advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চার্জশিটে যুবলীগ নেতা রাশেদ হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা

ইউসুফ সোহেল
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৩৪
advertisement

রাজনৈতিক ভিন্নমত ও টাকা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন রাজধানীর বনানী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী রাশেদ। গত বছর ১৪ জুলাই মধ্যরাতে মহাখালী স্কুল রোডের কঙ্কালবাড়ির তৃতীয় তলায় কাজী রাশেদকে গুলি করে হত্যা করে তারই বাল্যবন্ধু বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেল।

আর খুনের পর হাতে পলিথিন বেঁধে ওই ভবন থেকে লাশ নামায় সোহেলের দেহরক্ষী মো. আবুল হোসেন হাওলাদার ওরফে হাসু, সোহেলের মিডিয়া নিয়ন্ত্রক মাহবুবুল আনসার দিপন ওরফে দিপু ও তার অনুসারী মহাখালী দক্ষিণপাড়ার ডিশ ব্যবসায়ী ফিরোজ মিয়া এবং খিলক্ষেতের জাওরা কুডু এলাকার বাসিন্দা সন্ত্রাসী জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির।

ঘটনার সময় কঙ্কাল ভবনের বাইরে পাহারায় ছিলেন সোহেলের চাচা বনানী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাকির হোসেন সরদার। আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে (চার্জশিট, নম্বরÑ২৬৬) এসব তথ্য জানিয়েছেন রাশেদ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের (সেনসেশনাল মার্ডার টিম) পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান। এতে তিনি তুলে ধরেছেন সুন্দরী সোহেলের দেহরক্ষী রাশেদ খুনের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পরিদর্শক মনিরুজ্জামান জানান, রাশেদ হত্যাকা-ে সুন্দরী সোহেলসহ কয়েক জনের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

তিনি জানান, জাকির হোসেন নামে মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে দুর্বল ও দায়সারা তদন্তের অভিযোগ এনে আদালতে দাখিল করা এ চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী নিহত রাশেদের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় তিনি আমাদের সময়কে বলেন, রাশেদ হত্যাকা-ের পর কঙ্কাল বাড়িতে স্থাপিত বিভিন্ন সিসি টিভিতে ধারণকৃত ফুটেজে হত্যাকা-ে যাদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে তাদের কারও কারও নাম চার্জশিটে নেই। ঘটনার পর থেকেই পুলিশের ভূমিকা ছিল দায়সারা গোছের। নয়তো সুন্দরী সোহেলসহ সব খুনি এতদিনে ধরা পড়ার কথা। এ চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়া ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) মাধ্যমে মামলার পুনর্তদন্তে আদালতে আবেদন করবেন বলেও জানান বাদী মৌসুমী।

মামলার এজাহার, আসামির জবানবন্দি ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, নিহত রাশেদ সপরিবারে তার পৈতৃক বাড়ি মহাখালী স্কুল রোডের জিপি-গ/৪২ ভবনে বসবাস করতেন। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে সোহেল ও রাশেদ একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। সোহেল পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। ওই বছরই রাশেদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যান সোহেল এবং সেখানে একটি দোকানে কাজে লাগিয়ে দেন। ২০১০ সালে সোহেল ও রাশেদ দেশে ফেরেন। সে বছরই সোহেল বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে বানানী থানার আহ্বায়ক কমিটির সদস্যপদও লাভ করেন তিনি। রাশেদের বিয়েতে উকিল বাবা ছিলেন সোহেল। সোহেলের দেহরক্ষী হিসেবে চাঁদাবাজির সার্বিক দায়িত্ব পালনকালে রাশেদকে সন্দেহের চোখে দেখতেন সোহেল। একপর্যায়ে ব্যবসায়িক টাকার গরমিল, রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে সোহেল ও রাশেদের মধ্যে ব্যাপক মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। হত্যাকা-ের দুমাস আগেও রাশেদকে মারধর করেছিলেন সোহেল। ঘটনার রাতে সোহেল নিজেই গুলি করে রাশেদকে হত্যার পর কঙ্কাল ভবন থেকে বেরিয়ে যান। এর পর লাশ সরান উপরোল্লিখিত ৪ জন। রাশেদের বাড়ির অদূরে তার লাশ ফেলার পর যার-যার মতো সটকে পড়ে খুনিরা। আসামি সোহেলের বিরুদ্ধে বনানী থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে। খিলক্ষেত থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা রয়েছে জহিরের নামে। হাশেমের নামে গোসাইরহাট থানায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে।

গত বছর ১৫ জুলাই ভোরে কঙ্কালবাড়িতে যুবলীগ নেতা সুন্দরী সোহেলের সম্পাদনায় কথিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘রেইনবো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর অফিসের পেছনের রাস্তা থেকে রাশেদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের রাতে রাশেদের লাশ ওই অফিসের সামনের সরু পথ দিয়ে টেনে ভবনটির সীমানাপ্রাচীরের উল্টোপাশে ফেলে দেওয়া হয়। এ অপকর্মের ফুটেজ ধরা পড়ে সোহেলের অফিসে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে। ওই ফুটেজে দেখা যায়, ১৪ জুলাই রাত ৩টা ৪ মিনিটে হাতে পলিথিনের ব্যাগ পেঁচিয়ে রাশেদের নিথর দেহ টেনেহিঁচড়ে সরু ওই গলিপথ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ৪ যুবক (ফিরোজ, হাসু, দিপু ও জহির)। একটু পরই দেখা যায়, যুবকরা ফিরে আসছে। এ সময় হাতে লেগে থাকা কিছু একটা (রক্ত!) পাশের দেয়ালে মোছে দিপু। এর পর তারা ধীরেসুস্থে অফিসের সামনের গলি দিয়ে বেরিয়ে যায়। এর আগে রাশেদকে গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করে টাক মাথাওয়ালা অচেনা একজনকে নিয়ে ভবন থেকে ঠা-া মাথায় বেরিয়ে যায় সুন্দরী সোহেল। ঘটনার সময় অচেনা দুই তরুণীও ছিল ওই অফিসে। এই দুই তরুণী এবং সোহেলের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া তার সহযোগীর নাম ওঠেনি চার্জশিটে।

ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে থাকা সুন্দরী সোহেল বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়ায় আছেন বলে জানা গেছে। সেখানে বসেই তিনি নিজ ক্যাডার বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন বনানী-মহাখালী এলাকায় আধিপত্য। মামলা তুলে নিতে রাশেদ হত্যা মামলার বাদী নিহত রাশেদের স্ত্রী মৌসুমী আক্তারকে তিনি মোটা টাকার প্রলোভন দেখাচ্ছেন; কখনো দিচ্ছেন প্রাণনাশের হুমকি। আবার বাদীর অশ্লীল ছবি তৈরি করে ভাইরাল করারও হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে গত ২৪ জুলাই বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-১৫০০) করেছেন বাদী। গত ৩১ জুলাই দুপুর ১২টা ১ মিনিটে অপরিচিত একটি নম্বর (প্রাইভেট) থেকে মামলার বাদির ফোনে কল দেন সুন্দরী সোহেল। রাশেদ হত্যাকা-ে জাকির হোসেন সরদার ছাড়া কাউকেই এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আর জামিন নিয়ে জাকিরও এখন খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাদীর অভিযোগ, সোহেল প্রায়ই বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছেন তাকে। তবে অভিযুক্ত দীপু, হাসু, ফিরোজ ও জহির হত্যাকা-ের পর থেকে একবারের জন্যও বাদী এমনকি নিজ পরিবারের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছেÑ খুনে অভিযুক্ত এ চারজন এখন কোথায়? মামলার বাদী মৌসুমী আক্তারের সন্দেহ, সাক্ষী না রাখতে ওই চারজনকেও হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলেছেন সুন্দরী সোহেল। তদন্তসংশ্লিষ্টরাও মৌসুমীর এহেন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। একই আশঙ্কা দীপু, হাসু, ফিরোজ ও জহিরের পরিবারেরও। মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত বছরের ৭ আগস্ট রাশেদ হত্যাকা-ে জড়িত জাকিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এর পরদিন খুনের আদ্যোপান্ত জানিয়ে জাকির ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুন্দরী সোহেল তাকে মোবাইল ফোনে রেইনবো অফিসের সামনে আসতে বলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি কঙ্কাল বাড়িতে এসে সোহেল, ফিরোজ, দীপু, হাসু, কাজী রাশেদসহ আরও দু-তিনজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সোহেল ও ফিরোজ তাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আজ রাশেদকে ফালাইয়া দিমু, তুই নিচে পাহারায় থাকিস। কেউ যেন ওপরে আসতে না পারে।’ রাশেদকে নিয়ে সোহেল, ফিরোজ, হাসু দীপু ও আরও দু-তিনজন তৃতীয় তলায় সোহেলের অফিসে যান। কয়েক মিনিট পর গুলির শব্দ শুনতে পান জাকির। এর কিছুক্ষণের মধ্যে সোহেল ও অপরিচিত একজন নিচে নেমে আসেন এবং তার হাতে একটি ছোট বাক্স দিয়ে তাকে চলে যেতে বলে বেরিয়ে যান তারা। এর পর পর হাসু, ফিরোজ, দীপুসহ চারজন রাশেদের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনেন এবং গেটের বাইরে দেওয়ালের উল্টোপাশে ফেলে দেন।

advertisement
Evall
advertisement