advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ক্ষমতার ঝাঁজের দুর্গ -ড.জোবাইদা নাসরীন

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:১১
advertisement

দেশ এখন বড় ধরনের ভূমিকম্পে কাঁপছে। এই ভূমিকম্প প্রাকৃতিক ভূমিকম্প নয়। এই কম্পন দুর্নীতির, অনিয়মের, ধরপাকড়ের। সবাই ক্ষমতার এমনি জাল পেতেছিল যে, ভেবেছে কখনো সেই জাল ছিঁড়ে যাবে না, কারণ সবাই ক্ষমতাসীন দলের নেতা। কিন্তু সেখানে এমন বজ্রপাত হবে কেউ ভাবতেই পারেনি। মতিঝিল ও গুলিস্তানের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো ও জুয়ার আসরে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হবে তা ঘুণাক্ষরেও কেউ কল্পনা করেনি। আর এসবের মধ্যে চোখ বড় বড় করে আবিষ্কার করার মতো দেশের মানুষরা জানল এতদিন ধরে বিভিন্ন মন্ত্রী বারবার বলে আসছেন, দেশ এখন প্যারিস-সিঙ্গাপুরের মতো। আসলেই হয়তো তাই, অন্তত ঢাকা শহরজুড়ে এত ছোট-বড় ক্যাসিনোর আখড়ার খবর, দেশকে ইউরোপ-আমিরেকার অঞ্চলভুক্তই মনে হচ্ছে। তাই মন্ত্রীদের এতদিন করা দাবির মাজেজা এখনই জনগণ বুঝতে পারছে। তবে এই ক্যাসিনোগুলোর মালিক কোনো সাধারণ জনগণ নয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে সরকারদলীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ক্লাবপাড়াগুলোতে বাধাবিঘ্নহীনভাবে জমজমাট জুয়ার আসর বসত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সব জানতেন। যেহেতু সরকার সব সময় চুপ ছিল তাই তারাও নীরব ছিলেন। আর সরকারের ইঙ্গিত ছাড়া সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিপক্ষে দাঁড়ানো যে এত সহজ নয়, তা সবাই বোঝে।

এটা সবারই জানা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুয়ার আসর চলে, সেখানে ক্যাসিনোকেন্দ্রিক হয় রমরমা ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাসিনোর জায়গা হিসেবে পরিচিত লাসভেগাস। কিন্তু বাংলাদেশেও যে লাসভেগাসের ছোট সংস্করণ হয়ে গেছে সেটি কারও জানা ছিল না। এবার রাজধানী ঢাকার অন্তত ৬০ স্পটে অবৈধ ক্যাসিনো (জুয়ার আসর) ব্যবসা চলছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দাসূত্র। শুধু দেশের ব্যবসায়ীই নয়, এসব ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য নেপাল, থাইল্যান্ডসহ চারটি দেশ থেকে প্রশিক্ষিতদের আনা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্যাসিনো ব্যবসার ইতিহাস খুঁড়ে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজধানীতে অর্ধশতাধিক ক্যাসিনো চালু হয়েছিল। তার সবগুলোই নিয়ন্ত্রণ করত যুবদল। সেনাসমর্থিত সরকারের সময় এগুলো বন্ধ করা হলেও ক্ষমতা বদলের পর এখন ক্যাসিনোগুলো যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং দলীয় ক্ষমতার বিস্তার করে যুবলীগ নেতারা ক্যাসিনো সাম্রাজ্য বিস্তার করে। ধরা পড়ার পর যুবলীগ নেতা পুলিশকে বলেছেন, ‘পুলিশ এতদিন কী করেছে?’ এখন প্রশ্ন হলো ওপরের নির্দেশ ছাড়া যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে কতটা সফলভাবে দাঁড়াতে পারত পুলিশ প্রশাসন?

শুধু ক্যাসিনো নিয়েই নয়, বর্তমান সরকারের বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে উপাচার্য পদত্যাগের আন্দোলন। গত মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত টাকা ভাগাভাগির খবর থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। সেটি আস্তে আস্তে ডালপালা মেলে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়Ñ উপাচার্যের মধ্যস্থতায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়। এর পর উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে আন্দোলনে নামেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের একপর্যায়ে উপাচার্য উন্নয়ন কাজ থেকে কয়েক শতাংশ চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন ছ্ত্রালীগের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। আগে থেকেই তাদের প্রতি নানা কারণে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রীও সম্ভবত এই অভিযোগের পর আর দেরি করেননি তাদের সরাতে। ঘটনাটি সেখানে শেষ হয়নি। দুপক্ষের একে অপরের প্রতি চ্যালেঞ্জ এবং ফোনালাপের অডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে।

গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) চলছে অচলাবস্থা। সেখানে প্রশাসনের মনমতো কিছু না হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্টের অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীদের ওপর জারি করা হচ্ছে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের নোটিশ! কেবল গত এক বছরেই অন্তত ২৭ শিক্ষার্থীকে এ ধরনের বহিষ্কারের নোটিশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদিও নোটিশপ্রাপ্ত সবার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে না হয়তো, তবে এসব নোটিশ শিক্ষার্থীদের প্রচ- ভয়ভীতি সৃষ্টি করেছে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তা-চেতনায় প্রচ- আঘাত করছে। অবস্থা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা কোনোভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করতে চায়। ক্যালেন্ডারের হিসাবে সবে বছরের আট মাস গেলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে রেকর্ড করে ফেলেছে শোকজ জারির। ইতোমধ্যেই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কারের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এদের সবার ক্ষেত্রে বহিষ্কার কার্যকর হয়নি। মুচলেকা দিয়ে, পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে বা ক্ষমা চেয়ে অনেকেই এই বহিষ্কার এড়াতে পেরেছেন, তবে প্রচ- মানসিক টানাপড়েন নিয়ে। মানববন্ধনে সরকার ও প্রশাসনবিরোধী বক্তব্য, ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন বক্তব্য প্রদান ও র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ তুলেছে প্রশাসন।

অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) গত ছয় মাসে সাত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বহিষ্কৃত ওই শিক্ষার্থীদের ‘অপরাধ’, ফেসবুকে বিরুদ্ধ মত জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তারা। এর পর উপাচার্যের কাছে ক্ষমা চাওয়ায় ও অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিন শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হলেও বাকি চারজনেরটা বহাল থাকে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া ও উপাচার্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার অভিযোগ এনে ১১ সেপ্টেম্বর আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তিনি দ্য ডেইলি সান পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। জিনিয়াকে বহিষ্কারের ব্যাখ্যা দিয়ে উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ফেসবুক ও ই-মেইল আইডি হ্যাক করেছেন। এ ছাড়া তিনি ভর্তি পরীক্ষার ওয়েবসাইট হ্যাক করে পরীক্ষা বানচালের ষড়যন্ত্র করেছেন।’ ওই ছাত্রী দুবার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছেন বলেও মিডিয়াকে জানান উপাচার্য। কিন্তু বহিষ্কৃৃত ছাত্রী জিনিয়া বলেন, ‘আমাকে যখন বহিষ্কারের চিঠি দেওয়া হয় সেখানে লেখা হয়েছে আমি উপাচার্যের ফেসবুক হ্যাক করার হুমকি দিয়েছি। কিন্তু আজ বলা হচ্ছে আমি হ্যাক করেছি। তা হলে কোনটা ঠিক। ফেসবুক কীভাবে হ্যাক করতে হয় সেটা তো আমার জানাই নেই। এই শিক্ষার্থী বলেন, আমাকে উপাচার্য স্যার ক্ষমা চাইতে বলেছেন। কিন্তু আমি তো কোনো অপরাধই করিনি। ক্ষমা চাইব কেন?’ (সূত্র একটি জাতীয় দৈনিক, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। পরে মিডিয়ার চাপে জিনিয়ার বিহষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদত্যাগের দাবিতে বুধবার রাত থেকে আন্দোলন চলছে। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিকাল থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি) বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে হল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার সকালেই এই আদেশ জারি করা হয়েছে।

অনিয়ম এবং আন্দোলনের আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও পিছিয়ে নেই। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের আট নেতার ছাত্রত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং তারা সবাই ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার পাট চুকিয়েছেন আগেই। কিন্তু মনে সাধ, ডাকসুর নেতা হবেন। তাদের এই সাধের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যোগ্যতার মানদ-ও পাল্টাতে থাকেন এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বাইরে সান্ধ্যকালীন শিক্ষার্থীদেরও নির্বাচন করার যোগ্য বলে ঘোষণা দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে জেঁকে থাকা সান্ধ্যকোর্সগুলোই ভরসা হয়ে ওঠে। ভর্তির নীতিমালা অনুযায়ী, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ওই প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া যায়। কিন্তু নেতাদের জন্য কিসের নীতিমালা? পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই তারা ছাত্র হয়ে গেছেন। তাদের এই অনিয়মে সহযোগিতা করেছেন সেই অনুষদের ডিন। উপাচার্যও হয়তো দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

দেখা যাচ্ছে, একদল ক্ষমতার দোর্দ- প্রতাপে একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে। আবার ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান তো নয়ই বরং তাদের অন্যায়, নিপীড়নকে আশকারা দেওয়াই উপাচার্যদের অন্যতম প্রশাসনিক কাজ হয়ে ওঠে। কারণ তাদের গদির স্থায়িত্ব কিংবা নড়বড়ে অবস্থা অনেকাংশে তাদের খাতির-যত্নআত্তির ওপর নির্ভর করে। আর এই লেনদেন এবং আশকারাসহ অন্যান্য ক্ষমতার অনুমোদন এই ছাত্র নেতাদের ‘বেসামাল’ করে তুলছে। প্রধানমন্ত্রীর হুকুম ছাড়া কেউ এগোচ্ছে না এসব দমাতে। সামনের চিত্রগুলো আর কী কী হতে পারে?

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement