advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এতদিন পর চার ক্যাসিনোর খোঁজ পেল মতিঝিল পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৯:১৮
রাজধানীর মতিঝিলে ভিক্টোরিয়া স্পোটিং ক্লাবে পুলিশের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

ক্যাসিনোর কারবারিরা পালিয়ে যাওয়ার চারদিন পর মতিঝিল থানার পার্শ্ববর্তী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব ও আরামবাগ ক্লাবে অভিযান চালাল পুলিশ। এতে কাউকে আটক করতে না পারলেও কয়েকটি ক্যাসিনো বোর্ডের পাশাপাশি জুয়া খেলার বিপুল পরিমাণ সামগ্রী ও বোর্ড এবং মাদকদ্রব্য (মদ, সিসা) উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে গতকাল রবিবার দুপুর থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা এ অভিযান চলে।
থানার পাশেই বছরের পর বছর ধরে চলা এসব ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ এতদিন অবগত ছিল না বলে জানিয়েছেন ডিসি আনোয়ার হোসেন। অভিযান শেষে তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই আমরা অভিযান শুরু করেছি। এর আগে ইন্টেলিজেন্স বা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ক্যাসিনো চালানোর ব্যাপারে তথ্য পাইনি। চারটি ক্লাবে অভিযানের সময় আমরা নগদ টাকা, ডলার এবং ক্যাসিনোসহ জুয়ার যাবতীয় সরঞ্জাম জব্দ করেছি। আগে থেকে সবাই পালিয়ে যাওয়ায় অভিযানে কাউকে আটক

করা যায়নি। যেহেতু এসব ক্লাবের একটি অংশ জুয়া খেলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তাই ক্লাব চারটি সিলগালা করা হয়েছে।’
আগে অভিযান কেন চালানো হয়নিÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি আনোয়ার বলেন, ‘ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান সব সময় চলছে। এসব সামগ্রী একদিনে আসেনি। তার মানে পুলিশ জানত না বা পুলিশ কিছু করেনি তা নয়, তথ্য পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হয়তো এত বড় পরিসরে হয়নি। মানুষ যেভাবে প্রত্যাশা করেছে সেভাবে হয়নি। এখন আমরা এ ব্যাপারে তদন্ত করবÑ কারা এর সঙ্গে জড়িত, কারা এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। জড়িত যে-ই হোক না কেন, কাউকে আমরা ছাড় দেব না।’
পুলিশ জানিয়েছে, গতকালের অভিযানে ভিক্টোরিয়া ক্লাব থেকে বিভিন্ন ধরনের জুয়া খেলার নয়টি বোর্ড, এক লাখ টাকা, বিপুল পরিমাণ তাস, জুয়ায় ব্যবহৃত চিপস ও মদ পাওয়া গেছে। মোহামেডান ক্লাবে পাওয়া গেছে দুটো রুলেট টেবিল, নয়টি বোর্ড, বিপুল পরিমাণ কার্ড, ১১টি ওয়্যারলেস সেট ও ১০টি বিভিন্ন ধরনের চাকু। আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবেও মিলেছে বাকারা ও রুলেট টেবিলসহ বিভিন্ন জুয়ার সরঞ্জাম। যুবলীগের প্রভাবশালীদের পরিচালিত ওই ৪ ক্যাসিনো ক্লাব সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার কয়েকটি ক্যাসিনোয় র‌্যাবের অভিযানের পরপরই মতিঝিল থানার পার্শ্ববর্তী এ চার ক্লাবে পুলিশ কেন অভিযানে যায়নিÑ মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শিবলী নোমান বলেন, ‘অভিযান চালানো এ ক্লাবগুলোয় যে জুয়া খেলা হয়, সে ব্যাপারে আগে থেকে কোনো তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া গেছে আজ (গতকাল), তাই আজই অভিযান পরিচালিত হলো। এর আগে ক্যাসিনোর বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য ছিল না।’
গতকাল সিলগালা করার আগে চারটি ক্লাব ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটিতেই সাজানো ক্যাসিনোর বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম। টেবিলে টেবিলে ছিল জুয়া খেলার বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম, ক্যাসিনোয় ব্যবহারের জন্য কয়েন ও অন্যান্য সামগ্রী। কয়েকটি ছোট ছোট মূর্তিও মিলেছে ক্যাসিনোয়। ক্যাসিনোগুলো পরিচালনার জন্য নেপাল থেকে আনা অভিজ্ঞ কর্মীরা খেলা শুরুর আগে এসব মূর্তিতে পূজা দিতেন বলে জানা গেছে। ক্যাসিনোর রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্লেটে প্লেটে রাখা দামি খাবার পচে সেগুলোয় পোকা ধরে গেছে। আভিযানিক দলের কয়েক পুলিশ সদস্য বলেন, গত বুধবার র‌্যাবের অভিযানের সময়ই হয়তো সব ফেলে পালিয়েছে জুয়ার কারবারিরা। পুলিশ বেশ কয়েকটি রেজিস্ট্রি খাতা জব্দ করেছে, যেগুলোতে মোবাইল নম্বরসহ লেখা রয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা জুয়াড়িদের নাম। একটি খাতার কাগজ ঘেঁটে ৩১২ জুয়াড়ির নাম ও মোবাইল নম্বর মিলেছে। সেখানে রয়েছেন নামি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বও।
অভিযানে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব থেকে নয়টি ক্যাসিনো, অসংখ্য জুয়া খেলার বোর্ড ও নগদ ১ লাখ টাকা জব্দ করে পুলিশ। ক্লাবটিতে ঢুকে দেখা যায়, সুসজ্জিত ও অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলরুমে জুয়া খেলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে বেশকিছু অশ্লীল ছবিও টানানো। জুয়াড়িদের জন্য ক্লাবের ভেতরে আছে আলাদা রন্ধনশালা, যেখানে চাইনিজ-কন্টিনেন্টালসহ সব ধরনের খাবার প্রস্তুতের ব্যবস্থা। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভেতরে ছিল অসংখ্য জুয়া খেলার বোর্ড, সরঞ্জাম এবং অন্তত দুটি ক্যাসিনো। এ ছাড়া টাকা গোনার বেশ কয়েকটি মেশিন ও হাউজির সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। ভিআইপিদের জন্য আছে আলাদা ছোট ছোট কক্ষ। আছে আলাদা টাকা গোনার কক্ষ ও রন্ধনশালা। ক্লাবের ভেতর থেকে ১২টি ওয়াকিটকিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। দিলকুশা ক্লাবেও ভিআইপিদের জন্য জুয়া খেলার আলাদা কক্ষ দেখা গেছে। এ ক্লাব থেকে একটি ক্যাসিনো ও ১৩টি জুয়া খেলার বোর্ড মিলেছে।
ফকিরাপুল এলাকার ক্লাবপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, মতিঝিল থানার ঠিক পেছনের সড়কেই (৩০০ গজের মধ্যে) রয়েছে চারটি ক্লাব। প্রথমেই ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, এর পরই ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। একটু এগিয়ে গেলে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব। জানা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে গত বুধবার দুপুর পর্যন্তও জমজমাট ছিল ক্যাসিনো বাণিজ্য। এর মধ্যে ইয়ংমেন্স ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তিনি ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনোর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক ছিলেন দক্ষিণের যুবলীগের প্রভাবশালী শীর্ষ এক নেতা। সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক একে মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার; আরামবাগ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদ। তবে ওই ছয়টি ক্লাবের প্রতিটি জুয়ার আসর যুবলীগ নেতা খালেদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলত।
আরও জানা গেছে, এক সময়ের ফুটপাতের হকার, বর্তমানে মতিঝিল থানা যুবলীগের নেতা জামালের মালিকানায় ক্যাসিনো খোলা হয় আরামবাগ ক্লাবে। কাউন্সিলার সাঈদ তার অলিখিত অংশীদার। এ ক্যাসিনোয় নেপালি চক্রেরও অংশীদারত্ব রয়েছে। আরামবাগ ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন তিন লাখ টাকা দক্ষিণ যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে দেওয়া হতো। ক্যাসিনোর দুই হোতা আবু কাওছার ও সাঈদ এখন বিদেশে।
এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে ১৯৯৪ সাল থেকে মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। এর পর তিনি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০১১ সালে ক্লাবটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর সভাপতি পদ থেকে মোসাদ্দেক হোসেন ফালু সরে গেলেও লোকমান থেকে যান। সদস্য সচিব নির্বাচিত হয়ে এখনো তিনি স্বপদে বহাল। এ ক্লাবেও ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক কাউন্সিলার সাঈদ ও লোকমান হোসেন। তবে মালিকানায় ছিলেন বনানীর ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের মালিক ব্যবসায়ী আবুল কাশেম ও মতিঝিলের স্থানীয় যুবলীগ লীগ নেতা ইমরান। নেপালি অংশীদার কৃষ্ণা।
২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্যাসিনো বাণিজ্য শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া ক্লাবে। অবৈধ এ ব্যবসার কর্ণধার নেপালের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী দীনেশ মানালি ও রাজকুমার। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বিনোদ মানালি। নেপাল ও ভারতের গোয়ায় তাদের মালিকানায় ক্যাসিনো ব্যবসা রয়েছে। ভিক্টোরিয়ায় ক্যাসিনো চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই বাবা নামের এক নেপালি নাগরিকের কাছে সেটি বিক্রি করে দেন মানালি ও রাজকুমার। তখন থেকে বাবা ও তার ম্যানেজার হেমন্ত মিলে ক্যাসিনোটি চালাতে থাকেন। ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি কাজল ও সাধারণ সম্পাদক তুহিন। প্রতিদিন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ভাড়া নিতেন তারা। আর প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা পেতেন দৈনিক চার লাখ টাকা। ওই নেতার সহযোগী যুবলীগ নেতা আরমান ও খোরশেদ প্রতিদিন এ চাঁদার টাকা আনতেন।
দিলকুশা ক্লাবের ক্যাসিনো মালিকানায় আছেন নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও ছোট রাজকুমার। তাদের আদি নিবাস নেপালের থামেলে। ঢাকায় চাহিদা থাকায় দীনেশ ও রাজকুমারই নেপালি ক্যাসিনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ক্লাবে সরবরাহ করতেন। অন্যদিকে স্পট চালাতে বিভিন্ন জায়গায় মাসোহারা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন এক সময় কাকরাইলের বিপাশা হোটেলের বয় জাকির হোসেন। এ ক্যাসিনো থেকেও প্রভাবশালী সেই যুবনেতা প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন। আর চালু করতে অগ্রিম দিতে হয় ৪০ লাখ টাকা। সহযোগী আরমানের চাঁদা ১ লাখ টাকা, অগ্রিম নেন ১০ লাখ। ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযানকালে আরমানের ছোট ভাই ধরা পড়লে তাকে এক বছরের সাজা দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 

 

advertisement