advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নদী বাঁচলে বাঁচবে পরিবেশ -ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও আসমা আলম আঁখি

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:১১
advertisement

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো দিনে দিনে তার নাব্যতা হারাচ্ছে, হারিয়ে ফেলছে তার গতিপথ। দখল হয়ে যাচ্ছে নদী, শিকার হচ্ছে ভয়াবহ দূষণের। বাংলাদেশের নদীর আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ তরল ও কঠিন বর্জ্য। এসব বর্জ্যে মিশে আছে অ্যাসিড ও ভারী ধাতুর মতো জটিল রাসায়নিক। এতে নদীর পানি এবং নদীকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণীজীবন ধ্বংসের পথে।

প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ চতুর্থ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস পালন করা হয়। নদী, পানি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নদী দখল, দূষণ ও পানিবিষয়ক সচেতনতা ও কর্মসূচি নিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে। ১৯৮০ সালে নদীর কর্মী মার্ক অ্যাঞ্জেলোর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো কানাডায় নদী দিবস পালিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ ২০০৫ সালে দিবসটি ‘এনডোর্স বা অনুসমর্থন’ করে। বাংলাদেশে প্রথম ২০১০ সালে ‘রিভারাইন পিপল’-এর উদ্যোগে দিবসটি প্রথম পালিত হয় এবং ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা, বুড়িগঙ্গা রিভার কিপারসহ অন্যান্য সংগঠন দিবসটি পালনে যোগ দেয়।

আমাদের দেশে নদীগুলোর সত্তা ধ্বংস করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাধর মানুষ। নদীর পাড় দখল গড়ে তুলছে কারখানা, আবাসিক ভবন, ইট, বালি, পাথরের আড়ত ইত্যাদি। দখলদারদের বড় কৌশল হচ্ছে নদীর পাড়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, পরবর্তী সময়ে এটিকে ব্যবহার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা। দখলদারদের ওপর উচ্চ আদালতে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তার পরোয়া করছে না।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ, ঢাকার চারপাশে চার নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং শীতলক্ষ্যার দূষণ ও নদীর তীরে স্থাপনা নির্মাণে বন্ধ ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে উচ্চ আদালতে একটি জনস্বার্থমূলক রিট মামলা করেন। এ মামলার এক রিটের চূড়ান্ত শুনানিতে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়, নদী রক্ষা কমিশনকে তুরাগ নদীসহ দেশের সব নদ-নদী দূষণ-দখল মুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নিমিত্তে আইনগতভাবে অভিভাবক ঘোষণা করা হলো। সব নদ-নদীর দূষণ মুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ-চলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কাজ করবে। এ ছাড়া হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’, ‘আইনি সত্ত্বা’ ও ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে ভূষিত করেছেন।

এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নদীর পানি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত। নদীর পানি দূষণের মূল উৎস শিল্পবর্জ্য। প্রাচীনকাল থেকে নদী আমাদের দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতির মূল উৎস, কিন্তু আমরা বারবার নদীর সুস্থতার কথা ভুলে যাই। নিজ খেয়ালখুশিমতো দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছি নদীর শরীরে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে ঢাকার আশপাশের পাঁচটি নদী (তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বালু) পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ১৯টি স্থানের নমুনা পানি সংগ্রহ করে ঞবসঢ়বৎধঃঁৎব, ঢ়ঐ, উঙ, ঞউঝ, ঊঈ ও ঝধষরহরঃু পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পানির কয়েকটিতে আদর্শ মানমাত্রার সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা ছিল। কারণ হিসেবে যেসব বিষয় বেরিয়ে এসেছে তার প্রধানটি হলো শিল্পদূষণ, এ ছাড়া রয়েছে পৌর বর্জ্যরে উপস্থিতি, কৃষি কার্যক্রমের ফলে আগত রাসায়নিক এবং নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনমানুষের অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও গৃহস্থালি বর্জ্য, নদী দখল করে গবাদিপশুর বাসস্থান নির্মাণ, নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য ইটের ভাটা থেকে চুইয়ে আসা পানি, নৌযান থেকে নির্গত ইঞ্জিনের তেল ইত্যাদি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধন ২০১০)-এর ধারা ৬ (ঙ) অনুযায়ী, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছু থাকুক না কেন, জলাধার হিসাবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনভাবে শ্রেণী পরিবর্তন করা যাইবে না’ এই আইন লঙ্ঘনে ‘প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে অনধিক ২ বছর কারদ- বা অনধিক ২ লক্ষ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-; পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন ২ বছর, অনধিক ১০ বছর কারাদ- বা অন্যূন ২ লক্ষ টাকা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-।’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গত ২৯ জুলাই ৪২ হাজার ৪২৩ জন নদী দখলদারের তালিকা প্রকাশ করেছে। যদিও পরিবেশবাদীরা একে অসম্পূর্ণ তালিকা বলেছেন। তার পরও এই তালিকা অনুযায়ী যদি দখল উচ্ছেদ করা যায় ও দখলদারদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে দেশের নদীগুলো কিছুটা হলেও দখলমুক্ত হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগের ফলে দখলদারিত্ব কমে আসবে।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও আসমা আলম আঁখি: গবেষণা শিক্ষার্থী

advertisement