advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঋণখেলাপিদের গণছাড়ের আগে ব্যাপক ছাড়

হারুন-অর-রশিদ
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:১২
advertisement

গণছাড়ের আওতায় সুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি। কিন্তু এর আগেই বিশেষ ছাড়ে ব্যাপক হারে সুবিধা গ্রহণ করছেন ঋণখেলাপিরা। চলতি বছরের মাত্র ছয় মাসেই ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে শেষ তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) পুনঃতফসিল হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাসে যে পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে, তা ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের পুরো বছরের তুলনায় অনেক বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে এবং প্রভাবশালী গ্রাহকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলের হিড়িক শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে। আর ২০১৯ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে মাত্র তিন মাসেই পুনঃতফসিল করেছে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ১৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এ ছাড়া ২০১৮ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি পুনঃতফসিলের যে হিড়িক পড়েছে, তা বিগত যে কোনো বছরের তুলনায় কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাবে।

ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পুনঃতফসিল করে ৫ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) পুনঃতফসিল করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে পুনঃতফসিল হয়েছে তিনগুণেরও বেশি খেলাপি ঋণ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেশি ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এ ছাড়া খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত এবি ব্যাংক চতুর্থ সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। আর সরকারি খাতের অগ্রণী ব্যাংক পুনঃতফসিল করেছে ৯০৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ওয়ান ব্যাংক ২৯৮ কোটি, ব্র্যাক ২৭৪ কোটি, প্রিমিয়ার ২২০ কোটি ও পদ্মা ব্যাংক মাত্র তিন মাসেই ২১৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে।

এদিকে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্দেশ্য ২০১৪ সাল থেকেই পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে; কিন্তু এতেও কমছে না খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের ছয় মাসে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। এর পরও এই ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। জুনে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে যা ছিল ৯৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা।

নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই বলেছিলেন, এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না। কীভাবে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যায়, সে জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সুপারিশে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ১৬ মে ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ শিরোনামে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। ওই সার্কুলারে যে কোনো অঙ্কের ঋণখেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ নবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই সময় বলা হয়েছিল, আগ্রহীদের সার্কুলার জারির ৯০ দিনের মধ্যে এ সুবিধা পেতে আবেদন করতে হবে। কিন্তু উচ্চ আদালতে রিট করায় এটি কার্যকরের ওপর প্রথমে স্থগিত করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ৮ আগস্ট এক সার্কুলার দিয়ে বলা হয়, এ বিশেষ সুবিধা পেতে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন গ্রাহকরা। কিন্তু উচ্চ আদালতে আবার এ বিষয়ে রিট করায় গত মঙ্গলবার আবেদনের সময়সীমা ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী এ বিশেষ নীতিমালার আওতায় সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণগ্রহীতাদের অনুকূলে কোনো নতুন ঋণ সুবিধা প্রদান করা যাবে না।

খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি সরকারি ব্যাংকে। একাধিক সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ থেকে লাভের দরকার নেই। যে কোনো উপায়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা গেলে সরকারি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা উন্নত হবে। তাই আমরা চেষ্টা করছি ছাড় গ্রহণ করে যেন খেলাপিরা তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করে নেয়। এ জন্য গ্রাহকদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

advertisement