা যাবে না। আজ পর্যন্ত কোনো কিছু নির্মূল করা যায়নি। এটা একটা আইডোলজিক্যাল যুদ্ধ। মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে। আমরা যদি এদের মতাদর্শের ওপর পাল্টা মতাদর্শ তৈরি করতে না পারি তা হলে শুধু আইনশৃঙ্খলার লোকজন দিয়ে জঙ্গি নির্মূল সম্ভব নয়। দেখতে হবে যে, তারা যেন সংগঠিত না হতে পারে। বড় ধরনের কোনো কিছু ঘটাতে না পারে। আর সঠিকভাবে গোয়েন্দা নজরদারি রাখতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন কোনো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

আমাদের সময় : দেশ থেকে মাদক, নারী নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে যুব সমাজকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে বলে মনে করেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার। বিচারিক ব্যবস্থার মধ্যে সমস্যা হচ্ছে। গুড গভার্নেসের সমস্যা রয়েছে। পুলিশ যে অ্যাকশন নিচ্ছে সেগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমি যদি বলি সমাজের ভেতর যে ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে সেগুলো সরকার দূর করতে চায় তা হলে একটা বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন আছে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন। আর মামলা যত তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হয় ততই ভালো। আইন প্রয়োগ যেন সবার জন্য সমান হয় এবং মাদক নিয়ে অহেতুক সাধারণ মানুষ যেন হয়রানি শিকার না হয় তাও দেখতে হবে।

আমাদের সময় : দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন?

এম সাখাওয়াত হোসেন : যারা প্রভাবশালী তাদের বেশিরভাগই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন যদি আরও কঠিন না হয় তা হলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এই তো কয়েকদিন আগে বালিশ নিয়ে দুর্নীতি, ফরিদপুর হাসপাতালের পর্দা কেনার জন্য কী ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। তার মানে দুর্নীতি সব জায়গায় হচ্ছে। এত বড় বড় দুর্নীতি হচ্ছে তা মেনে নেওয়ার মতো নয়। দুর্নীতি কমবেশি সব দেশে হয় কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত জেঁকে বসেনি। এটা দ্রুত কমাতে হবে।

আমাদের সময় : আমাদের দেশে কি তা হলে মাত্রাতিরিক্তি দুর্নীতি হচ্ছে?

এম সাখাওয়াত হোসেন : মাত্রাতিরিক্ত হচ্ছে কারণ আমাদের দেশে রাজনীতির সংস্কৃতিতে গলদ রয়েছে। রাজনীতি ও দুর্নীতি এক জায়গায় চলে গেছে এবং প্রকৃত রাজনীতিবিদদের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। সৎ ব্যবসা করে মাসে ১ কোটি টাকা উপার্জন করা কঠিন। এই যে ঠিকাদারির ৩৬ কোটি টাকার কাজটা করেছে সেটা তো সে একা করেনি। হয়তো এখানে অসৎ রাজনীতিও জড়িত।

আমাদের সময় : দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এম সাখাওয়াত হোসেন : আমাদের সময়কেও ধন্যবাদ।

advertisement