advertisement
advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement

ছাত্রদল সিন্ডিকেটের হাতবদল

নজরুল ইসলাম
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৩:১৬
সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন (বামে) ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল
advertisement

দীর্ঘ ২৭ বছর পর কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব এলো। সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচিত হলেও দুই প্রার্থীর বিজয়ে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে দুই সিন্ডিকেট। তবে হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের এক প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। সিন্ডিকেটের বাইরে কয়েকজন যোগ্য প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেনি।

এবার ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে ফজলুর রহমান খোকন ১৮৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ পান ১৭৮ ভোট। সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল ১৩৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকিরুল ইসলাম জাকির ৭৬ ভোট পান। প্রার্থীদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ফল ঘোষণা করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ২৭ বছর আগে সর্বশেষ ১৯৯২ সালে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সভাপতি ও নিখোঁজএম ইলিয়াস আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চিন্তা, বিএনপির যে চিন্তা গণতান্ত্রিক- তা আবার প্রমাণ হলো।’

এবার নয়জন সভাপতি প্রার্থী ও ১৯ জন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ছাত্রদলের ১১৭টি সাংগঠনিক শাখার ৫৩৪ কাউন্সিলরের মধ্যে ৪৮১ জন ভোট দেন।

ফল বিশ্লেষণ ও খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ছাত্রদলের কমিটি গঠনে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বলে পরিচিতদের প্রার্থী এবার নির্বাচিত হতে পারেননি। হাওয়া ভবনের সাবেক এক কর্মকর্তার সমর্থনপুষ্ট সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আমিনুর রহমান আমিন পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে সিলেকশন কমিটি হওয়ায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলো নিজেদের প্রার্থীকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিত। এবার নির্বাচন হওয়ায় ওই সিন্ডিকেটগুলোর প্রার্থীরা ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারেননি।

জানা গেছে, সাবেক ছাত্রনেতা সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু সভাপতি হিসেবে কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে সমর্থন দেন। তারই অনুসারী ফজলুর রহমান খোকনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তাতে তিনি ব্যর্থ হন। ওই অবস্থায় খোকনকে সমর্থন দেন সাবেক ছাত্রনেতা আমীরুল ইসলাম খান আলীম, আবদুল মতিন ও আবু সাঈদ। এ ছাড়া বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী নেতার বলয়ে ছিল এই সিন্ডিকেট। খোকনকে জেতাতে উত্তরবঙ্গের সব নেতা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। বহিস্কৃতসহ বিদ্রোহীদেরও একটি অংশ খোকনের পক্ষে কাজ করেছে।

ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা বলেন, আমরা ধারণা করেছিলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও শ্রাবণ সভাপতি হবে। সভাপতি হিসেবে শ্রাবণ নির্বাচিত না হওয়ার পেছনে কারণ হিসাবে বলেন, খোকন ও শ্রাবণ একই বলয়ের লোক হলেও টুকু শ্রাবণকে সমর্থন দেন। এ ছাড়া বর্তমান যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু পরবর্তী কমিটিতে সভাপতি হওয়ার মূল দাবিদার। যুবদল ও বিএনপির বড় একটি অংশ টুকুকে ঠেকাতে শ্রাবণের বিপক্ষে অবস্থান নেন। শ্রাবণ আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান হওয়ায় কাউন্সিলে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শ্রাবণের বাড়ি যশোর। তার পাশের জেলার ঝিনাইদহের সন্তান হাফিজুর রহমানও সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। তাকে সমর্থন দেন সাবেক ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। শ্রাবণের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হাফিজ। কারণ একই অঞ্চলের দুই প্রার্থী হওয়ায় তাদের আঞ্চলিক ভোট ভাগাভাগি হয়।

সাবেক ছাত্রনেতাদের কয়েকজন বলেন, বগুড়ার সন্তান খোকন। উত্তরবঙ্গের শতাধিক ভোটের বেশিরভাগ তার পক্ষে গেছে। তা ছাড়া টুকুবিরোধীদের ভোটও পেয়েছেন খোকন। অন্য প্রার্থীরা সিন্ডিকেটের বাইরে হওয়ায় প্রতিযোগিতায় আসতে পারেননি।

সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী ইকবাল হোসেন শ্যামলকে সমর্থন দেন সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। হাওয়া ভবনের সাবেক এক কর্মকর্তার আশীর্বাদও ছিল তার ওপর। শাহনেওয়াজকে সমর্থন দেন বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের সাবেক ছাত্রনেতাদের সিন্ডিকেট। জুয়েল হাওলাদারকে সমর্থন দেন নুরুল ইসলাম নয়ন বরিশাল অঞ্চলের সিন্ডিকেট। আমিনুর রহমান আমিনকে সমর্থন দেন আজিজুল বারী হেলাল ও হাওয়া ভবনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা রকিবুল ইসলাম বকুল। জাকিরুল ইসলাম জাকিরকে সমর্থন দেন সাবেক ছাত্রনেতা হাবিবুর রশিদ হাবিব ও রাজীব আহসান। বাকি প্রার্থীদের শক্তিশালী কোনো সিন্ডিকেট ছিল না।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্কাইপের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন।

বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে। অতীতের মতো ঢাউস কমিটি না করে যোগ্য, ত্যাগী ও রাজপথে সক্রিয়দের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হবে। কমিটির আকার ১৫১ সদস্যের বেশি হবে না বলে ওই নেতা জানান। কাউন্সিলে পরাজিত প্রার্থীদেরও কমিটিতে রাখা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রদলের কাউন্সিলের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফজলুল হক মিলন বলেন, ভোটের মাধ্যমে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনে আবারও উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতা নিপুণ রায় চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে যে গণতন্ত্র চালু করেছেন তা সারাদেশের মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

জানতে চাইলে ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন আমাদের সময়কে বলেন, কাউন্সিলররা আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা খুবই চ্যালেঞ্জিং। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করব।

সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, হলগুলোয় সব সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিতে আমরা ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।

ছাত্রদলের চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র তৈরির উদ্যোগ

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় স্কাইপের মাধ্যমে ছাত্রদলের কাউন্সিলে দায়িত্বপালন করা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ছাত্রদলের কাউন্সিল সফলভাবে শেষ করায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ধন্যবাদ দেন তারেক। এক নেতা বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছাত্রদলের একটি পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরির চিন্তা করছেন। আমাদেরও বলেছেন সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের একটি গঠনতন্ত্র কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবতে। আমরা এখন থেকে এই কাজে মনোনিবেশ করব।

advertisement