advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ক্লাবে যেভাবে এলো ক্যাসিনো

মামুন হোসেন
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:৪৫
advertisement

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, সত্তর দশকের নামকরা লেফট উইঙ্গার ওয়াজেদ গাজী, স্ট্রাইকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বিএনপি আমলের মন্ত্রী), গোলরক্ষক শহিদুর রহমান চৌধুরী সান্টুÑ ঢাকার ফুটবলে এক সময়ের জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ। স্বাধীনতার আগ থেকেই জনপ্রিয় তারা। পিন্টু, হাফিজদের সঙ্গে একটি নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ‘ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব’।

শুধু পিন্টুরাই নন; জাতীয় দলের অনেক ফুটবলারের আঁতুড়ঘর এই ওয়ান্ডারার্স। এক সময়ের জনপ্রিয় এবং জায়ান্ট ক্লাবটি কালের বিবর্তনে বিলুপ্তপ্রায়। প্রিমিয়ার লিগ তো দূরের বাতিঘর; দ্বিতীয়স্তরের লিগ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপেও নামগন্ধ নেই ওয়ান্ডারার্সের। গহিন অন্ধকারে থাকা ওয়ান্ডারার্স হঠাৎ আলোর ঝলকানি দিয়ে আলোচনায়। ‘ক্যাসিনো কা-ে’ গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে সিলগালা দেশের অন্যতম পুরনো ক্লাবটি।

ওয়ান্ডারার্সের মতো অতটা জনপ্রিয় না হলেও বাংলাদেশের পুরনো ক্লাবগুলোর একটি ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স। সত্তরের দশকে দ্বিতীয় বিভাগের এ দলটি অনেক তারকা ফুটবলারের আবিষ্কারক। জাতীয় দলের এক সময়ের সেরা ডিফেন্ডার ইমতিয়াজ সুলতান জনির ক্যারিয়ার (১৯৭৮ সাল) শুরু এই ক্লাবেই। নুরুল হক মানিকও খেলেছেন ক্লাবটিতে।

ঢাকা দক্ষিণের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ক্লাবটির বর্তমান সভাপতি। ক্যাসিনোর মতো অবৈধ ব্যবসার হোতা তিনি। ফকিরেরপুল ক্লাব ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। পরিতাপের বিষয় প্রিমিয়ারের মতো মর্যাদার আসরে উত্তীর্ণ হয়েও সেখানে অংশ নেয়নি ক্লাবটি। টাকার অভাব দেখিয়ে দল গঠন করেনি। পড়ে ছিল চ্যাম্পিয়নশিপ লিগেই। অথচ একই বছর রানার্স-আপ হওয়া সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটি।

টাকার অভাবে দল গঠন করতে না পারা সেই ক্লাব থেকে র‌্যাবের অভিযানে এক রাতেই উদ্ধার হয়েছে ২৪ লাখ টাকা। দুই নারীকর্মীসহ ১৪২ জন আটক হয়েছে; যার মধ্যে ক্লাবটির মালিক খালেদ মাহমুদও রয়েছেন।

ফকিরেরপুল ক্লাবের এহেনকা-ে যারপরনাই লজ্জিত, বিস্মিত সাবেক ফুটবলার ইমতিয়াজ সুলতান জনি। ক্যাসিনোর খবরে এখনো নাকি আঁতকে ওঠেন। ক্লাবপাড়ায় হাউজির সঙ্গে পরিচিত তিনি। প্লেইং কার্ডের খবরও অল্পবিস্তর জানা তার। কিন্তু ক্যাসিনোর কথা ফুটবলপাড়ায় কোনোদিন শোনেননি, চোখেও দেখেননি। ফকিরেরপুল ক্লাবের ক্যাসিনো প্রসঙ্গে জনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে হাউজিটা হতো। হাউজি লাইক এ লটারি। এক ধরনের জুয়া খেলা। প্লেইং কার্ড খেলা হতো। এটা বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই হয়।

এখানে ক্লাবের অনেক অফিসিয়াল, সদস্যরা থাকতেন। ক্যাসিনো বলে কিছু ছিল না। যারা হাউজি খেলতেন তারা ক্লাবকে পৃষ্ঠপোষণাও করতেন। ক্লাবের পরিবেশে আসলে জুয়াড়িদের জায়গা ছিল না। যারা হাউজি খেলতে আসতেন তাদের কেউ অফিস আদালত করত, ব্যবসা করতো। সন্ধ্যার পর এসে ক্লাবে কার্ড, হাউজি খেলত। তিন-চার ঘণ্টা থাকত। সেখান থেকে একটা ভালো অংশ (অর্থ) ক্লাব পরিচালনায় ব্যয় করা হতো। সমাজের প্রতিষ্ঠিত লোকরাই খেলতে আসতেন।’

ফকিরেরপুলের টাকার অভাবে দল গড়তে না পারাকে অজুহাত বলে মন্তব্য জনির। ক্যাসিনোকা-ে এখন কোথা থেকে এত এত টাকা, মাদকদ্রব্য এলোÑ প্রশ্ন ছোড়েন সাবেক ফুটবলার। জনি আরও জানান, ‘এখন যা হচ্ছে এই টাকা শুধু ক্লাবই পাচ্ছে না বিভিন্ন ধরনের লোকজনের হাতে টাকা চলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক লোকজন আছে। স্পোর্টস সারা বিশে^ এখন বিরাট ব্যবসা। সেখানে ক্যাসিনোর মতো জিনিস এর মধ্যে প্রবেশ করে বরং এটাকে কলুষিতই করেছে।’

জাতীয় দলের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ফুটবলার (২০০৬ সালে) হাসানুজ্জামান খান বাবলু ক্যাসিনো উদ্ভবের পেছনে বর্তমান সংগঠকদের দায় দেখছেন। সাংগঠনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হঠাৎ ক্লাবের সভাপতি, গভর্নিংবডির সদস্য বনে যাওয়া; যারা কোনোভাবে ক্রীড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়Ñ এমন লোকদের ক্রীড়াঙ্গনে অবাধ প্রবেশের কারণেই নাকি বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টিÑ জানান বাবলু। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ব্রাদার্স ইউনিয়ন থেকে আমার যাত্রা শুরু। মোহামেডান, আবাহনী, জাতীয় দলÑ সব জায়গাতেই খেলেছি। তখন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যারা সংগঠক হিসেবে ছিলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল যেমন আবাহনী ক্লাবে হারুনুর রশিদ ভাই, মোহামেডান ক্লাবের মনিরুল হক চৌধুরী ওনারা যারা ছিলেন ওনারা সব সময় ক্লাবের উন্নয়নের চিন্তা করতেন। সমাজের বিত্তবানদের ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের মাধ্যমে ক্লাব পরিচালনা করতেন। বর্তমানে দেখছি ক্যাসিনো। ওই ক্লাবগুলো তাদের রেজাল্টের দিকে চোখ নেই, যাদের নাম দেখছি তারা ক্লাবের উন্নয়ন না করে ক্যাসিনো দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন; তারই বহির্প্রকাশ দেখতে পাচ্ছি। সমাজকে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের, পাশাপাশি সমাজের নেতৃত্বে যারা আছেন তাদেরও।’ জুয়ার বিষয়টি একেবারে অস্বীকার করেননি বাবলু। তবে আগে এটা ছিল হাউজি এবং কার্ড খেলা। সেটা সমাজের বিত্তবানরা খেলতেন। ওই টাকায় ক্লাবের প্রতিদিনকার খাবার এবং ক্যাম্প পরিচালিত হতো বলে জানান সাবেক এ ফুটবলার।

অবৈধ কর্মকা-, জুয়া, ক্যাসিনো ব্যবসায় নাম এসেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের নামও। কলাবাগান এবং গুলিস্তানে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধার ক্লাব ইতোমধ্যে সিলগালা করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের নাম অন্য ক্লাবগুলোর সঙ্গে কেন উঠে এলো এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ক্লাব সভাপতি মমিনুল হক সাঈদ। ওয়ান্ডারার্সের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাঈদ। তবে দিলাকুশা এবং আরামবাগ ক্লাবের সঙ্গে জড়িত বলে জানান তিনি। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের নাম আসায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। অনেক সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে ক্লাবটি। দুবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ জেতার রেকর্ড আছে মুক্তিযোদ্ধার (১৯৯৭ ও ২০০০), ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন (১৯৯৪, ২০০১ ও ২০০৩) সালে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে পা রাখার কীর্তি গড়েছে দলটি; খেলেছে এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ, এএফসি কাপে। তবে পূর্ব অনেক সাফল্য থাকলেও বর্তমানে ভালো নেই ক্লাবটি। ক্লাবটির অর্থনৈতিক সংকটের কথা প্রায়ই খবরে আসে। টাকার অভাবে ভালোমানের দল গড়তে পারে না প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরেই। সম্প্রতি ক্লাবটির স্পন্সরের দায়িত্ব নিয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে জুয়া বাণিজ্যের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান।

সব মিলিয়ে ভালো নেই দেশের ফুটবল ক্লাব। এভাবে চলতে থাকলে তলানিতে পড়ে থাকা ফুটবল চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সাধারণ থেকে বোদ্ধাদের।

advertisement