advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘জন্মদিন এলে আরও বেশি উপলব্ধি হয় সে যদি বেঁচে থাকত’

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৩:২৮
advertisement

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহর। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন ২৭টি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। আজ এই অমর নায়কের ৪৯তম জন্মদিন।

জন্মদিন উপলক্ষে সালমানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তারই তিন নায়িকা- মৌসুমী, শাবনূর ও শাবনাজ

শাবনূর

সালমানকে প্রথম দেখি এফডিসিতে। মৌসুমী আপুর সঙ্গে শুটিং করছিল। আসা-যাওয়ার মধ্যেই দেখা হতো। তবে কথা হতো না। তখন শুনেছি, চলচ্চিত্রে সালমান শাহ নামে নতুন একজন হিরো এসেছে। আনুষ্ঠানিক পরিচয় ‘তুমি আমার’ ছবিতে অভিনয় করার সময়। তখন কাজের কারণে বন্ধুত্ব হয়। আমাদের প্রথম ছবি মুক্তির পর সুপারহিট হয়। এর পর অনেক ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছি আমরা। সালমান থাকবেন আমার স্মৃতিতে। সালমানের কথা অনেক মনে হয়। সালমান যদি বেঁচে থাকত তা হলে সে কী হতো, তা শুধু সে নিজেই জানে। আমি মনে করি, কলকাতার উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেনের জুটিটা যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, আমাদের দুজনকেও সবাই সেভাবেই গ্রহণ করত। বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থাও এখনকার মতো হতো না। রুপালি পর্দায় একসঙ্গে কাজ করার জন্য আমাদের নিয়ে প্রেমের গুজব থাকলেও সালমানকে আমি ভাই ছাড়া আর অন্য কোনো চোখে দেখতাম না। আমি আমার ক্যারিয়ারটা অনেক কষ্ট করে তৈরি করেছি। তিল তিল করে গড়ে তুলেছি। কিছু সংখ্যক লোক গুজব ছড়িয়ে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করেছে। সালমান অনেক বড় মনের মানুষ। বয়সে বড় সবাইকে সে যথেষ্ট সম্মান করত। কোনো অহঙ্কার তার মধ্যে ছিল না। অনেক বেশি ভালো ছিল। সহশিল্পীদের সবার প্রতি খুব আন্তরিক আর কাজপাগল একটা ছেলে ছিল। আমাদের দুজনের বোঝাপড়াটা ছিল চমৎকার। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি তার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর। তার মৃত্যু সংবাদ যখন পাই, তখন আমি বাসায় ছিলাম। হঠাৎ করে কে যেন ফোন করে জানায়, সালমান শাহ মারা গেছেন। আমি উল্টো ধমক দিয়ে বলি, কী বলে এসব! আমার ছোট বোন বাইরে গিয়ে সালমানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হন। আমি তখন পুরোপুরি হতবাক হয়ে যাই। এর পর এফডিসিতে সালমানকে দেখতে যাই। তাকে যদি আবার ফিরে পেতাম তা হলে জানতে চাইতাম তুমি কেন মরে গেলে? তোমার কী কষ্ট ছিল? তুমি কিসের দুঃখে মরে গেলে? তোমার এত কিছু থাকা সত্ত্বেও কেন তুমি মরে গেলে। তোমার তো কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। এসব আমার খুব জানার ইচ্ছা। যদি কখনো সালমানের দেখা পাই, তা হলে আমি তাকে এ কথাগুলো জিজ্ঞেস করব।

শাবনাজ

ঢাকাই সিনেমায় নব্বই দশকের অনন্য এক নায়িকার নাম শাবনাজ। ১৯৯১ সালে ‘চাঁদনী’ সিনেমা দিয়ে তার অভিষেক। টানা কাজ করেছেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ২০টির মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে তিনটি ছবিতে অমর নায়ক সালমান শাহর নায়িকা হয়েছেন। সালমানকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। সালমান প্রসঙ্গে শাবনাজ বলেন, এক কথায় অসাধারণ একজন নায়ক পেয়েছিলাম। আকাশ ছোঁয়া তারকাখ্যাতি থাকলেও তার কোনো অহঙ্কার ছিল না। সবাইকে সম্মান করে কথা বলত। সিনিয়রদের প্রতি তার আচরণ ছিল দারুণ। আমরা সমবয়সী ছিলাম। কিন্তু সিনেমায় ওর আগে এসেছি সেটা সে মূল্যায়ন করত। ও যখন শুনত আমি সেটে এসে গেছি দেরি করত না। সদালাপী, আড্ডাবাজ ছিল। ভীষণ ডানপিটে। শুটিং সেটে সালমান থাকা মানেই হাসি আনন্দ লেগে থাকা। আর নায়ক হিসেবে ও ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে, আধুনিক মানসিকতার একটা ছেলে। ওর স্টাইল, ফ্যাশন সব কিছুই আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য নতুন আর ইউনিক ছিল। চলাফেরা, কথাবার্তা, তাকানো, হাসাÑ সব কিছুতেই একটা উন্নত রুচির ছাপ সে মেইনটেইন করত। এ কারণেই ও অন্য নায়কদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে পেরেছিল।

সালমানের সঙ্গে আমি মায়ের অধিকার, আঞ্জুমান ও আশা ভালোবাসাÑ এ তিনটি ছবিতে অভিনয় করেছি। আমাদের সম্পর্কটা বেশ মজার ছিল। দেবর ভাবির। নাঈমের স্ত্রী হিসেবে সালমান আমাকে ভাবি বলেই ডাকত। সেই সম্মানটাও করত সে। আবার আমরা ভালো বন্ধুও ছিলাম। অনেক মজা করতাম কাজ করতে গিয়ে। সালমানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমার সময়। প্রথমে আমাকে ও নাঈমকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল ছবিটির জন্য। তখন আমাদের জুটি টিনএজদের কাছে খুব পপুলার। কিন্তু সেই সময় আমরা দুজনে লাভ নামের ছবিটা করছিলাম। একে তো শিডিউল দেওয়া ছিল তার ওপর লাভ ও কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবি দুটোর গল্প কাছাকাছি। তাই করা হয়নি। পরে সালমান আর মৌসুমী করল। আরও মজার একটা ব্যাপার হলো যে চাঁদনী ছবি দিয়ে আমার অভিষেক হলো সেটা মৌসুমীর করার কথা ছিল। কোনো কারণে ও করেনি, ভাগ্যচক্রে সেটা দিয়ে আমি শুরু করি। সালমানের সঙ্গে দেখাটা ছিল কেয়ামত থেকে কেয়ামতের সেটে। যেদিন ছবিটার শুটিং শুরু হবে সেদিন সোহানুর রহমান সোহান ভাই ডাকলেন, বললেন আসো। আমি ছবিটা শুরু করছি নতুন একটা জুটি নিয়ে? আমি আর নাঈম ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম। আজ তার জন্মদিন। জন্মদিনে এলে আরও বেশি উপলব্ধি হয় সে যদি বেঁচে থাকত!

মৌসুমী

সালমানের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল ‘তুই’-এর। যখনই দেখা হতো অনেক মজা করতাম আমরা। খুবই আবেগপ্রবণ ছেলে ছিল সে। একটা গল্প শোনাইÑ আমরা এফডিসিতে একটা ছবির শুটিং করছি। সেদিন কোনো কারণে ওর মনে হলো আজকে শুটিং করবে না। আমাকে এসে বলল দোস্ত আজকে শুটিং করব না। তুই শুটিং র্প্যাকআপের ব্যবস্থা কর। আমি বললাম আজকে আমাকে শুটিং করতে হবে। তা না হলে শিডিউল ওলট-পালট হয়ে যাবে। ও আমাকে কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ পর দেখলাম ওয়াশরুম থেকে সালমান বের হচ্ছে। ওর হাত থেকে রক্ত পড়ছে। আমরা সবাই তখন দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। ও বলল ওয়াশরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে হাত কেটে গেছে। পরে বাধ্য হয়েই শুটিং বাতিল করতে হলো। পরে জানলাম সে ব্লেড দিয়ে হাত কেটে ফেলেছে। ওর আবেগের কাছে আমাদেরকে অনেকবার হারতে হয়েছে। আমার এ আবেগপ্রবণ বন্ধুটাকে খুবই মিস করি। চলচ্চিত্রে সালমান শাহর অবদান কখনই ভোলা যাবে না। সালমান শাহ আমাদের চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। এই বন্ধুটার শূন্যতা সব সময় মনে পড়ে।

 

 

advertisement