advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইসির শীর্ষ কর্তারা কাজ করান বরখাস্তদের দিয়ে

আসাদুর রহমান
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৫৫
advertisement

দুর্নীতির দায়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে চাকরিচ্যুতরাই রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার করার সঙ্গে যুক্ত। পাঁচ থেকে সাত বছর আগে বরখাস্ত হলেও এখনো ইসির গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমেও তাদের নিয়োগ দিয়েছেন জেলা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা। এমনকি বরখাস্ত হওয়া টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডও দেওয়া হয়েছে। সেই সুযোগে তারা অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে ইসির সার্ভারে তথ্য আপলোড করে রোহিঙ্গাদের ভোটার করে আসছেন। ইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি সার্ভারে তিন হাজারের বেশি অবৈধ ভোটারকরণের বিষয়টি নজরে এলে অনুসন্ধানে নামে ইসি। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে ইসির এক কর্মচারী, চাকরিচ্যুত একজন টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও দুই দালালকে আটক করা হয়। এ চক্রের গুরুত্বপূর্ণ দুজন সত্য সুন্দর দে ও সাগর এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের একটি প্রকল্পে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করতেন সত্য সুন্দর দে। ২০১২ সালে সই জাল করে এনআইডি সংশোধনসহ দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হন তিনি। এর পরও অসাধু এ কর্মকর্তাকে দিয়ে নানা কাজ করান ইসির শীর্ষ কর্মকর্তারা। জানা গেছে, চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদে ঢাকার একটি অঞ্চলের টিম সিলেকশনের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ঢাকা জেলা নির্র্বাচন অফিস তাকে নিয়োগ দিয়েছে।

ঢাকার সিনিয়র জেলা নির্র্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের আমাদের সময়কে বলেন, সত্য সুন্দর দে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। কয়েক দিন ধরে তিনি অনুপস্থিত রয়েছেন। যদি না আসেন তা হলে তার জায়গায় অন্য কাউকে দেওয়া হবে। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিকে হালনাগাদে কাজের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সত্য সুন্দর এর আগে যে বরখাস্ত হয়েছেন, সেটি তার জানা নেই।

জানা গেছে, বরখাস্ত হলেও সত্য সুন্দরকে অফিস ছাড়তে হয়নি। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সার্ভারে কোনো সমস্যা দেখা গেলে তাকে দিয়ে কাজ করানো হতো। এ সময় ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডও দেওয়া হয় তাকে। এ ছাড়া সম্প্রতি টেকনিক্যাল অপারেটর নিয়োগে তাকে পরীক্ষকের ভূমিকায় দেখা গেছে।

ইসি কর্মকর্তারা বলেন, নিজেদের জনবল থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া সত্য সুন্দরকে দিয়ে কেন কাজ করানো হতো তা বোধগম্য নয়। সম্প্রতি ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও কোতোয়ালি থানায় তিনি কাজ করেছেন। এ ছাড়া নিজ এলাকা চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাচন কার্যালয়েও তিনি কাজ করতেন বলে জানা গেছে। রোহিঙ্গাদের ভোটারকরণে তার সঙ্গে এনআইডি শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের প্রকল্পে টেকনিক্যাল সাপোর্ট হিসেবে কাজ করতেন মো. সাগর। ২০১৩ সালে দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে বরখাস্ত হন। বর্তমানে বিআরটিএর একটি প্রকল্পে কাজ করছেন বলে শোনা গেলেও তাকে প্রায়ই ইসিতে দেখা যায়।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের একটি প্রকল্পে টিম লিডার হিসেবে কাজ করা মোস্তফা ফারুক দুর্নীতির দায়ে ২০১৪ সালে বরখাস্ত হন। এর পর থেকে নিজ এলাকা চট্টগ্রামের নির্বাচন অফিসে কাজ করছেন তিনি। বিষয়টি জানতে পেরে ইসি থেকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে মোস্তফা ফারুককে ইসি অফিসের কোনো কাজে যুক্ত না করার জন্য বলা হয়েছে। জানা গেছে, মোস্তফা ফারুক চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও বোয়ালখালী এলাকায় কাজ করছেন। তাকে নিয়োগ দিয়েছে চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিস। গত বৃহস্পতিবার তাকে আটক করা হয়।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, মোস্তফা ফারুককে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আগের পরিচিত, সেই হিসেবে সে আসত, কাজ করত। চলমান হালনাগাদ কার্যক্রমে মোস্তফা ফারুককে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আগে থেকে কাজ করার সুবাদে অনেকের সঙ্গে সে পরিচিত। কারও ল্যাপটপে বা অন্য কোথাও টেকনিক্যাল সমস্যা হলে সেটির সমাধান করে দিত। এমনিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সে অনেকবার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমরা বলেছি- হেড অফিস বললে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

জানা গেছে, ২০০৭-০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় ব্যবহৃত কিছু অকেজো ল্যাপটপ নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় অন্তত পাঁচটি ভালো ল্যাপটপ হারিয়ে যায়। এর মধ্যে দুটি জালিয়াত চক্রের হাতে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, মোস্তফা এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত। তার কাছ থেকে দুটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি নির্বাচন কমিশনের চুরি যাওয়া ল্যাপটপ। মোস্তফা ফারুকের কাছ থেকে জব্দ করা দুটি পেনড্রাইভে রোহিঙ্গাদের তথ্য ও নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ১৮ আগস্ট রমজান বিবি নামে এক রোহিঙ্গা নারী লাকী নাম দিয়ে স্মার্টকার্ড তোলার জন্য এনআইডি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যান। সার্ভারে লাকীর যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত আছে দেখা যায়। কিন্তু তার কথাবার্তায় সন্দেহ হলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে জানানো হয়, ভোটার হিসেবে নিবন্ধন বা লাকীর নামে জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়নি। কাগজপত্রে কোথাও কিছু নেই। এ ঘটনায় হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। ঘটনার পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম নির্বাচন কমিশন কার্যালয় দুটি তদন্ত কমিটি করে। পাশাপাশি কোতোয়ালি থানা পুলিশও তদন্ত শুরু করে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে দুই দালালকে আটক করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীনকে আটক করে পুলিশ। তার কাছ থেকে ইসির একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা বাদী হয়ে জয়নাল আবেদীন, তার দুই সহযোগী বিজয় দাস ও তার বোন সীমা দাসসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। গ্রেপ্তার তিনজনের বাইরে অন্য দুই আসামির নাম তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করেনি পুলিশ।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল পুলিশকে বলেন, ২০০৪ সালে তিনি অফিস সহায়ক হিসেবে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে যোগ দেন। ২০০৭ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া সত্য সুন্দর ও সাগরের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্রে তিনি সাগরের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় ২০০৭ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকার কার্যক্রমে ব্যবহৃত ল্যাপটপটি কেনেন। যেটিতে ইসি সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সফটওয়্যার ও ইউজার-পাসওয়ার্ড রয়েছে।

ইসির তদন্ত দলকে জয়নাল বলেছেন, শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে তিনি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিস থেকে ডিএসএলআর ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার ও সিগনেচার প্যাড গোপনে বাসায় নিয়ে যেতেন। বাসায় বসেই এসব সরঞ্জাম দিয়ে তথ্য তৈরি করে ই-মেইলের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতেন। সত্য সুন্দর ও সাগর অবৈধভাবে ইসি সার্ভারে ঢুকে তথ্য আপলোড এবং যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রিন্ট করে পৌঁছে দিতেন।

advertisement