advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মনে ভয় কী জানি কী হয়

আলী আসিফ শাওন
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৪:৪৩
পদ হারানো ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা শোভন ও রাব্বানী এবং গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ (বাঁ থেকে)
advertisement

ক্ষমতাসীন দলে থেকে পদ-পদবির প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি করা এবং আখের গোছানোর বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান। এরই ধারাবাহিকতায় পদ হারিয়েছেন ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা; গ্রেপ্তার হয়েছেন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। খোদ সরকারপ্রধানের নির্দেশে চলছে এ অভিযান।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকালও বলেছেন, ‘আমি কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। একে একে এ সব ধরতে হবে। আমি ধরব। জানি কঠিন কাজ কিন্তু করব।’ তার বক্তব্যে একটি বার্তা পরিষ্কার- ছাত্রলীগ, যুবলীগ তো বটেই, দুর্নীতি করে থাকলেও মূল দলেরও কেউ রেহাই পাবেন না। তাদেরও একে একে ধরা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে। সরকারপ্রধানের এমন দৃঢ় মনোভাবের কারণে আতঙ্কে আছেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই। বিশেষ করে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, আধিপত্য বিস্তারে ক্যাডারবাহিনী পালার অভিযোগ রয়েছে। কখন কী হয়ে যায়, এ ভয় তাদের অনেকের মনে চেপে বসেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে শুদ্ধি অভিযান। দুর্নীতিবাজদের একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নন তিনি। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে চাঁদাবাজির দায়ে সরিয়ে দেওয়া এবং যুবলীগের নেতাকে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি কেবল শুরু। সরকারপ্রধানের তালিকায় অনেক ‘রাঘববোয়াল’ও আছেন। তাদের বিরুদ্ধেও শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের বিষয়টি আমাদের সময়কে নিশ্চিত করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান মিয়া। জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে আজ শুক্রবার বিকালে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে উচ্চ পর্যায়ের এ বৈঠক খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, যখন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শুরু হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। গণভবন

সূত্রে জানা গেছে, গতকালের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযান অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।

চলমান এ অভিযানের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও গতকাল গণমাধ্যমে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ অভিযান চলছে। ওনার নির্দেশ হচ্ছে- কেউ আইনবহির্ভূত কাজ করে থাকলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে, সে যে দলেরই হোক। আমরা সেটিই করছি, উনি যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন।

সরকারের উচ্চপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্যাসিনোগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালীরই যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা ও মন্ত্রিসভার এক সদস্য; আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর প্রভাবশালী এক সদস্যের যাতায়াত ছিল এসব ক্যাসিনোতে- এমন খবরও পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কানে। রাজধানীর এমন শতাধিক ক্যাসিনো থেকে কামানো টাকার একটি বড় অংশ পেতেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও পেতেন বড় অঙ্কের বখরা।

এর মধ্যে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ইতিপূর্বে যুবলীগের নেতৃত্বে ছিলেন, ক্যাসিনো কারবারে নেপথ্য থেকে তাদেরও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা ও মন্ত্রী, যার ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসায় নেই, অথচ প্রাচুর্যময় জীবনযাপন করেন; কয়েক লাখ টাকা দামের সুট ছাড়া পরেন না, কব্জিতে থাকে বহুমূল্যের হাতঘড়ি- তিনিও নিয়মিত ক্যাসিনো কারবার থেকে বখরা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্যও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আপাতত এসব রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে এসব নেতা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ঝরে পড়তে পারেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা, এর আগেও যিনি সমালোচিত হয়েছেন বিভিন্ন কা-ের জেরে; স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক শীর্ষ নেতাসহ আরও কিছু নেতার নামেও অভিযোগ জমা হয়েছে। একের পর এক প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই অ্যাকশন নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

ক্যাসিনো কারবারের মতো অপকর্মই শুধু নয়, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, অবৈধ প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নানারকম দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আছে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ তালিকায় যুবলীগ ছাড়াও শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারাও রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের পর যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক বিশেষ করে যারা নিকট অতীতে অসাধু কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন। এমন অপরাধীদের গডফাদার হিসেবে এতদিন যারা পরিচিত ছিলেন, সেই প্রভাবশালী নেতারাও এখন তাদের ফোন ধরছেন না। শুধু তাই নয়, তাদের বাড়িঘরের ত্রিসীমানায় না যেতে কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে অভিযুক্তদের। এরই মধ্যে অনিয়ম অপকর্মে এতদিন জড়িত নেতাদের কেউ কেউ গা-ঢাকা দিয়েছেন; কেউবা চিকিৎসার কথা বলে বা অন্য কোনো অজুহাতে দেশের বাইরে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ অভিযান চলছে, চলবে। যুবলীগই শুধু নয়, অন্যান্য সহযোগী সংগঠন, এমনকি আওয়ামী লীগেরও যেসব নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ গ্রেপ্তারপূর্ব নজরদারিতেও রয়েছেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। যে কোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

চলমান অভিযানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে গত বুধবার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। তার বক্তব্য নিয়ে ভীষণ বিব্রত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ক্যাসিনো চলত, সেসব এলাকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করতে হবে। কারণ তারা এতদিন জানার পরও কেন এগুলো ধরেননি। যুবলীগ চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই নাম উদ্ধৃত করে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, ওমর ফারুক চৌধুরীর বক্তব্যে খোদ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। তার এ বক্তব্য সমীচীন হয়নি।

advertisement