advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্থগিতাদেশের সুযোগে বসছে জুয়ার আসর

কবির হোসেন
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:১০
advertisement

রাজধানীসহ সারাদেশের ক্লাবগুলোয় জুয়ার আসর বসানো দেশের সংবিধান ও আইন পরিপন্থী এবং দ-নীয় অপরাধও। এর পরও আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে রিট মামলার মাধ্যমে আদালতের আদেশ নিয়ে, কখনোবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘ম্যানেজ’ করে, আবার কখনো বেআইনিভাবেই ক্লাবগুলো নিয়মিত এ ধরনের জুয়ার আসর বসিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুয়াখেলা বন্ধের দাবিতে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাবসহ দেশের ১৩টি নামিদামি ক্লাবে সব ধরনের জুয়াখেলার ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। পরবর্তী সময়ে ঢাকা ক্লাবের এক আবেদনে হাইকোর্টের ওই আদেশ দুই মাসের জন্য স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে হাইকোর্টের জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিগত ৩৩ মাসেও হাইকোর্টে ওই রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে দুই মাসের জন্য নেওয়া স্থগিতাদেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জুয়ার আসর বসিয়ে যাচ্ছে দেশের নামিদামি ক্লাবগুলো।

জানতে চাইলে ১৩ ক্লাবে জুয়া খেলা বন্ধের দাবিতে রিটের পক্ষের আইনজীবী রেদোয়ান আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, হাইকোর্ট ১৩টি ক্লাবে জুয়াখেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ দুমাসের জন্য স্থগিত করে এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করতে বলে। কিন্তু হাইকোর্টে এ রিটের নিষ্পত্তি হয়নি। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্লাবগুলোয় জুয়া খেলা চলছে। অবকাশের পর এ রিটের চূড়ান্ত শুনানির উদ্যোগ নেব, জানান তিনি।

এদিকে ঢাকা ক্লাব ও উত্তরা ক্লাবের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আপিল বিভাগের আদেশের পরে হাইকোর্ট বেঞ্চটি ভেঙে যায়। এ কারণে রুলটি নিষ্পত্তি হয়নি। আর রুল নিষ্পত্তি না হওয়ায় আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ এখনো বহাল রয়েছে।

জানা গেছে, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সামিউল হক ও রোকন উদ্দিন মো. ফারুক বাদী হয়ে ১৩টি ক্লাবে জুয়াখেলা বন্ধের দাবিতে ২০১৬ সালে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেন। তার আবেদনে বলা হয়, ১৮৬৭ সালের ‘বঙ্গীয় প্রকাশ্য পাবলিক জুয়া আইন’-এর তিন ধারায় বলা আছে, এ ধরনের জুয়াখেলা দ-নীয় অপরাধ। যে কোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনো সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদ- বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারেন। এ রকম কোনো ঘরে তাস, পাশা, কাউন্টার বা যে কোনো সরঞ্জামসহ কোনো ব্যক্তিকে ক্রীড়ারত (জ–য়ারত) বা উপস্থিত দেখতে পাওয়া গেলে তিনি এক মাস পর্যন্ত কারাদ- অথবা ১০০ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারেন। পুলিশ জুয়ার সামগ্রীর খোঁজে যে কোনো সময় তল্লাশি চালাতে পারবে বলেও আইনে উল্লেখ করা হয়।

আইন থাকা সত্ত্বেও ক্লাবগুলো তাদের চত্বরে প্রতিনিয়ত এ ধরনের জুয়াখেলা চালিয়ে যাচ্ছে। রিট আবেদনে আরও বলা হয়, সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সংবিধানের এ বিধান লঙ্ঘন করে ক্লাবগুলোয় জুয়াখেলা চলছে। এ ছাড়া হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ এসব যুক্তিতে জুয়াখেলার অনুমতি চেয়ে ২০১৩ সালে করা একটি রিট খারিজ করে রায় দিয়েছেন। ওই রায়ের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ জুয়া খেলতে পারছেন না। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই ধনী শ্রেণি টাকার বিনিময়ে ক্লাবগুলোয় জুয়াখেলা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ রিটের শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ১৩টি ক্লাবে হাউজি, ডাইস, কার্ড খেলাসহ টাকার বিনিময়ে যে কোনো ধরনের জুয়াখেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। একই সঙ্গে ক্লাবগুলোয় এ ধরনের জুয়াখেলা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং জুয়াখেলার আয়োজনকারীদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ ১৩টি ক্লাব হচ্ছে- ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, বনানী ক্লাব, ধানম-ি ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব ঢাকা, ঢাকা লেডিস ক্লাব, ক্যাডেট কলেজ ক্লাব, চিটাগাং ক্লাব, চিটাগাং সিনিয়রস ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, খুলনা ক্লাব ও সিলেট ক্লাব।

এ আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা ক্লাব ও উত্তরা ক্লাব আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে ঢাকা ক্লাবসহ ১৩টি ক্লাবে অর্থের বিনিময়ে হাউজি, ডাইস, তাস ও যে কোনো ধরনের জুয়াখেলায় হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা দুমাসের জন্য স্থগিত করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে হাইকোর্টের জারি করা রুল এ দুমাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু গত ৩৩ মাসেও তা নিষ্পত্তি হয়নি। এর সুযোগ নিয়ে ক্লাবগুলোতে জুয়ার আসর বসতে থাকে।

advertisement