advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গণপূর্তের টেন্ডারে শামীমই শেষ কথা

হাবিব রহমান
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১১:৫৪
যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জিকে শামীমকে গতকাল ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয় - আমাদের সময়
advertisement

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারবাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম। গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার তার কথার বাইরে কেউ ভাবতেও পারতেন না। এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তিনি নিজের পেশিশক্তি, টাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতেন। এ টেন্ডারবাজিতে তিনি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন গণপূর্ত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত ২০ কর্মকর্তাকে। যারা বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল শনিবার জিকে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জিকে শামীম টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুলেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। গণপূর্তসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে কীভাবে টাকার ভাগ যেত তার বর্ণনাও দিয়েছেন। নিজের অঢেল সম্পদের বিবরণও দিয়েছেন তিনি। কীভাবে সরকারি বড় বড় টেন্ডারে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই তথ্যও অকপটে স্বীকার করেছেন।

জিকে শামীম ঢাকায় নিজের ৫টি বহুতল আলিশান বাড়ি থাকার তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে নিকেতনে দুটি, বাসাবোয় দুটি ও বনানীতে একটি। কিন্তু এর কোনোটিতেই থাকেন না তিনি। থাকার জন্য অন্য বাড়ি রয়েছে। তার নিরাপত্তায় ছিল বিশেষ টিম। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ, ৯টি ব্যাংক হিসাব, বিপুল পরিমাণ স্থায়ী আমানতের তথ্য দিয়েছেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, জিকে শামীম অনেক আগে থেকেই টেন্ডারবাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও বড় বড় টেন্ডারের কাজ পেয়েছেন তিনি। তখন তিনি বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে রাতারাতি নিজের অবস্থান পাল্টে ফেলেন। পদ নেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। ঘাটে ঘাটে টাকা ছিটিয়ে নিজের আধিপত্য অব্যাহত রাখেন।

গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের সঙ্গে গভীর সখ্য রয়েছে তার। এ জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করার তথ্য দিয়েছেন তিনি। গণপূর্ত বিভাগের শীর্ষপর্যায়ের সাবেক ২০ কর্মকর্তা বর্তমানে শামীমের মালিকানাধীন জিকেবি প্রাইভেট লিমিটেডে কর্মরত রয়েছেন। ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতনে কর্মরত এসব কর্মকর্তার দৃশ্যত তেমন কোনো কাজ নেই। সাবেক এই কর্মকর্তারা একটু ভিন্নভাবে কাজ করে দিতেন। গণপূর্তসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বড় কর্তা ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে এ কর্মকর্তারা জিকে শামীমের পক্ষে মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন।

নিকেতনের কার্যালয়ে অভিযান চালানোর সময় জিকে শামীম ১০ কোটি টাকা নিয়ে অভিযান বন্ধ করতে এক কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানান। ওই অভিযানে থাকা একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, অভিযানের শুরুতেই জিকে শামীম বলেন, কত টাকা হলে অভিযান বন্ধ হবে। কিন্তু আভিযানিক দলের দলনেতার দৃঢ়তা দেখে ধূর্ত শামীম বুঝে ফেলেন টাকা দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি পকেটে কয়েকটি টাকার বান্ডিল পুরে নিচ্ছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করতে তিনি জানান, কিছু টাকা সঙ্গে নিতে চান তিনি। কয়েক লাখ টাকার বান্ডিল তার কাছে কিছু টাকা শুনে অবাক হন উপস্থিত সবাই! তবে আইনি সুযোগ না থাকায় র‌্যাব সদস্যরা তাকে টাকা বহন করতে দেননি।

র‌্যাব সূত্র জানায়, অভিযানে জিকে শামীমের অফিসে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক টাকার বান্ডিল। গুনে কুল পাচ্ছিলেন না কর্মকর্তারা। গণনা শেষে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বস্তায় ভরার নির্দেশ দিলে বেঁকে বসেন শামীম। এ সময় শামীম বলতে থাকেন, ‘আরে স্যার টাকার একটা ইজ্জত আছে না। টাকা কেন বস্তায় ভরবেন? আমার কাছে বড় বড় সুন্দর ব্যাগ আছে।’ পরে শামীম একটি ব্যাগ বের করে দিলে সেটিতে ভরে টাকা নিয়ে যান র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম আমাদের সময়কে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে র‌্যাবের এ অভিযান চলমান থাকবে।

গত শুক্রবার রাজধানীর নিকেতনে নিজের কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও এফডিআরসহ গ্রেপ্তার করা হয় জিকে শামীমকে। তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং, অস্ত্র ও মাদক আইনে তিনটি মামলা করে র‌্যাব। এর মধ্যে গতকাল অস্ত্র ও মাদকের মামলায় পাঁচ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদা আক্তার। অস্ত্র মামলায় শামীমের সাত দেহরক্ষীও আসামি। তাদের একই আদালত চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

দেহরক্ষীরা হলেনÑ দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, কামাল হোসেন, সামছাদ হোসেন ও আমিনুল ইসলাম।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার ওসি আমিনুল ইসলাম অস্ত্র মামলায় শামীমসহ তার সাত দেহরক্ষীর সাত দিন করে এবং চার বোতল বিদেশি মদ উদ্ধারের মামলায় শামীমের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আজাদ রহমান ও হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে শুনানি করেন। আসামিপক্ষে আইনজীবী আব্দুর রহমান হাওলাদার আসামিদের রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। ওই সময় তার সঙ্গে আরও ২০-২৫ আইনজীবী ছিলেন।

শুনানিতে হাওলাদার বলেন, বর্তমানে টেন্ডারবাজির কোনো সুযোগ নেই। শামীম এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার ২০টি প্রকল্পের কাজ করছেন। এর মধ্যে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের ৪০০ কোটি টাকার, এনবিআর হেডকোয়ার্টারের ৩১৯ কোটি টাকার, সচিবালয়ে কেবিনেট ভবন নির্মাণের ৩২৭ কোটি টাকার কাজ উল্লেখযোগ্য। এসব কাজ টেন্ডারবাজির মাধ্যমে হয় না। তিনি ৫ ওয়াক্ত নামজ পড়েন। মদ নিজে কখনই ছুঁয়ে দেখেন না।

 

advertisement